বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে স্মারকলিপি

১০ জানুয়ারি ২০০৮

এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে স্মারকলিপি

১. বিষয় সংক্ষেপ

অনেক দশক ধরে বাংলাদেশে আইনের শাসন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং মানবাধিকারে প্রতি অবমাননার কারণে ধ্বংস হচ্ছে৷ যারা ক্ষমতাশালী ও সুবিধাভোগী তারা শাস্তির উর্ধ্বে থেকে কোনো ধরনের জবাব দিহিতার ভয় ছাড়াই নানান ধরনের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে পারছে৷ সরকারের ক্ষমতায় যে দলই থাকুক না কেন, এবং নির্বাচনের আগে যে অঙ্গীকারই করে থাকুক না কেন ক্ষমতার অপব্যবহার করাটা রীতিতে পরিণত হয়েছে৷ ফলে, দুর্নীতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে, সরকারি প্রতিষ্ঠানের উপর থেকে জনগণের আস্থা লোপ পাচ্ছে এবং আইনের শাসনের অবমাননা করা হচ্ছে ও মানবাধিকারের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ কমে যাচ্ছে৷ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মদদে রাজনৈতিক সহিংসতা ও সংঘবদ্ধ অপরাধের মধ্যে বন্ধন জোরদার হওয়ার ফলে দুর্নীতি ও অপরাধীর শাস্তি না হওয়ার এক সংস্কৃতি শেকড় গেড়ে বসেছে৷ দরিদ্রতম মানুষেরা বেশিরভাগ সময় সবচেয়ে বেশি লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছে এবং সমস্যার প্রতিকারে তাদের সামর্থ্যই সবচেয়ে কম৷

 

স্বাধীনতাত্তোরকালে, বিশেষ বা জরুরি ক্ষমতা আইনসহ নির্যাতনমূলক আইনগুলো প্রশাসন দ্বারা ব্যবহৃত ও লংঘিত হয়েছে৷ মানবাধিকার রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে নিজের অস্তিত্ব হারিয়েছে এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার কাছে বিচার বিভাগ নতজানু হয়েছে৷

 

একটি অতি কোনঠাসা রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যে বিস্তৃত পরিসরের সহিংসতা, মারাত্মক মানবাধিকারের লংঘন ও ভোট কারচুপির ভয় থেকে সৃষ্ট অবস্থার প্রেক্ষিতে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয় এবং বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার সামরিক বাহিনীর সহায়তায় ক্ষমতা গ্রহণ করে৷ তত্ত্ববধায়ক সরকার দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক সহিংসতা প্রতিরোধ, নির্বাচনী আইনের সংস্কার ও ২০০৮ সালের মধ্যে একটি স্বাধীন ও সুষ্ঠু নির্বাচনের অঙ্গীকার করেছে, যা বেশিরভাগ মানুষ স্বাগত জানিয়েছে৷ যদিও বছর পার না হতেই দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা থেকে সৃষ্ট পরিস্থিতি বিশেষ করে রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর ভূমিকা, অর্থনৈতিক বিষয়াদি যেমন খাদ্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি এবং সংস্কারের ধীর গতি দেখে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রতি মানুষের মোহ কাটতে শুরু করেছে৷

 

এখনই সময় মানবাধিকার রক্ষায় নতুন করে অঙ্গীকারাবদ্ধ হওয়ার

বাংলাদেশ বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশ[১] যদিও চুক্তিসমূহের মূল শর্তগুলোর বেশিরভাগই উপযুক্তভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না, এটি নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার কিংবা অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সবর্ত্রই প্রযোজ্য৷ বিচার বিভাগ কিংবা রাজনৈতিক সরকার, কেউই তাদের আভ্যন্তরীণ দক্ষতা কিংবা আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার জবাবদিহিতার জন্যে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মানদণ্ডগুলো ব্যবহার করছে না৷ চুক্তিগুলোর বিষয়ে বাংলাদেশ এখনো পর্যন্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি মনিটরিং কমিটির কাছে রিপোর্ট করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের বাংলাদেশ সফরের একাধিক অনুরোধ অনুমোদনের অপেক্ষায় জমে আছে৷[২]

 

এই প্রেক্ষাপটে এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে মানবাধিকার বিষয়াবলীতে পুনঃঅঙ্গীকার ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণের দাবী জানাচ্ছে যাতে করে সংস্কার প্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের বিশ্বাস ও আস্থা ফিরে আসে এবং ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক সরকারের জন্যে সুশাসনের বীজ এখনই রোপন করা যেতে পারে৷

 

এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই স্মারকলিপিতে উল্লেখিত সুপারিশমালার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানাতে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী সামরিক নেতৃবৃন্দের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে, যাতে করে মানবাধিকার ও আইনের শাসনের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা আরো বৃদ্ধি পায়, যা কার্যকরভাবে গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে পূর্বশর্ত৷

 

এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল দুর্নীতি ও নির্বাচনী সংস্কারের জন্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপকে স্বীকৃতি দেয়৷ তত্ত্বাবধায়ক সরকার জনসমক্ষে ২০০৮ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠানের অঙ্গীকার করেছে৷ এই সময়কালের মধ্যে দেশ গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় ফিরে যাবে, দেশের বেশিরভাগ জনগণ তেমনই মনে করেন৷ নির্বাচন কমিশন ভোটার নিবন্ধনের নতুন এক প্রক্রিয়া শুরু করেছে৷ দুর্নীতি দমন কমিশন ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবরের মধ্যে একটি বড় ধরনের দুর্নীতি বিরোধী অভিযানের মাধ্যমে দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে এমন প্রায় ২০০ জন সন্দেহভাজন ব্যক্তির এক তালিকা প্রকাশ করেছে৷

 

এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বিশ্বজুড়ে তাদের কাজের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছে যে, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারের অবসান ঘটাতে হলে যেসব প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন আনতে চায় সেগুলোসহ রাষ্ট্রীয় সকল প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তাদের মধ্যে আইনের শাসনের প্রতি একটি শক্তিশালী ও টেকসই অঙ্গীকার ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মনোভাব থাকা দরকার৷ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা দুর্নীতি ও রাজনৈতিক অপব্যবহার প্রতিরোধের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করতে পারে৷ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা হল মানবাধিকারের ভিত্তি। মানবাধিকার ও আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অখন্ডতা রক্ষার মতোই ব্যক্তির স্বাতন্ত্রতা রক্ষার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ৷ সেকারণে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে, তাদের দুর্নীতি বিরোধী অভিযান এবং নির্বাচনী ও রাজনৈতিক সংস্কার উদ্যোগ, প্রশ্নাতীতভাবে মানবাধিকার ও আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে, এবং তাদের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ স্বচ্ছ ও জবাব দিহিমূলক হবে৷ এই ধরনের পদক্ষেপ শাসন ব্যবস্থা উন্নত করার ক্ষেত্রে সত্যিকারের প্রয়াস হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ব্যাপারে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক কারসাজি করার ভয় দূর করবে৷

 

শাস্তির উর্ধ্বে থাকার ঘটনার ধারাবাহিকতা

এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জোরালোভাবে বিশ্বাস করে যে, বাংলাদেশে কয়েক দশক ধরে বিরাজমান শাস্তির উর্ধ্বে থাকার সংস্কৃতি দূর করা সম্ভব না হলে দুর্নীতি প্রতিরোধ কিংবা নির্বাচনী সংস্কার কার্যক্রমের চেষ্টা সফল হবে না৷ এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক ও জাতীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলো বাংলাদেশে ব্যাপক ও মারাত্মক ধরনের মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা নথিবদ্ধ করেছে৷ এর মধ্যে রয়েছে বিচার বহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন ও অন্যান্য ধরনের দুর্ব্যবহার, ধর্ষণ ও লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতা৷ এগুলো সংঘটিত হয়েছে রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা এবং রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলগুলোর সহায়তায় অরাষ্ট্রীয় পক্ষগুলো দ্বারা৷ প্রশাসন অপরাধীদের বিচারের সম্মুখীন করতে এবং মানবাধিকার লংঘনের শিকার ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ আদায়ে সামান্যই সাফল্য পেয়েছে৷ অন্যদিকে, ঘটনাকে প্রকাশ করতে গিয়ে মানবাধিকার রক্ষাকারী কর্মী, সাংবাদিক ও অন্যান্যরা নিজেরাই লক্ষবস্তু ও আক্রমণের শিকার হয়েছেন৷

 

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সংস্কারের অঙ্গীকার বাংলাদেশের জন্যে মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে বিরাজমান দীর্ঘস্থায়ী বাঁধাগুলো সমাধানের সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে৷ তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখার জন্যে এবং জবাবদিহিতার সংস্কৃতি তৈরির জন্যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উচিত হবে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে শাস্তির উর্ধ্বে থাকা বিষয়কে সমাধান করা, যা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে বিচার বিভাগকে রক্ষা করবে৷ নির্যাতনকারী সামরিক ও পুলিশ সদস্যরা তখন আর জবাব দিহিতা করা ও সেইসাথে বিচারের সম্মুখীন হওয়া থেকে রক্ষা পাবে না৷ বিগত দশকগুলোতে বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যেভাবে রাজনৈতিক মদদ ও হস্তক্ষেপ ঘটেছে সেই ব্যবস্থাকে অবশ্যই দূর করতে হবে৷

 

সরকার অবশ্যই বিচার প্রক্রিয়া, আইন প্রয়োগ ও মানবাধিকার বিষয়ক প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কারের মাধ্যমে সেগুলোকে কার্যকর, স্বচ্ছ ও জবাব দিহিমূলক করার পদক্ষেপ নেবেন৷ সরকার অবশ্যই নিশ্চিত করবেন যে, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কিংবা পুরনো দিনের মানবাধিকার লংঘনের বিষয় যা কিছু নিয়েই সরকার কাজ করুক না কেন এসবই বাংলাদেশ স্বাক্ষরিত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক চুক্তি ও মানদণ্ডগুলোর উপর ভিত্তি করেই করা হবে৷

 

১৯৭১ সালে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও অন্যান্য মারাত্মক ধরনের মানবাধিকার ও মানবতাবাদী আইন লংঘনের ঘটনার সত্য উদঘাটন ও সুবিচার করতে না পারার ব্যর্থতা বাংলাদেশে শাস্তির উর্ধ্বে থাকার মতো পরিস্থিতি বহাল থাকা উত্সাহিত করেছে৷ কোনো সরকারই ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন বাস্তবায়নে কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেয়নি এবং এখনো পর্যন্ত সরকারিভাবে ১৯৭১ সালে সংঘটিত ব্যাপক মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা তদন্ত করে দোষীদের শনাক্ত করা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্যে সুপারিশ করতে কোনো কমিশন গঠন করা হয়নি৷

 

এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বিশ্বাস করে সরকারিভাবে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন (ট্রুথ কমিশন) গঠন করা উচিত, যে কমিশনে ক্ষতিগ্রস্তরা তাদের বক্তব্য জানাতে পারবেন; কমিশন যতদূর সম্ভব বিগত দিনগুলোতে ঘটে যাওয়া মারাত্মক ধরনের মানবাধিকারের লংঘন ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লংঘনের বিষয়গুলো সুস্পষ্ট করবে; ঘটনার জন্যে দায়ী ব্যক্তির বিচারের ক্ষেত্রে সহায়ক হিসেবে তথ্য সংগ্রহ করবে; এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও তার আত্মীয়-স্বজনের জন্যে পূর্ণ ক্ষতিপূরণের কার্যকর সুপারিশ পেশ করবে৷ এই ধরনের তদন্ত কমিশন হতে পারে সত্যের অধিকার, ন্যায়বিচারের অধিকার ও পূর্ণ ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকারসহ ক্ষতিগ্রস্তের জানার অধিকার বাস্তবায়নের প্রথম পদক্ষেপ, বিষয়টি এভাবেই শাস্তির উর্ধ্বে থাকা বিষয়ে জাতিসংঘের নীতিমালায় উদ্বৃত্ত হয়েছে৷[৩]  তবে এই ধরনের তদন্ত কমিশন অপরাধীকে শাস্তি দেয়ার সাধারণ বিচার পদ্ধতির প্রতিস্থাপন নয়, এটি সাধারণ বিচার বিভাগীয় জবাব দিহিতামূলক পদ্ধতির পরিপূরক মাত্র৷

 

এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জাতিসংঘের কারিগরি সহায়তা ও সমর্থনে এই প্রক্রিয়াটি শুরু করার জন্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে যাতে করে সত্য অনুসন্ধান, ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণ ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং অন্যান্য মারাত্মক মানবাধিকার লংঘন ও মানবাধিকার আইনের  ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মানদন্ডগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়৷

 

স্টেকহোল্ডারদের সম্পৃক্ত করা

যদি সংস্কারের পদক্ষেগুলো অন্তবর্তীকালীন সরকারের মেয়াদকালের পরেও অব্যাহত থাকে, সেক্ষেত্রে এই পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত সকল স্টেকহোল্ডারদের পরিবর্তনগুলো সম্পর্কে জানা, বোঝা ও একে সমর্থন করার আবশ্যকতা রয়েছে৷

 

সুশীল সমাজ মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা প্রকাশ করা ও পরিবর্তনের দাবীতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছেন৷ তারা শাস্তির উর্ধ্বে থাকা ঘটনা (ইমপিউনিটি) ও দুর্নীতির অবসান এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দাবীতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন৷ এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে আহ্বান জানাচ্ছে যে, তারা যাতে মানবাধিকারের সংস্কার ও শাস্তির উর্ধ্বে থাকা সংস্কৃতির অবসানে আনীত সকল প্রস্তাবনাগুলো তৃণমূলের সংগঠনসহ সুশীল সমাজের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিতভাবে বিস্তৃত পরিসরে আলোচনার জন্যে পরামর্শ সভার আয়োজন করে৷ এই ধরনের আলোচনা বা মতবিনিময় সভা নীতি নির্ধারকদের বহুমুখী দৃষ্টিভিঙ্গ, অভিজ্ঞতা ও বিশেষজ্ঞতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এবং প্রস্তাবিত সংস্কার প্রকৃত চাহিদা পূরণে সক্ষম হবে৷ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিস্তৃত পরিসরের সুশীল সমাজের সঙ্গে টেকসই পরামর্শ সভার আয়োজন গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেটের অবর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্যে যোগাযোগ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সুযোগ তৈরি করবে৷

 

এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সচেতন যে, তারা যে সুপারিশমালা পেশ করছে সেগুলো বাস্তবায়নে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সংসদে আইন পাস কিংবা সংশোধনীর দরকার হবে৷ আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে, যখন কোনো সংসদ থাকে না, যেমনটা এখন, তখন প্রেসিডেন্ট অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন যা সংসদের পাস করা আইনের মতোই কার্যকরী এবং এর মেয়াদ নির্বাচিত সংসদ শুরু হওয়ার পরও একমাস পর্যন্ত বহাল থাকে৷[৪]

 

এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল যখন সংস্কারকে এগিয়ে নেয়ার জন্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে এই পথ অনুসরনের জন্যে আবেদন জানায় সেসময়ে সংস্থা সরকারের প্রতি আহ্বান জানায় সকল স্টেকহোল্ডারকে সম্পৃক্ত করার জন্যে যাতে করে পর্যাপ্ত জনমত ও রাজনৈতিক সমর্থন আদায় করা সম্ভব হয় ‍এবং যাতে করে সংস্কারগুলো ভবিষ্যতের সংসদে অনুমোদিত হয়৷

 

সংস্কারের ভিত্তি রচনা করার জন্যে রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই নির্বাচনে অংশগ্রহণের অঙ্গীকার করতে হবে যাতে করে মানবাধিকার সুরক্ষা ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা বাড়িয়ে তোলার ক্ষেত্রে সমর্থন ও উদ্যোগ গ্রহণ করা সম্ভব হয়৷ নির্বাচনের পরে তারা অবশ্যই নিশ্চিত করবে যে, তারা সংসদে প্রয়োজন অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে গৃহীত সংস্কার কার্যক্রমগুলো অনুমোদন করবে যাতে করে নতুন সংসদে এগুলোকে আইন আকারে গৃহীত হয়৷ যেকারণে এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সুপারিশমালা শুধুমাত্র তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রতি নয়, এটি রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যেও৷ আগামীতে যারা সরকার ও সংসদ গঠন করবে তারা যতক্ষন পর্যন্ত স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও আইনের শাসনের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ না হচ্ছেন, মানবাধিকারের সংস্কারের সঙ্গে একমত হচ্ছেন এবং ক্ষমতায় এসে আইন, নীতিমালা ও চর্চাতে তার প্রতিফলন না ঘটাচ্ছেন ততোক্ষণ পর্যন্ত বাংলাদেশের জনগণের কার্যকর মানবাধিকার অব্যাহতভাবে উপেক্ষিত হতে থাকবে৷

 

জরুরি অবস্থা চলাকালীন মানবাধিকারের খর্বসাধন

এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল লক্ষ্য করেছে জরুরি অবস্থা তুলে নেয়ার ব্যাপারে দাবী বাড়ছে৷ জাতিসংঘের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে জাতীয় জীবন যখন হুমকির সম্মুখীন হবে তখন একটি রাষ্ট্রকে কঠোর শর্তাবলীর অধীনে কিছু নির্দিষ্ট ধরনের মানবাধিকারের প্রতি দায়িত্ব খর্ব করা যেতে পারে৷[৫] তবে, এই ধরনের মানবাধিকার খর্ব করার বিষয়টি তখনই করা যাবে যখন জাতির জন্যে হুমকি দেখা দেবে, যদিও এটি করতে গিয়ে অন্যান্য আন্তর্জাতিক আইন লংঘন করা যাবে না কিংবা বৈষম্য করা যাবে না৷ মত প্রকাশের স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা, সমবেত হওয়া কিংবা সংগঠন করাসহ সকল ধরনের জরুরি পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন দ্বারা বৈধ কিনা তা খতিয়ে দেখা দরকার৷

 

নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আইনে নির্দিষ্ট কিছু অধিকারকে[৬] খর্ব করা যাবে না বলে সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে৷ যার মধ্যে রয়েছে, নির্যাতন ও নৃশংসতা, অমানবিক বা অশ্রদ্ধাপূর্ণ ব্যবহার, জীবনের প্রতি অধিকার, আইনের চোখে একজন ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার অধিকার, এবং চিন্তা, বিবেক ও ধর্মের স্বাধীনতা৷

 

জরুরি অবস্থা কোনোভাবেই ইচ্ছেকৃতভাবে কাউকে স্বাধীনতা থেকে কিংবা সুষ্ঠু বিচার পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারে না৷ এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বিশ্বাস করে যে জরুরি বিধির কিছু দিক আছে যেগুলো হয়তো অনেক বেশি বিস্তৃতভাবে সাজানো হয়েছে কিংবা এমনভাবে বাস্তবায়িত করা হচ্ছে যে, আটককৃত ব্যক্তির অধিকারের লংঘন ঘটছে এবং এই ধরনের বিষয়গুলো অবশ্যই জরুরিভিত্ততে পর্যালোচনা ও সংশোধন হওয়া দরকার৷

 

এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আরো বিশ্বাস করে যে জরুরি ক্ষমতা আইনের (ইপিআর) এর অধীনে কিছু কিছু বিধিনষেধ আরোপ করা হয়েছে যা প্রয়োগ করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিততে যা করা যায় তাকে ছাড়িয়ে গিয়েছে৷ তত্ত্বাবধায়ক সরকার অবশ্যই মানুষের মত প্রকাশ, সমাবেশ করা ও সংগঠন করার অধিকারের উপর আরোপিত বিধিনষেধ পর্যালোচনা করে সংশোধন করার ব্যবস্থা নেবেন৷ এই ধরনের বিধিনষেধ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের লক্ষ্য উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কারণ এর মাধ্যমে দেশে একটি অংশগ্রহণমূলক ও মতামতভিত্তিক পরিবেশ তৈরি করা সুযোগকে সীমিত করে রাখা হয়েছে৷ প্রাতিষ্ঠানিক ও নির্বাচনী সংস্কার প্রক্রিয়ার সফলতার জন্যে অংশগ্রহণমূলক ও মতামতভিত্তিক পরিবেশ থাকা অবশ্যই দরকার৷

 

যা করণীয়


জরুরি আইন জারির প্রথম বর্ষপূর্তিতে এবং দেশ যখন ২০০৮ সালের নভেম্বরে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রতি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেয়ার জন্যে আহ্বান জানাচ্ছে যাতে করে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হয়, এবং রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে যে, তারা যেন শাস্তির উর্ধ্বে থাকার সংস্কৃতির অবসানে, মানবাধিকার সুরক্ষায় এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রদর্শন করে৷ সংস্থাটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রতি আরো আহ্বান জানাচ্ছে যে, তারা যেন সুশীল সমাজের সংগঠন-সহ সকল স্টেকহোল্ডারদের সম্পৃক্ত করে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ করেন৷


এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে যে,

• মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক আইনগত বাধ্যবাধকতাগুলো সমুন্নত রাখা৷ বাংলাদেশ স্বাক্ষরিত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তিগুলো বাস্তবায়ন এবং এই সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রদান, এবং আন্তর্জাতিক নীতিগুলোর বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার ও নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপন, নীতিমালার নির্দেশিকা ও জবাব দিহিতার পদক্ষেপ গ্রহণ৷

• জরুরি অবস্থা চলাকালে আন্তর্জাতিক আইনে মানবাধিকার খর্ব করার যে সীমা বেঁধে দেয়া আছে তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা৷ জরুরি অবস্থার প্রেক্ষাপটে মানবাধিকার বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনে উল্লেখিত নীতি মেনে চলা, এক্ষেত্রে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে ও মানবাধিকার চুক্তিগুলোতে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার যে বাধ্যবাধকতা আছে সেই বিষয়টি বিবেচনায় রাখা৷

• যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করে শাস্তির উর্ধ্বে থাকার যে সংস্কৃতি তার অবসানে উদ্যোগ নেয়া৷ সত্য ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পূর্ণ ও কার্যকর ক্ষতিপূরণ প্রদানের লক্ষ্যে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে তদন্ত কমিশন গঠন৷

• বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা৷ নির্বাহী বিভাগকে বিচার বিভাগ থেকে আলাদা করার ধারা অনুসরণ করে এটি নিশ্চিত করা যে একটি সত্যিকারের স্বাধীন ও কার্যকর বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যে স্বাধীন বিচার বিভাগীয় কমিশন কিংবা অনুরূপ সংস্থা প্রতিষ্ঠাসহ অন্যান্য পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে যাতে করে বিচার বিভাগের নিয়োগ, চাকরির শর্তাবলী ও চাকরির মেয়াদকালে নিরাপত্তা পর্যাপ্ত টেকসই তহবিল নিশ্চিত করা৷

• আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে মানবাধিকারভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পুলিশ বিভাগের সংস্কার৷ একটি স্বাধীন তত্ত্বাবধান ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা; যাতে করে একটি আইনী ও নীতি কাঠামো নিশ্চিত করা সম্ভব হয় যেখানে আইনী আচরণবিধিসহ মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় থাকবে৷

• বিধিবহির্ভূত আটকাদেশের অবসান এবং উপযুক্ত প্রক্রিয়া অনুসরণের নিশ্চয়তা ও সুষ্ঠু বিচার পাওয়ার অধিকার৷ বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪ বিলোপ; এটি নিশ্চিত করা যে, আইনের উপযুক্ত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে; আটককৃত ব্যক্তিরা নির্দিষ্ট স্বীকৃত অপরাধের কারণে সাজা পাচ্ছে এবং তাদেরকে আদালতে হাজির করা হচ্ছে কিংবা মুক্তি দেয়া হচ্ছে; সাজাপ্রাপ্তরা ক্রিমিনাল প্রসিডিউর কোড এর ৫৪ ধারা মতে গ্রেফতারের পর পর আইনজীবি, পরিবার ও চিকিত্সা সুবিধা পাচ্ছে৷

• নিরাপত্তা ও সামরিক বাহিনী কর্তৃক মানবাধিকার লংঘনের ক্ষেত্রে শাস্তির উর্ধ্বে থাকার ঘটনার অবসান৷ যখন আইন প্রয়োগের ক্ষমতাসহ নিরাপত্তা ও সামরিক বাহিনীর সদস্যদের কাজে নিয়োজিত করা হবে তখন তাদের জবাব দিহিতার ব্যবস্থা পুলিশের মতোই হতে হবে; তারা অবশ্যই শক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান মেনে চলবে যা পুলিশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য; এবং নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারসহ মানবাধিকার লংঘনের সকল অভিযোগ বেসামরিক বিচার ব্যবস্থার অধীনে তদন্ত করতে হবে৷

• একটি স্বাধীন ও পূর্ণ ক্ষমতাশীল জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (এনএইচআরসি) প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তা৷ এনএইচআরসি চালু করার লক্ষ্যে একটি সুস্পষ্ট বেঞ্চমার্ক ও নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারন হবে; আইন দ্বারা একে স্বাধীন করতে হবে, যার অন্তর্ভুক্ত থাকবে সদস্য নির্বাচন, অর্থায়ন ও সম্পদ; মানবাধিকার লংঘনের বিষয়গুলো তদন্তের ক্ষেত্রে এনএইচআরসিকে নিরাপত্তা ও সশস্র বাহিনীর সদস্যসহ সব দায়িত্ব প্রাপ্ত ব্যক্তিদের জবাব দিহিতা নিশ্চিত করার জন্যে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দিতে হবে৷

• মত প্রকাশের স্বাধীনতার সুরক্ষাপ করতে হবে৷ সাংবাদিক ও মানবাধিকার রক্ষাকারী ব্যক্তি/কর্মীদের মানবাধিকার লংঘনের মতো ঘটনার শিকার হওয়া থেকে রক্ষা করতে এবং এই ধরনের কর্মকান্ডের অবসানে কাজ করতে হবে; প্রস্তাবিত তথ্য অধিকার আইন পাস করতে হবে; মুদ্রিত ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে একটি স্বাধীন বিভাগ প্রতিষ্ঠা করতে হবে৷

 

উপরে উল্লেখিত সুপারিশমালা গণতান্ত্রিক নির্বাচনের সঙ্গে সংশিষ্ট রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কিংবা নির্বাচন কমিশনের সংস্কারের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নয়, যদিও এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অবগত আছে যে, নির্বাচন কমিশন নিজে থেকে এবং সুশীল সমাজের সংগঠনগুলো পক্ষ থেকে একটি স্বাধীন কমিশন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও অন্যান্য পদক্ষেপ নেয়ার জন্যে সরকারের কাছে দাবী জানিয়ে আসছে৷ এছাড়াও এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল  গণতান্ত্রিক নির্বাচনের ব্যাপারে বাংলাদেশের জনগণের জোরালো সমর্থনের বিষয়ে পুরোপুরি জ্ঞাত রয়েছে৷ এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বিশ্বাস করে যে এই স্মারকলিপিতে প্রস্তাবিত সুপারিশমালা সুশাসন ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা বাড়িয়ে তোলার মাধ্যমে একটি স্বাধীন ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্যে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখবে৷

 

এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল স্বীকার করে যে ব্যাপক অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জসমূহ, নির্দিষ্ট করে বললে বাংলাদেশের জনগণ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার গত বছর যে প্রাকৃতিক দুর্যোর্গের মুখোমুখি হয়েছে, এই ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় বাংলাদেশকে একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে৷ এই স্মারকলিপি দারিদ্র্য, পরিবেশগত অবক্ষয় কিংবা নারীর ক্ষমতায়ন সংশ্লিষ্ট মানবাধিকারের বিষয়গুলো নিয়ে সরাসরি কিছু বলছে না৷[৭] এই স্মারকলিপিতে প্রস্তাবিত সুপারিশমালা যদি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা হয় তবে তা দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার পরিবেশের উন্নয়ন ঘটাতে এবং তাদেরকে সুবিচার পেতে সক্ষম করে তুলবে৷

 

১. বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তিগুলোতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর একটি৷ চুক্তিগুলোর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি; অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি, নির্যাতন এবং অন্যান্য নৃশংসতা, অমানবিক ও অবমাননামূলক আচরণ সংক্রান্ত চুক্তি; সকল ধরনের জাতিগত বৈষম্য দূরীকরণ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি; নারীর প্রতি সকল ধরনের বৈষম্য বিলোপ সংক্রান্ত সনদ এবং শিশু অধিকার সনদ৷ বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে এখনো যেসকল চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তির ঐচ্ছিক প্রটোকল এবং নির্যাতন ও অন্যান্য নৃশংসতা, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ বা শাস্তি বিষয়ক সনদের ঐচ্ছিক প্রটোকল৷

২. বাংলাদেশ সফরে যারা আসতে চেয়েছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন বিচার বহির্ভূত হত্যা বিষয়ক বিশেষ দূত, পর্যাপ্ত বসতবাড়ি সংক্রান্ত বিশেষ দূত, বিচারক ও আইনজীবিদের স্বাধীনতা বিষয়ক বিশেষ দূত এবং সংখ্যালঘু বিষয়ক বিশেষজ্ঞ৷ সরকার ধর্মের স্বাধীনতা বিষয়ক বিশেষ দূতের সফরের বিষয়ে রাজী হলেও এই সফরের দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি৷

৩. জাতিসংঘের নথি, ই/সিএন.৪/২০০৫/১০২/এডিডি.১৷

চলবে...............

AttachmentSize
Bangladesh_Memo.pdf258.74 KB