প্রতিকৃতিঃ ন্যায়বিচারের সুদীর্ঘ পথ
তার নিরাপত্তার প্রতি অসংখ্য হুমকি সত্ত্বেও বিলকিস ইয়াকুব রসুল নিজের মাটিতে দাঁড়িয়ে আছেন, ন্যায়বিচারের জন্য সংগ্রাম করছেন৷ গত ছয় বছরে, তিনি পশ্চিম-মধ্য ভারতে তার মাতৃভূমি গুজরাটের মধ্যে এবং গুজরাটের বাইরে, অন্তত ২০০ বার বাড়ি বদল করেছেন৷ তিনি ২০০২ সালের মার্চ মাসের রক্তাক্ত সাম্প্রদায়িক সহিংসতা থেকে বেঁচে যাওয়া একজন মানুষ যা রাজ্যটিকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে তার আত্মীয়দের অনেকের জীবন কেড়ে নিয়েছিল৷
৩ মার্চ ২০০২ তারিখে যখন বিলকিসের ছোট মেয়েশিশুটি সহ তার পরিবারের ১৪ জন সদস্যকে তার চোখের সামনে হত্য করা হয়, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৯ বছর৷ পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা বিলকিস তখন ধর্ষিতা হন৷ ঘটনাগুলো পুলিশকে জানানো সত্ত্বেও মামলাটি ২০০৩ সালের জানুয়ারিতে বন্ধ করে দেয়া হয়৷ পুলিশ দাবী করে যে দায়ী ব্যক্তিদেরকে খুঁজে পাওয়া যায়নি৷ যখন তিনি ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য চাপ দেন, তখন দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা তাকে জানান যে তাকে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে এবং তিনি ধর্ষণের কথা প্রকাশ করলে তাকে একটি “বিষাক্ত ইনজেকশন” দেয়া হবে৷
ন্যায়বিচারের জন্য বিলকিসের অটল ও সাহসী প্রচারাভিযানের ফলশ্রুতিতে, ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট তার মামলাটি পুনরায় চালু করার জন্য আদেশ দেয়৷ তারা ‘সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন’ (সিবিআই) বা ‘কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা’র কাছে মামলাটি হস্তান্তর করে, এবং মামলাটি গুজরাটের বাইরে বদলি করার জন্য চাপ দেয়৷ ২০০৮ সালের জানুয়ারিতে, একটি বিশেষ আদালত (সিবিআই-এর এখতিয়ারের অধীনে) বিলকিসকে দলগতভাবে ধর্ষণ ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যাকান্ডে তাদের ভূমিকার কারণে ১২ জনকে (একজন বিচার চলাকালীন সময়ে মারা যায়) দোষী সাব্যস্ত করে এবং যাবজ্জীবনের দ্বিগুণ কারাদন্ডে দন্ডিত করে৷ তার প্রতিবেদন সম্পর্কে ভুয়া অভিযোগ নথিভুক্ত করার জন্য একজন পুলিশ কর্মকর্তাকেও দোষী সাব্যস্ত করা হয়৷ তবে, ছয় জন পুলিশ কর্মকর্তা ও একজন ডাক্তারকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়৷ যদিও অধিকাংশ পর্যবেক্ষক এই রায়কে ন্যায়বিচার হিসেবে দেখলেও, বিলকিসের সাথে কাজ করা অনেক কর্মী উদ্বিগ্ন৷ তারা বিশ্বাস করেন যে এটি বেকসুর খালাস পাওয়া ব্যক্তিবর্গ এবং দন্ডিতদের দ্বারা যে কোনো আপিল করা হলে উভয়ের বিরুদ্ধে একটি অব্যাহত দুরূহ আইনী লড়াই সৃষ্টি হবে৷
মামলাটি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে, সিবিআই-এর পরিচালক বিজয় শংকর বলেন, “আমি অবাক হয়েছি কেন অন্যান্য অভিযুক্ত পুলিশদেরকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি৷” সিবিআই-এর তদন্তে গুজরাটে দাহদ নদীর পাশে একটি কবর উন্মোচিত হয়েছে, যাতে হত্যা করা বিলকিসের পরিবারের সদস্যদের অবশিষ্টাংশ রয়েছে৷ সাক্ষ্যপ্রমাণ ও মামলার নথিপত্র নষ্ট করার সাথে পুলিশ কর্মকর্তারা অবৈধভাবে জড়িত থাকার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে৷ কবরটিতে কয়েক টন লবণ ঢালা হয়েছে এবং সাতটি মৃতদেহ থেকে মাথা আলাদা করে ফেলা হয়েছে যাতে দেহগুলো চিহ্নিত করা না যায়৷
কর্মীদের সাথে সাথে এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন যে মুসলিম নারীদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার অভিযোগ যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করা হয়নি৷ ২০০২ সালে গুজরাটে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা শুরু হওয়ার পর থেকে শত শত মুসলিম নারী যৌন আক্রমণ ও ধর্ষণের শিকার হওয়ার ঘটনা ক্রমাগতভাবে রিপোর্ট করা হলেও, শুধুমাত্র অল্প কয়েকটি অপরাধের অভিযোগ নিবন্ধন করা হয় এবং শুধুমাত্র একটি মামলায় দন্ডাদেশ দেয়া হয় - সেটি হচ্ছে বিলকিস বানো৷ এটি উল্লেখ করে, ‘কমিটি অন দি কনভেনশন অব অল ফর্মস অব ডিসক্রিমিনেশন অ্যাগেইনস্ট উওম্যান’ (সিইডিএডব্লিউ) “নারীদের উপর গুজরাটে নৃশংস গণহত্যার প্রভাব” সম্পর্কে ভারতের অপর্যাপ্ত তথ্য প্রদান সম্পর্কে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে৷ কমিটি ২০০৮ সালের জানুয়ারি মাসের মধ্যে গুজরাটে মুসলিম নারীদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার উপর একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রদানের অনুরোধ জানিয়েছে৷ এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানে না যে এই ধরনের কোনো প্রতিবেদন সরকারের তরফ থেকে প্রদান করা হয়েছে কিনা৷
তথাপি, বিলকিস ইয়াকুব রসুল হার না মানার অঙ্গীকার করেছেন৷ তার মামলার পক্ষে এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সদস্যবৃন্দ এবং অন্যান্য প্রচারকর্মীসহ বিশ্বজুড়ে সমর্থন দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে, তিনি চাপ বাড়ানোর প্রতিজ্ঞা করেছেন এবং পুলিশ কর্মকর্তাদেরকে নির্দোষ ঘোষণার বিরুদ্ধে আপিল করার বিষয়টি বিবেচনা করছেন৷ “প্রাথমিক অবস্থায় এটি ছিল একটি অত্যন্ত ভীতিকর ও নিঃসঙ্গ অভিজ্ঞতা, কিন্তু সবার সমর্থনের সাথে সাথে এখন আমার বেশ আস্থা আছে। এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অতিক্রম করতে আমার শুধু সক্ষমতার উপর নয়, বরং সেইসাথে এখন আমার আশা আছে যে আইনী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ন্যায়বিচার পাওয়া সম্ভব৷”