বাংলাদেশ

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
রাষ্ট্রপ্রধান: ইয়াজউদ্দিন আহমেদ
সরকার প্রধান: ইয়াজউদ্দিন আহমেদ (গত অক্টোবরে বেগম খালেদা জিয়ার স্থলাভিষিক্ত হন)
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত: স্বাক্ষরিত
রাজনৈতিক সহিংসতার বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলোর ক্যাডার বাহিনী  অব্যাহতভাবে মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা ঘটিয়েছে৷ পুলিশ বাহিনী অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির দাবীতে রাস্তায় বেরিয়ে আসা বিক্ষোভকারী এবং বিরোধী দলীয় কর্মীদের মিছিলে মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেছে৷ রাজনৈতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে ইচ্ছামাফিক (বিধিবহির্ভূতভাবে) ব্যাপক ধরপাকড় চলেছে৷ শাসক ও বিরোধী দলীয় সমর্থকদের মধ্যে সংঘটিত সহিংস সংঘাতে কিংবা বোমার আক্রমণে অনেক লোক মারা গিয়েছে৷ নারীরা এসিড আক্রমণসহ নানান ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছে৷ মৃত্যুদন্ড দেয়ার রেওয়াজ চালু রয়েছে এবং একজনের মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে৷
পটভূমি
ক্ষমতাসীন জোট সরকার এবং বিরোধী দলীয় জোটের মধ্যেকার বেড়ে উঠা চাপা উত্তেজনা একাধিক সহিংস সংঘাতের সৃষ্টি করে যা অনেক লোকের মৃত্যুর কারণ হয় এবং আরো কয়েকশ ব্যক্তি আহত হয়৷
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলো প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবীতে জনগণের অংশগ্রহণে ব্যাপক বিক্ষোভ গড়ে তোলে৷ তার বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র সমর্থক হওয়ার অভিযোগ উত্থাপন করা হয়৷ এছাড়াও বিরোধী দল নির্বাচন কমিশনের গঠন নিয়েও বিরোধীতা করে এবং ভোটার তালিকা প্রস্তুত প্রক্রিয়াকে পক্ষপাতদুষ্ট ও ত্রুটিপূর্ণ বলে ঘোষণা করে৷
সরকার পূর্বনির্ধারিত সময়ে অর্থাত্ অক্টোবরের শেষদিকে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়৷ এরপর সদ্য বিদায়ী ক্ষমতাসীন দল এবং বিরোধী দলীয় সদস্যদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা তার পদ ছেড়ে দেন৷ এ অবস্থায় বিতর্কিত পরিস্থিতির মধ্যে প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহমেদ নিজেকে প্রধান উপদেষ্টা পদে নিযুক্তি দেন৷ তার এই সিদ্ধান্ত সংবিধানের লংঘন কিনা তা নিয়ে অনিস্পন্ন বিতর্ক রয়েছে৷
এদিকে একই সময়ে উন্নত আর্থিক অবস্থার দাবীতে গার্মেন্টস শ্রমিক, কৃষক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ধর্মঘট ও ব্যাপক বিক্ষোভে লিপ্ত হয়৷
সহিংসতা ও অপব্যবহারের প্রক্রিয়া
বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে কিন্তু তার মাত্রা আপাতদৃষ্টিতে আগের বছরগুলোর তুলনায় অনেক কম ছিলো৷ বোমা হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিলো বিরোধী দলের সদস্যরা এবং আদালত প্রাঙ্গন৷
অক্টোবরের ৩১ তারিখে রাজশাহীতে একটি বোমা হামলার ঘটনা ঘটে৷ গণফোরামসহ কয়েকটি বিরোধী দলের উপর এই বোমা হামলা চালানো হয়৷ হামলার শিকার বিরোধী দলগুলো দাবী করে এই হামলার জন্য দায়ী হলো জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের ক্যাডাররা৷ নভেম্বরের ১৫ তারিখে আওয়ামী লীগ কার্যালয়গুলোর কাছাকাছি এলাকায় ছোট ধরনের সিরিজ বোমা বিস্ফোরণে অন্তত ৮ জন ব্যক্তি আহত হন৷ বোমা হামলার এসকল ঘটনায় কাউকেই দোষী সাব্যস্ত করে বিচারের আওতায় আনা হয়নি৷
বছরের শেষ পর্যন্ত কাউকে ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগের নেতা শেখ হাসিনার উপর গ্রেনেড হামলার জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি৷
নির্বাচনী সহিংসতা
ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন নিয়ে সংঘটিত সংঘর্ষে অনেক লোক মারা গিয়েছে৷ এজন্য এখনও পর্যন্ত কাউকে দোষী সাব্যস্ত করে বিচার করা হয়নি৷
মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা অধিকার-এর মতে, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগসহ কয়েকটি দাবীতে দুটি প্রধান দলের মধ্যে সংঘটিত ২৭ অক্টোবর এবং ৫ নভেম্বরের সহিংসতায় অন্ততপক্ষে ৫০ জন মারা গিয়েছেন এবং ২৫০ জনের বেশি ব্যক্তি আহত হয়েছেন৷
পুলিশের নৃশংসতা
পুলিশ বিরোধী দলের মিছিলে বারে বারে আক্রমণ করেছে, তারা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী বিরোধী দলীয় নেতাদের উদ্দেশ্য করে আক্রমণ চালিয়েছে এবং তাদের বেদমভাবে পিটিয়েছে৷
পুলিশের বেধড়ক পিটুনিতে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা সাবের হোসেন চৌধুরী মাথায় আঘাত পান৷ ৬ সেপ্টেম্বর তাকে ১২ জনেরও বেশি পুলিশ অফিসার বেধড়কভাবে পেটায়৷
বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য আসাদুজ্জামান নূরকে পুলিশ বেধড়ক পেটায় ১২ সেপ্টেম্বর, ফলে তাকে মারাত্মক পিঠের আঘাত নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়৷ এই ধরনের কাজে লিপ্ত হওয়া পুলিশ অফিসারদের কাউকেই বিচারের সম্মুখীন করা হয়নি৷
পুলিশ ব্যাপকভাবে তাদের শক্তি প্রয়োগের পাশাপাশি বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে তাজা বুলেট পর্যন্ত ব্যবহার করতে শুরু করে, ফলে কয়েক ডজন মানুষের মৃত্যুসহ শতাধিক মানুষ আহত হন৷
বিদ্যুত্ স্বল্পতাকে ঘিরে ফুসে উঠা বিদ্রোহে পুলিশের গুলিবর্ষণ, রাবার বুলেট ছোড়া এবং টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপের ফলে অন্ততপক্ষে ১৭ জনের মৃত্যু ঘটে৷ এই ঘটনাটি ঘটেছে উত্তরবঙ্গের শহর কানসাটে এপ্রিল মাসে৷ হত্যাকান্ডের এই ঘটনার তদন্তে কোনো স্বাধীন কমিশন গঠন করা হয়নি৷
গত ২৬ আগস্ট বৃটিশ প্রতিষ্ঠান এশিয়া এনার্জি করপোরেশনের উম্মুক্ত কয়লা খনি স্থাপনের প্রতিবাদে ফুলবাড়িয়াতে সাধারণ জনগণ ব্যাপক বিক্ষোভে লিপ্ত হলে পুলিশ এবং আধাসামরিক বাহিনী বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) এর গুলিবর্ষণে অন্ততপক্ষে ৫ জন মারা যান এবং ১০০ এর বেশি লোক আহত হন৷ এই ঘটনার পর সরকার এলাকাবাসীর কয়েকটি দাবী মেনে নিতে সম্মত হয় এবং জনগণকে আশ্বস্ত করে যে, এখানে কয়লা খনি স্থাপনের ফলে কাউকে জোর করে উচ্ছেদ করা হবে না কিংবা তাদের জীবনধারণের ক্ষতি হয় এমন কোনো কাজ করা হবে না৷

গণ গ্রেফতার
বিরোধী দলগুলোর পূর্বপরিকল্পিত মিছিল সভা সমাবেশের আগে আগে হাজার হাজার লোককে নির্র্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই গণ-গ্রেফতার করা হয়েছে এবং অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িত থাকার সন্দেহে হাজার হাজার লোককে হাজতে ঢোকানো হয়েছে৷ বিনা বিচারে আটক এসকল ব্যক্তির পরিবারকে তাদের হাজতবাসের কথা জানানো হয়নি৷ ফলে, তাদের পরিবারের সদস্যরা পুলিশ স্টেশনগুলোতে তাদের খোজে আসতে বাধ্য হয়েছেন৷ এদের মধ্যে অনেককে বিনা চার্জে কিংবা বিচারে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত বন্দী রাখা হয়েছে এবং বাকিদের কয়েক দিনের মধ্যে জামিনে মুক্তি দেয়া হয়েছে৷
নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা
নির্যাতন করে নারীদের হত্যা করা কিংবা যৌতুকের দাবী পরিশোধ না করার কারণে শ্বাসরোধ করে নারীদের মেরে ফেলার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে৷ নারীরা এসিড আক্রমণের শিকার হচ্ছে৷ বাসাবাড়িতে কাজের মেয়েরা বাড়তি সময় কাজ না করতে পারার অপরাধে খারাপ আচরণের শিকার হচ্ছে কিংবা তাদেরকে হত্যা করা হচ্ছে৷
বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব লেবার স্টাডিজের এক রিপোর্ট মতে, শুধুমাত্র ঢাকা শহরে ২০০০ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে বাসাবাড়িতে কর্মরত কমপক্ষে ১৬৯ জন কাজের মেয়ে হত্যার শিকার হয়েছেন৷ আরো ১২২ জন গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন এবং ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৫২ জন৷ নির্যাতনের শিকার কাজের মেয়েদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু মেয়ে৷

মৃত্যুদন্ড
অন্ততপক্ষে ১৩০ জনকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হয়েছে এবং একজনকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে৷
এমেনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের কান্ট্রি রিপোর্ট (দেশভিত্তিক প্রতিবেদন) দেখার জন্য ভিজিট করুন
রিপোর্ট/প্রতিবেদন
বাংলাদেশ: রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যে মানবাধিকার ইস্যু বিষয়ে ব্রিফিং (এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইনডেক্স: আশা ১৩/০১২/২০০৬)
বাংলাদেশ: সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর (এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইনডেক্স: আশা ১৩/০১৪/২০০৬)