২২ মে ২০০৮
বিশ্বের খাদ্য সঙ্কট নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের বিষয়ভিত্তিক প্রথম বিশেষ অধিবেশন উপলক্ষ্যে এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বিবৃতি৷
মাননীয় সভাপতি,
এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বিশ্বের খাদ্য সঙ্কট নিয়ে মানবাধিকার পরিষদের প্রথম বিষয়ভিত্তিক বিশেষ অধিবেশন অনুষ্ঠানকে স্বাগত জানায়৷
আমরা বিশ্বাস করি যে, বিশ্বের খাদ্য সঙ্কট মানবাধিকারের ক্ষেত্রে একটি বিশ্বব্যাপী জরুরি অবস্থা, যা পর্যাপ্ত খাদ্য পাওয়ার অধিকারসহ অন্যান্য মানবাধিকার লংঘনের মাধ্যমে আরো বেশি নাজুক পরিস্থিতি তৈরি করেছে৷ এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব হলো দ্রুততার সঙ্গে পর্যাপ্ত খাদ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা যাতে ক্ষুধা প্রতিরোধ করা যায় এবং ক্রমবর্ধমান খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মূল কারণগুলো চিহ্নিত ও সমাধান করা যায়৷
আমরা পরিষদকে একথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, মানবাধিকার লংঘনের সরাসরি ফলস্বরুপ বিশ্বের কয়েক লাখ মানুষ খাদ্যের নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষুধায় ভোগে৷ সংস্থা (এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল) গবেষণা থেকে দেখেছে খাদ্য বিতরণে বৈষম্য, রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্টতা, প্রয়োজনীয় মানবাধিকার বিষয়ক সহায়তার অভাব ও অন্যান্য ধরনের মানবাধিকারের লংঘন অনেক দেশে গণদুর্ভিক্ষের কারণ৷ বিশেষ করে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখন্ড (বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য গাজা উপত্যকা), মায়ানমার, উত্তর কোরিয়া, সোমালিয়া, সুদান (দারফুর), এবং জিম্বাবুয়ে এই ধরনের সমস্যার মধ্যে রয়েছে৷
গাজা-তে বর্তমান সঙ্কট ইসরাইল-আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে ইতিমধ্যে মৃতপ্রায় অবস্থায় বেঁচে থাকা প্রায় ১৫ লাখ ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্ভোগ আরো বাড়িয়েছে৷ এই ইসরাইল আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে গাজা উপত্যকায় খাদ্য ও অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় পণ্যসামগ্রী যেতে পারে না এবং যার মধ্যে ওষুধসহ বিভিন্ন ধরনের মানবিক সহায়তাও রয়েছে৷
এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মায়ানমারে মানবিক সাহায্য কার্যক্রমকে বাঁধাগ্রস্ত করার ক্ষেত্রে মায়ানমার সরকারের ভূমিকার বিষয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে৷ প্রয়োজনীয় মানবিক সাহায্য না পাওয়ার কারণে হাজার হাজার লোক দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি ও তারা জীবনের জন্যে হুমকিস্বরূপ রোগে ভুগছে৷ এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল খাদ্য সঙ্কটে ইচ্ছেমাফিক খাদ্য সংগ্রহের প্রভাবের বিষয়টি নিয়ে অনেক বছর ধরে প্রতিবেদন লিখছে এবং এখন সুনির্দিষ্টভাবে উদ্বিগ্ন, সম্প্রতি প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদনের কারণে৷ যেখানে বলা হয়েছে, দেশের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ দুর্ভিক্ষের কারণে যখন সম্ভাব্য মৃত্যুর মুখোমুখি তখনও দেশের চাল রপ্তানি করা হচ্ছে৷
আমরা ক্যামেরুন, কোট ডি আইভরি, হাইতি, মিশর ও সেনেগালসহ কয়েকটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে খাদ্য নিয়ে বিক্ষোভকারী ও প্রতিবাদকারী এবং মানবাধিকার রক্ষাকারীদের বিরুদ্ধে অত্যধিক বল প্রয়োগসহ মানবাধিকার লংঘনের ধারাবাহিক প্রতিবেদন পেয়েছি, এ বিষয়ে মানবাধিকার পরিষদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই৷ ‘খাদ্য মজুদ’ যেখানে বড় ধরনের ইস্যু সেখানে মানবাধিকারের কাঠামোর মধ্যে থেকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে খাদ্য মজুদ বিষয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া দরকার৷
বর্তমান খাদ্য সঙ্কট মোকাবেলায় জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও নীতিমালা কাঠামোর অধীনে আরো বেশি ও কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে সম্মিলিত পদক্ষেপ নেয়া দরকার৷ আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বাধ্যবাধকতা বাস্তবায়ন করতে হলে সকল রাষ্ট্র সাহায্যপ্রার্থী রাষ্ট্রগুলোকে সহায়তা দিতে প্রস্তুত থাকতে হবে৷ অন্যথায় জনগণকে ক্ষুধামুক্ত রাখা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে 'সর্বনিম্ন যে বাধ্যবাধকতা' তা পূরণে একটি রাষ্ট্র অসমর্থ হবে৷ রাষ্ট্রসমূহকে অবশ্যই এও নিশ্চিত করতে হবে যে, তাদের নীতিমালা অন্য দেশগুলোর খাদ্যে অধিকার বাঁধাগ্রস্ত করবে না এবং খাদ্য সহজলভ্য করার ক্ষেত্রে অবশ্যই সহায়ক ভূমিকা পালন করবে৷ একটি রাষ্ট্র তার উপর অর্পিত বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করতে জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত পরিমানে খাদ্য সহজলভ্য করবে ও ক্ষুধা মোকাবেলার লক্ষ্যে জনগণের খাদ্য পাবার অধিকার প্রতিষ্ঠা করবে, সবচেয়ে অভাবগ্রস্তদের অগ্রাধিকার দেবে এবং ক্ষুধামুক্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দরকারী পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সহায়তার জন্যে অনুরোধ জানাবে।
খাদ্য সঙ্কটের সমাধান খুঁজে পেতে সকল ধরনের আন্তর্জাতিক উদ্যোগের ক্ষেত্রে মানবাধিকার বিষয়টিকে কাজের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখার কথা উল্লেখ করে ফুড ফার্স্ট ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক (এফআইএএন)-এর দেয়া যৌথ বিবৃতিকে আমরা সমর্থন করি৷
মানবাধিকার পরিষদও নিজে এবং এর বিভিন্ন ধরনের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সারা বিশ্ব জুড়ে খাদ্য সঙ্কট মোকাবেলার ক্ষেত্রে মানবাধিকার নিশ্চিত করতে এবং বর্তমান সঙ্কটের গোড়ার কারণগুলো খুঁজে বের করতে ও সেগুলোর সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে৷
এই অবস্থায় এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মানবাধিকার পরিষদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে যে:
• বিভিন্ন দেশে খাদ্যে নিরাপত্তাহীনতা অবস্থা তৈরিতে কিংবা খাদ্য পরিস্থিতি নাজুক করে তুলতে খাদ্যে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক বা রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কর্মকাণ্ড পরিচালনায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতিমালাসমূহ ও মানবাধিকারের লংঘন যে ভূমিকা পালন করেছে তা তদন্ত করে দেখা;
• বর্তমান খাদ্য সঙ্কট মোকাবেলায় যেকোনো ধরনের পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষেত্রে মানবাধিকার নিশ্চিত করার ব্যাপারে সকল রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানানো;
• খাদ্য সঙ্কটের ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতি মোকাবেলা ও মানবাধিকারের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা প্রদর্শনের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সহায়তা নিশ্চিত করার জন্যে সকল রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানানো;
• খাদ্যে অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সকল রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানানো যাতে সকলে স্পেশাল ৠাপোর্টিয়ার-কে তার কাজে সহায়তা করে৷ এক্ষেত্রে স্পেশাল ৠাপোর্টিয়ারের জরুরি আবেদন, যোগাযোগ, দেশ সফরের অনুরোধে দেশগুলো যেন দ্রুততার সঙ্গে পূর্ণ সাড়া দেয় এবং তার দেয়া সুপারিশমালা যেন ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে বিবেচনা করে; এবং
• সকল রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানানো যাতে যেকোনো ধরনের প্রতিবাদ কিংবা বিক্ষোভের ক্ষেত্রে যে পদক্ষেপ নেয়া হবে তা যেন কঠোরভাবে মানবাধিকারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয় এবং অন্যথায় মানবাধিকার লংঘনের প্রতিটি ঘটনা যেন দ্রুততার সঙ্গে ও পূর্ণভাবে তদন্ত করে দেখা হয়৷ এক্ষেত্রে অপরাধের মাত্রার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে উপযুক্ত শৃঙ্খলামূলক ও অপরাধমূলক ধারায় আইনী ব্যবস্থা নিতে হবে৷
খাদ্য সঙ্কট বিষয়ে মানবাধিকার পরিষদের এই বিশেষ অধিবেশনের আয়োজন এক্ষেত্রে মানবাধিকার পরিষেদের সম্পৃক্ততার সূচনা হওয়া উচিত্৷
Delicious
Digg
Facebook
Technorati