১৮ জুন ২০০৮
আমেরিকার সর্বোচ্চ আদালত (সুপ্রিম কোর্ট ) গত ১২ জুন ২০০৮ তারিখে কিউবার গুয়ানতানামো বে-তে আটক বন্দীদের অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছে। বোমেদিন বনাম বুশের মামলার রায়ে সর্বোচ্চ আদালত বলেছে যে, গুয়ানতানামো বে-তে আটক বন্দীরা তাদের আটকাদেশ চ্যালেঞ্জ করে আমেরিকার বেসামরিক আদালতে মামলা করতে পারবে। এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই রায়কে আমেরিকার সন্ত্রাস বিরোধী কর্মকাণ্ডে আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটি একটি অত্যাবশ্যক পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
এই রায় গুয়ানতানামোর বন্দীদের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিদ্যমান একটি মূল বাঁধা দূর করলো। এর ফলে আইনবিহীন বিচ্ছিন্ন পরিবেশ, জোরপূর্বক নীরবতা, দৃষ্টির অগোচরে ঘটে যাওয়ার মতো ঘটনা এবং অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার প্রয়োগ মতো ঘটনার অবসান ঘটবে।
সর্বোচ্চ আদালত গুয়ানতানামোতে আটক বন্দীদের হেবিয়াস করপাস (বন্দীকে সশরীরে আদালতে হাজির করে তাকে বন্দীত্বের কারণ প্রদর্শনার্থের আবেদন) আবেদন করার অধিকার মার্কিন প্রশাসন ও কংগ্রেস কর্তৃক খর্ব করা সংক্রান্ত পদক্ষেপকে (২০০৬ সালের মিলিটারি কমিশন অ্যাক্টের মাধ্যমে) অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করেছে। এছাড়াও আদালত হেবিয়াস করপাস এর বিকল্প হিসেবে মার্কিন প্রশাসন ও কংগ্রেস কর্তৃক চালু করা ব্যবস্থাকে অপর্যাপ্ত বলে উল্লেখ করে এই ধরনের ব্যবস্থাকে বাতিল করে দিয়েছে। এই ধরনের ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হলো ‘কমবাটেন্ট স্ট্যাটাস রিভিউ ট্রাইবুনাল’ (সিএসআরটি) বা শত্রুপক্ষীয়দের অবস্থা পর্যালোচনার জন্যে গঠিত আদালত। এর অধীনে তিনজন সামরিক কর্মকর্তার সমন্বয়ে গঠিত একটি প্যানেল আটক ব্যক্তির ‘এনিমি কমবাটেন্ট’ বা শত্রুপক্ষীয় অবস্থা নিরূপণ করেন। এক্ষেত্রে তাদের রায় যাচাই করার অত্যন্ত সীমিত সুযোগ রয়েছে। ২০০৫ সালের ডিটেইনি ট্রিটমেন্ট অ্যাক্ট (ডিটিএ) বা আটক বন্দীদের সঙ্গে আচরণ সংক্রান্ত আইন এর অধীনে সিএসআরটি-র মাধ্যমে দেয়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সীমিত আকারে পর্যালোচনা করার সুযোগ রয়েছে। গুয়ানতানামোতে বন্দীদের আটক করার পর প্রথম সিএসআরটি অনুষ্ঠিত হয়েছে দুই বছর পরে। তবে সম্প্রতি সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত দেয়ার আগ পর্যন্ত সিএসআরটি-র কোনো সিদ্ধান্তের বিচারের বিভাগীয় পর্যালোচনা হয়নি।
আমেরিকার সর্বোচ্চ আদালতে এই রায় ঘোষণার পর এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, ‘২০০৪ সালের পর এই নিয়ে তৃতীয়বারের মতো আমেরিকার সর্বোচ্চ আদালত বুশ প্রশাসনের দেয়া যুক্তিতর্ককে প্রত্যাখান করেছে। যেখানে বুশ প্রশাসন দাবী করেছে যে তারা যেকাউকে কোনো ধরনের অভিযোগ কিংবা বিচার ছাড়াই এবং কোনো ধরনের অর্থপূর্ণ বিচার পাওয়ার সুযোগ না দিয়েই অনির্দিষ্ট সময়ের জন্যে আটক করে রাখতে পারে।’ সংস্থাটি এই মামলার উপর একটি সংক্ষিপ্ত নথি তৈরি করেছে।
এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আরো বলেছে যে, “এখন ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’ মার্কিন সরকারের বন্দী আটক নীতিমালা ও চর্চাগুলো আন্তর্জাতিক মানদন্ডের সঙ্গে সমন্বয় করার সময় হয়েছে। এছাড়াও আটক ব্যক্তিদের বেসামরিক আদালতে বিচার চাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাঁধাসৃষ্টিকারী সকল ধরনের কর্মকান্ড অবশ্যই বন্ধ করা উচিৎ। আমেরিকার উচিৎ দ্রুততার সঙ্গে গুয়ানতানামো বন্ধ করে দেয়া, (মানুষের মৌলিক অধিকার হরণকারী) অন্যায্য সামরিক কমিশনের সকল ধরনের কর্মকাণ্ড পরিত্যাগ করা এবং হয় গুয়ানতানামো বে-তে আটক বন্দীদের মুক্তি দেয়া কিংবা আমেরিকার ফেডারেল আদালতে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা ও বন্দীদের মামলা লড়াইয়ের সুযোগ দেয়া।
রায় ঘোষণার পরপরই রাষ্ট্রপতি জর্জ ডব্লি্উ বুশ এই রায়ের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণকারী সংখ্যালঘু চারজন বিচারকের পক্ষ নেন। রাষ্ট্রপতি বলেন যে, ভিন্নমত পোষণকারীগণ জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়ে উদ্বিগ্ন এবং প্রশাসন ‘প্রদত্ত মতামতকে পর্যালোচনা করে দেখবে এবং এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আরো কোনো আইন প্রণয়নের দরকার আছে কিনা তাও বিবেচনা করবে যাতে করে আমরা আমেরিকান জনগণকে কোনো ধরনের দ্বিধা ছাড়াই সত্যিকারভাবে বলতে পারি: আমরা আপনাদের রক্ষার জন্যে যা কিছু করার সবকিছুই করছি।’
রাষ্ট্রপতির এই বক্তব্যে সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে যে, সংস্থা আশা করে সর্বোচ্চ আদালতের রায় বিষয়ে রাষ্ট্রপতির এই বক্তব্যকে প্রশাসন আদালতের রায় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো ইঙ্গিত হিসেবে গ্রহণ করবে না। কারণ অতীতে হামদান বনাম রামসফেল্ড মামলায় আটকাদেশ নীতিমালা ও চর্চার বিষয়ে সর্বোচ্চ আদালত সরকারের বিরুদ্ধে রায় দেয়ার পরপরই সরকার রায়কে এড়িয়ে যাওয়ার পরোক্ষ উপায় হিসেবে মিলিটারি কমিশন অ্যাক্ট বা সামরিক কমিশন আইন চালু করেছিল।
এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, ‘আটক প্রায় ২৮০ জন বন্দীর জন্যে ন্যায়বিচার পাওয়া অনেক দেরী হয়ে গিয়েছে। এখানে এমন অনেকেই আছেন যারা কোনো ধরনের আদালতে বিচারের সুযোগ পাওয়া ছাড়াই ছয় বছরেরও বেশি সময় ধরে আটক আছেন।’