মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতার ষাট বছর - সরকারসমূহকে ক্ষমা চেয়ে এখনই কাজে নেমে পড়তে হবে

২৮ মে ২০০৮

আজ এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ছয় দশক ধরে বিশ্বে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যর্থতার জন্যে ক্ষমা চেয়ে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেয়ার লক্ষ্যে পুনঃঅঙ্গীকারাবদ্ধ হতে বিশ্ব নেতৃবৃ্ন্দের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

 

‘দারফুর, জিম্বাবুয়ে, গাজা, ইরাক ও মায়ানমারের উত্তপ্ত মানবাধিকার পরিস্থিতি জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবী রাখে,’ এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বার্ষিক প্রতিবেদন এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল প্রতিবেদন ২০০৮: বিশ্বের মানবাধিকার পরিস্থিতি -র প্রকাশ অনুষ্ঠানে সংস্থার মহাসচিব আইরিন খান একথা বলেন।

তিনি বলেন,‘অবিচার, অসমতা ও বিচারের ঊর্ধ্বে থাকার মতো বিষয়গুলো এখন আমাদের বিশ্বের নজির হয়ে দাড়িয়েছে। এই অবস্থায় অঙ্গীকার ও অঙ্গীকার বাস্তবায়নের মধ্যে যে বিশাল দূরত্ব সেটি দূর করার জন্যে সরকারসমূহের এখনই পদক্ষেপ নেয়া দরকার।’

এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বার্ষিক প্রতিবেদন ২০০৮ থেকে দেখা যায় জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণার ষাট বছর পরেও অন্তত ৮১টি দেশের মানুষ নির্যাতিত কিংবা দুর্ব্যবহারের শিকার হচ্ছে, অন্তত ৫৪টি দেশের মানুষ অন্যায্য বিচারের মুখোমুখি হচ্ছে এবং অন্তত ৭৭টি দেশের মানুষ স্বাধীনভাবে তাদের মত প্রকাশ করতে পারছে না।

আইরিন খান আরো বলেন, ‘২০০৭ সালের বৈশিষ্ট্য হলো এসময়ে বিশ্বের ইতিহাসে নিকৃষ্ট ধরনের মানবাধিকার সঙ্কট মোকাবেলার ক্ষেত্রে পশ্চিমা সরকারসমূহ চরম অক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে এবং একইসময়ে উদীয়মান ক্ষমতাশালী দেশগুলো এক ধরনের বৈপরীত কর্মকান্ড বা নিস্পৃহতার পরিচয় দিয়েছে যা সংঘাত-সংঘর্ষ তৈরি করা থেকে শুরু করে অসমতাকে বাড়িয়ে তোলা পর্যন্ত অনেক কিছুকেই প্রভাবিত করেছে। ফলে বিশ্বের কয়েক কোটি মানুষ পিছিয়ে পড়েছে।’

এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সতর্ক করে দিয়ে বলেছে যে, ভবিষ্যতে মানবাধিকারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় হুমকি হলো দূরদৃষ্টির শরিক (শেয়ারড ভিশন) ও সম্মিলিত নেতৃত্বের অনুপস্থিতি।

আইরিন খান আরো বলেন, ‘২০০৮ সাল নতুন নেতৃত্বের জন্যে ক্ষমতায় যাওয়ার অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি করেছে। বিশ্বের উদীয়মান দেশগুলোর জন্যে নতুন দিক নির্দেশনা তৈরির ক্ষেত্রেও এটি একটি বড় ধরনের সুযোগ তৈরি করেছে এবং সেসঙ্গে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অদূরদৃষ্টিসম্পন্ন নীতিমালা ও চর্চাগুলো যার কারণে বিশ্ব আরো বেশি হুমকি ও বিভক্তির কবলে পড়েছে তা থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে।’

এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণার নীতিমালার উপর ভিত্তি করে যৌথ নেতৃত্বের ক্ষেত্রে নতুন উদাহরণ তৈরির জন্যে সরকারসমূহের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

তিনি আরো বলেন, ‘সবচেয়ে ক্ষমতাশালীকে দৃষ্টান্ত স্থাপনের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।’

• অলিম্পিক গেমস আয়োজনকে ঘিরে দেয়া প্রতিশ্রুতি চীনকে অবশ্যই রক্ষা করতে হবে এবং মত প্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনিক শাস্তি দেয়ার প্রচলিত পদ্ধতি যা ‘রি-এডুকেশন থ্রু লেবার’ নামে পরিচিত তা বিলোপ করতে হবে।

• যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যইউচিৎ গুয়ানতানামোসহ সকল ধরনের গোপন নির্বাসন কারাগার বন্ধ করার পাশাপাশি বন্দীদের জন্যে সুষ্ঠু বিচারের ব্যবস্থা করা কিংবা তাদের মুক্তি দেয়া, এবং সকল ধরনের নির্যাতন ও দুর্ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।

• ভিন্ন মতাবলম্বী রাজনীতিকদের প্রতি রাশিয়াকে আরো বেশি সহিষ্ণুতা দেখাতে হবে, এবং এও নিশ্চিত করতে হবে যে চেচনিয়ায় মানবাধিকার লংঘনের জন্যে দায়ী কেউ যেন বিচারের ঊর্ধ্বে না থাকে।

• ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অপরাধের ক্ষেত্রে গড়ে উঠা সখ্যতার তদন্ত করা দরকার। তারা অন্য দেশের ক্ষেত্রে মানবাধিকার রক্ষায় যে ধরনের ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলে সেই একই ধরনের ব্যবস্থা তাদের সদস্য দেশগুলোর ক্ষেত্রেও নিতে হবে।

আইরিন খান সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘বিশ্ব নেতৃবৃন্দ এখন প্রত্যাখান করছে কিন্তু কোনো কিছু করার ক্ষেত্রে তাদের ব্যর্থতায় বিশ্বকে বড় ধরনের মাশুল দিতে হবে। ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে আমরা দেখেছি মানবাধিকারের সমস্যাগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়, বরং এটি অনেকটা ভাইরাসের মতো যা দ্রুতই অন্যকে সংক্রমিত করে এবং সকলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, যা আমাদের সকলকে বিপদগ্রস্ত করে তোলে।’

‘বর্তমান সময়ের সরকারসমূহকে সেই একই ধরনের দূরদৃষ্টি, সাহস ও অঙ্গীকার প্রদর্শন করতে হবে যার কারণে ষাট বছর আগে জাতিসংঘ সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা প্রণয়ন করেছিলো।’

‘মানুষের মধ্যে এখন ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা ও সমতার চাহিদা বাড়ছে।’

২০০৭ সালে মনে দাগ কাটার মতো কিছু চিত্র হলো মায়ানমারের ভিক্ষু, পাকিস্তানের আইনজীবি এবং ইরানের নারী আন্দোলনকারীগণ।
তিনি আরো বলেন, ‘অস্থিরতা আর ক্ষোভ (ছড়িয়ে পড়ছে), মানুষ আর চুপ করে থাকছে না, এবং তাদেরকে উপেক্ষা করার মাধ্যমে নেতৃবৃন্দ তাদের নিজেদের বিপদ ডেকে আনছেন।’