২৮ ফেব্রুয়ারি ২০০৮
ইরানী কর্তৃপক্ষ নারীদের অধিকার রক্ষার জন্য কর্মরত কর্মীদেরকে হয়রানি করা অব্যাহত রেখেছে৷ রোনাক সাফারজাদে এবং হানা আবদি - দুইজন কুর্দি ইরানী কর্মী - বর্তমানে বিনাঅভিযোগে ও বিনাবিচারে আটক রয়েছেন৷ শান্তিপূর্ণভাবে তাদের অধিকার চর্চা করার জন্য ২০০৭ সালের অক্টোবর ও নভেম্বরে তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়৷
রোনাক সাফারজাদেঃ ইরানী মানবাধিকার সমর্থক © ক্যাম্পেইন ফর ইকুয়ালিটি
এই দুইজন কর্মী একটি ইরানী নারী অধিকার উদ্যোগ, ‘ক্যাম্পেইন ফর ইকুয়ালিটি’-এর অংশ হিসেবে কাজ করছিলেন৷ ২০০৬ সালে শুরু হওয়া এই প্রচারাভিযান ইরানে নারীদের বিরুদ্ধে আইনী বৈষম্যের ইতি টানার জন্য একটি আবেদনপত্রে ইরানী নাগরিকদের এক মিলিয়ন স্বাক্ষর সংগ্রহের লক্ষ্যে কাজ করছে৷ এছাড়াও এই দলটি নারী ও পুরুষ উভয় প্রকার স্বেচ্ছাসেবীদেরকে আইনী প্রশিক্ষণ প্রদান করে - যারা তারপর প্রচারাভিযানটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সারা দেশে ভ্রমণ করে থাকেন, এবং নারীদের সাথে তাদের অধিকার সম্পর্কে এবং আইনী সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে কথা বলেন৷
ইরানে নারীরা আইনগতভাবে গভীর বৈষম্যের শিকার হন৷ বিয়ে, বিবাহ-বিচ্ছেদ, সন্তানের হেফাজত এবং উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে তারা সমান অধিকার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়৷ আদালতে কোনো নারী সাক্ষ্য দিলে তা একজন পুরুষের সাক্ষ্যের শুধুমাত্র অর্ধেকের সমান হিসেবে বিবেচনা করা হয়৷ ১৩ বছরের কম বয়সী একটি মেয়েশিশুকে অনেক বেশি বয়স্ক একজন ব্যক্তিকে বিয়ে করতে বাধ্য করা যায় যদি তার বাবা এতে সম্মতি দেন৷
গত ৩০ বছরে নারী শিক্ষা বৃদ্ধি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের ব্যাপক সংখ্যাধিক্যের সাথে সাথে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার জন্য ক্রমবর্ধমান হারে নারীদের ক্ষমতায়ন হয়েছে৷ কিন্তু তাদের প্রচেষ্টাকে কর্তৃপক্ষ সন্দেহের চোখে দেখে থাকে, যারা তাদেরকে হুমকি দিচ্ছে এবং তাদের বিরুদ্ধে দমন অভিযান শুরু করেছে৷ প্রচারাভিযানের ওয়েবসাইটটি কর্তৃপক্ষ কমপক্ষে সাতবার বন্ধ করে দিয়েছে এবং এর কর্মীদেরকে তাদের কাজের জন্য লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে৷
২০০৭ সালের অগাস্ট মাসে, প্রচারাভিযানের সক্রিয় কর্মীদের মধ্যে নাসিম সারাবান্দি ও ফাতেমা দেদাস্তি প্রথম নারী হিসেবে কারাদন্ড ভোগ করেন৷ তেহরানে স্বাক্ষর সংগ্রহের সময় ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে ২৪ ঘন্টার জন্য বন্দী হন, তারপর “নিয়মের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানোর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে কার্যক্রম চালানো”র অভিযোগে অভিযুক্ত করার পর তাদেরকে ছয় মাসের জন্য কারাদন্ড দেয়া হয়, দুই বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়৷
প্রচারাভিযানের কার্যক্রমের সাথে সংশ্লিষ্টতার কারণে রেজা দৌলতশাহ সহ আরো ৪০ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে কারারুদ্ধ করা হয়৷ তিনি ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে প্রচারাভিযানের পক্ষে একটি শিক্ষামূলক কর্মশালার আয়োজন করেছিলেন, তখন তাকে তিন দিন ধরে আটকে রাখা হয় এবং পেটানো হয়৷
যদিও বাধা অনেক, তবুও ইরানী কর্তৃপক্ষ ইরানী নারীদের সাথে যেরকম আচরণ করে তাতে একটি মৌলিক পরিবর্তন আনার জন্য কর্মীরা তাদের নিরাপত্তার ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত৷ যেমন শাদি সদর, একজন আইনজীবী যিনি বর্তমানে তার মানবাধিকারমূলক কর্মকান্ডের জন্য সম্ভাব্য কারাদন্ডের সম্মুখীন, বলেনঃ “আমার দিদা যে জীবন চেয়েছিলেন তাকে সে জীবন যাপনের অনুমতি তাকে দেয়া হয়নি৷ আমি ভাগ্যবতী৷ আমি সবকিছু পেয়েছি কিন্তু তারপরও আমাকে কঠোর সংগ্রাম করতে হয়েছে৷ আমি চাইনি আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটি [আমার মেয়ে] একই সমস্যায় পড়ুক৷”
এই ধরনের মনোভাব প্রাক্তন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী শিরিন ইবাদির কন্ঠেও প্রতিধ্বনিত হয়েছে, “আমরা এমন একটি জাতি যার নারীদের কর্মক্ষমতা বিস্ফোরিত হচ্ছে৷ আমরা এমন একটি দেশ যা কঠোর-পরিশ্রমী নারীদের দ্বারা আশীর্বাদপুষ্ট হয়েছে যারা অবদান রাখার জন্য মরিয়া হয়ে আছে, কিন্তু আইনী পক্ষপাতদুষ্টতা এবং সামাজিক গোঁড়ামি দ্বারা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে৷ অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন, আমাদের সহায়তা ইরানী নারীদের বেশি দরকার”৷
যারা প্রতিবাদ করে এবং অধিকার দাবি করে তাদেরকে দমন ও ভয় দেখানোর জন্য ক্ষমতা ব্যবহার করার পরিবর্তে, ইরান সরকারের উচিত নারী অধিকার আদায়ের সক্রিয় কর্মী এবং মানবাধিকার সমর্থকদের কাজকে সম্পদ হিসেবে দেখা, এবং বৈষম্য ও অসহিষ্ণুতা মোকাবেলা এবং সকল ইরানীদের জন্য সর্বজনীন মানবাধিকার প্রসারে ওই সকল কর্মী ও সমর্থকরা যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন তার স্বীকৃতি প্রদান করা৷
এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইরান সরকারকে নিচে উল্লিখিত বিষয়গুলো বাস্তবায়নে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আহ্বান জানিয়েছেঃ
• বৈষম্যমূলক আইন বাতিল করা
• আটক নারী অধিকার সমর্থকদেরকে মুক্তি দেয়া এবং যারা স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশ, সংগঠন ও সমাবেশ করার অধিকার শান্তিপূর্ণভাবে চর্চা করছে তাদেরকে আটক ও হয়রানি বন্ধ করা৷
আরো পড়ুন
ইরানঃ নারী অধিকার সমর্থকরা দমননীতি প্রতিহত করছেন