২০০১ সালে, লিউ জিংমিন, বেইজিং অলিম্পিক বিড কমিটির ভাইস-প্রেসিডেন্ট, বলেছিলেন যে বেইজিংকে ক্রীড়ানুষ্ঠানটি আয়োজনের সুযোগ দিলে তা “মানবাধিকার উন্নয়নে সহায়ক হবে”৷ সাত বছর পর, এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনের মানবাধিকার উন্নয়নের সামান্য চিহ্নই তুলে ধরছে৷
এটি আশা করা হয়েছিল যে সংস্কারের জন্য ক্রীড়ানুষ্ঠানটি একটি অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে কিন্তু তা সত্ত্বেও সক্রিয় কর্মী ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দমন-নিপীড়নের বর্তমান প্রবাহের অধিকাংশই ঘটছে অলিম্পিকের কারণে, ‘চীনঃ অলিম্পিক কাউন্টডাউন - সক্রিয় কর্মীদের দমন অভিযান অলিম্পিকের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত চেতনাকে ঝুঁকির সম্মুখীন করছে’ প্রতিবেদন অনুযায়ী৷
ইতিবাচক পরিবর্তন যেমন মৃত্যুদন্ডের পদ্ধতি সংস্কার এবং বিদেশি সাংবাদিকদের প্রতিবেদন প্রকাশের বিষয়ে আরো বেশি স্বাধীনতা প্রদানের ঘটনা ম্লান হয়ে গেছে বিচার ছাড়াই আটক রাখা, মানবাধিকার কর্মীদের উপর দমন অভিযান এবং ইন্টারনেটের উপর সেন্সরশিপের সংস্কার আটকে থাকার কারণে৷
এছাড়াও প্রতিবেদনটি তিব্বতে বিক্ষোভকারীদের উপর চীনা কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক দমন অভিযানকে তুলে ধরেছে যা ১০ মার্চ ২০০৮ তারিখ থেকে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণ হয়েছে৷ চীনা কর্তৃপক্ষ এমন ব্যবস্থা অবলম্বন করে থাকে যেগুলোতে প্রাণঘাতী শক্তি সহ অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, নির্বিচারে আটক ও ভীতিপ্রদর্শন ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে৷
বিক্ষুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে শত শত ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে৷ তারা চীনের নিরাপত্তা কর্মীদের দ্বারা নির্যাতন ও অন্যান্য দুর্ব্যবহারের সম্মুখীন হতে পারেন, বিশেষকরে যাদেরকে “বিচ্ছিন্নতাবাদী” কর্মকান্ডের জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছে৷
তিব্বত ও আশেপাশের এলাকায় প্রচারমাধ্যম প্রায় সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়ার কারণে প্রতিবেদনগুলো নিশ্চিত করাই শুধুমাত্র কঠিন হয়নি, বরং “প্রচারমাধ্যমের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা” নিশ্চিত করার জন্য অলিম্পিকের প্রচারাভিযানে দেয়া আনুষ্ঠানিক অঙ্গীকারের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে৷
চীনেও, রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিচারের পর অনেক সক্রিয় কর্মীকে বিবেকের বন্দী করে রাখা হয়৷ ক্রমবর্ধমান সংখ্যক মানুষকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়৷ জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে বিস্তৃত ও অস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত অপরাধ যেমন “বিচ্ছিন্নতাবাদ”, “নাশকতা” ও “রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য চুরি করা”, ব্যবহার করা হয় সেই সকল ব্যক্তিদেরকে বিচারের সম্মুখীন করার জন্য যারা বৈধ ও শান্তিপূর্ণভাবে মানবাধিকার সংক্রান্ত কর্মকান্ডে জড়িত থাকে৷
ভূমির অধিকার রক্ষাকর্মী, ইয়াং চুনলিন “আমরা অলিম্পিক চাই না, আমরা মানবাধিকার চাই” ব্যানারে একটি পিটিশনের প্রচারাভিযান সংগঠিত করার পর তাকে “নাশকতামূলক কর্মকান্ডে প্ররোচিত করার জন্য” ২৫ মার্চ তারিখে পাঁচ বছরের জন্য কারাদন্ডে দন্ডিত করা হয়৷ তাকে প্রাথমিক অবস্থায় আইনজীবীর সহায়তা গ্রহণ করতে দেয়া হয়নি এই যুক্তিতে যে তার মামলাটি সম্ভবত “রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা”র সাথে সম্পর্কিত৷ আটকাবস্থায় তার উপর পুলিশ নির্যাতন করে বলে জানা যায়, কিন্তু আদালতে এই সকল অভিযোগ উত্থাপনের সুযোগ প্রত্যাখ্যান করা হয়৷
বেইজিং থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদের বিরুদ্ধে একটি সমাবেশ করার অনুমতি চেয়ে আবেদন করার পর বাসস্থানের অধিকার রক্ষাকর্মী ইয়ে গুয়োঝু চার-বছরের কারাদন্ড ভোগ করছেন৷ ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে তাকে “ঝগড়া বাঁধানো এবং সমস্যা তৈরি করার” জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয় কারণ এই বছরের অলিম্পিক গেমসের নতুন নির্মাণ প্রকল্পের জন্য তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও ধ্বংস করার বিরুদ্ধে ছিলেন তিনি৷
অলিম্পিকের আগে শহরের ভাবমূর্তি “পরিচ্ছন্ন” করার জন্য ২০০৬ সালের মে মাসে, বেইজিং বিচার ছাড়াই আটকের একটি পদ্ধতি বিস্তৃত করে যাকে বলা হয় ‘শ্রমের মাধ্যমে পুনরায় শিক্ষা’ (রি-এডুকেশন থ্রো লেবার, আরটিএল)৷ এই পদ্ধতিটি সেই সকল ব্যক্তিকে লক্ষ্যবস্তু করে যারা ছোটখাট অপরাধ করেছেন কিন্তু আইনগতভাবে অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হন না৷ তাদেরকে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে বাধ্য করা করা হয়, এবং চার বছর পর্যন্ত আটক রাখা যেতে পারে৷ চীনে আরটিএল ব্যাপকভাবে সমালোচিত৷ দীর্ঘ শ্রুত কিন্তু বর্তমানে থেমে থাকা পদ্ধতিগত সংস্কার হবে মানবাধিকারের একটি প্রধান উন্নয়ন৷
পিটিশনে স্বাক্ষর করা এবং অলিম্পিকের নির্মাণ কাজের জন্য পথ করতে তার সম্পত্তি ধ্বংস করার বিরুদ্ধে ব্যানার তৈরি করার জন্য বেইজিংয়ের বাসস্থান অধিকার কর্মী ওয়াং লিংকে ২০০৭ সালের অক্টোবরে ১৫ মাসের জন্য আরটিএল দন্ডে দন্ডিত করা হয়েছে বলে জানা যায়৷ তাকে বেইজিংয়ের ডাক্সিং আরটিএল স্থাপনায় আটকে রাখা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়৷
২০০১ সালের জুলাই মাসে “প্রচারমাধ্যমের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা” প্রদানের আনুষ্ঠানিক অঙ্গীকার করা সত্ত্বেও, মতামত প্রকাশের মৌলিক মানবাধিকার চর্চা করার জন্য লেখক ও সাংবাদিকদেরকে দোষী সাব্যস্ত করা ও কারাগারে প্রেরণের জন্য কর্তৃপক্ষ “নাশকতায় উস্কানি” দেয়ার অপরাধ এবং “অন্যান্য রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত” অপরাধ ব্যবহার করা অব্যাহত রেখেছে৷
ইন্টারনেটও ব্যাপকভাবে সেন্সর করা হয়৷ পুলিশের কার্টুন ছবি এখন চীনের ২১০ মিলিয়ন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর অনেককেই “বেআইনী” ওয়েবসাইট থেকে দূরে থাকার জন্য সতর্ক করে দেয়৷ এইসব ভার্চুয়াল পুলিশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদেরকে মনে করিয়ে দেয় যে কর্তৃপক্ষ ওয়েব কার্যক্রমের প্রতি ঘনিষ্ঠভাবে লক্ষ্য রাখছে এবং এর মাধ্যমে আত্ম-সেন্সরশিপকে উদ্বুদ্ধ করে৷ এছাড়াও ধারণা করা হয় যে চীন বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে নিবিড়, কারিগরিভাবে সমৃদ্ধ এবং ব্যাপকভাবে বিস্তৃত ইন্টারনেট সেন্সরশিপ পদ্ধতি পরিচালনা করে থাকে৷
টেক্সট বার্তাও পর্যবেক্ষণ করা হয়৷ ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে, বেইজিং নগর কর্তৃপক্ষ একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে যে যারা “জননিরাপত্তাকে ঝুঁকিগ্রস্ত করার জন্য” বা “গুজব ছড়ানোর জন্য” টেক্সট বার্তা ব্যবহার করে তাদের সম্পর্কে তদন্ত করা হবে৷
মৃত্যুদন্ড ব্যবহার করার ক্ষেত্রে চীন বিশ্বে নেতৃস্থানীয় অবস্থানে রয়েছে, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে সুপ্রিম পিপলস কোর্ট (এসপিসি)-এর পর্যালোচনা পুনঃস্থাপনের কারণে ২০০৭ সালে চীনে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে৷ কিন্তু এই সকল দাবির সপক্ষে পুর্ণাঙ্গ জাতীয় পরিসংখ্যানের প্রকাশনা এবং চীনে মৃত্যুদন্ড সম্পর্কে অন্যান্য বিস্তারিত তথ্য পাওয়া অপরিহার্য৷ মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার সংখ্যা কমে যাওয়ার আংশিক কারণ হতে পারে মৃত্যুদন্ড কার্যকর হওয়ার জন্য অপেক্ষমান কয়েদীদের সংখ্যা ক্রমবর্ধমানহারে “জমে যাওয়া”, যেহেতু তাদের মামলা এসপিসি-তে পুনর্বিবেচনাধীন রয়েছে৷
এ্যামনেস্টির প্রতিবেদন চীনা কর্তৃপক্ষকে এগুলোর জন্য আহ্বান জানাচ্ছেঃ
জাতিসংঘের তদন্তকারী ও স্বতন্ত্র পর্যবেক্ষকদেরকে তিব্বত ও সংলগ্ন এলাগুলোতে অবিলম্বে প্রবেশাধিকার দেয়া;
সক্রিয় কর্মীদেরকে নির্বিচারে আটক, ভীতিপ্রদর্শন ও হয়রানি বন্ধ করা;
শাস্তিমূলক প্রশাসনিক আটকাবস্থা বন্ধ করা;
সকল সাংবাদিকদের জন্য সমগ্র চীনে পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন সাংবাদিকতার অনুমতি প্রদান;
সকল বিবেকের বন্দীদেরকে মুক্তি প্রদান এবং
বিলোপের উদ্দেশ্যে পদক্ষেপ হিসেবে মৃত্যুদন্ড সংক্রান্ত অপরাধের সংখ্যা কমানো৷


Delicious
Digg
Facebook
Technorati