নাইরোবীর বস্তিতে বসবাসকারী ২০ লাখ মানুষ মানবাধিকারের অন্ধকূপে বসবাস করছে
১২ জুন ২০০৯
নাইরোবীর বস্তিবাসীদের জীবনের করুণ পরিস্থিতি ও মানবাধিকারের চরম লংঘনের দিকগুলো তুলে ধরে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল শুক্রবার ‘দি আনসিন মেজরিটি: নাইরোবী’জ টু মিলিয়ন স্লাম ডুয়েলার্স’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায় নাইরোবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী কিভাবে অপরিকল্পিত ও বিক্ষিপ্তভাবে গড়ে উঠা বসতি এলাকায় বসবাস করছে। জনসংখ্যার দিক থেকে অর্ধেক হলেও তারা শহরের মোট আবাসিক এলাকার মাত্র ৫ শতাংশ এবং শহরের মোট ভূমির মাত্র ১ শতাংশ এলাকায় গাদাগাদি করে বসবাস করে।
নাইরোবীর বস্তি সংক্রান্ত এই প্রতিবেদনটি প্রথম প্রকাশিত হয় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের নতুন বৈশ্বিক প্রচারণা ডিমান্ড ডিগনিটি বা ‘মর্যাদার দাবী’ শীর্ষক প্রচারাভিযানের অবমুক্তির প্রাক্কালে। মর্যাদার দাবী শীর্ষক প্রচারণার মূল লক্ষ্য হলো মানবাধিকার লংঘনের যে ঘটনাগুলো মানুষকে দরিদ্র হতে ও দরিদ্র থাকতে বাধ্য করে সেই সব ঘটনাগুলোকে সকলের সামনে প্রকাশ করে তার মোকাবেলা করা। কেনিয়াতে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ‘মযার্দার দাবী’-তে বস্তিবাসীদের একত্রিত হতে উদ্বুদ্ধ করছে যাতে তারা পর্যাপ্ত আবাসনের দাবী তুলতে পারে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মর্যাদার দাবী প্রচারাভিযান দরিদ্র বস্তিবাসী মানুষদের দাবীকে জোরালো করবে এবং তাদের দাবীর স্বপক্ষে কেনিয়ার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে কার্যকরভাবে সাড়া দিতে উদ্বুদ্ধ করবে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব আইরিন খান বলেন, ‘লক্ষ লক্ষ মানুষ বসবাসের অযোগ্য পরিবেশে বাস করছে, তারা যে শুধুমাত্র মৌলিক সেবাগুলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তা নয়, সেসঙ্গে তারা বৈষম্য, অনিরাপত্তা ও প্রান্তিকতারও শিকার হচ্ছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘তাদের কথা শোনার কেউ নেই এবং তাদের জীবনকে প্রভাবিত করে এমন কাজগুলো করার আগে তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের পরামর্শ করা হয় না কিংবা তাদেরকে জানানো পর্যন্ত হয় না। একে মানবাধিকারের কলঙ্ক ছাড়া আর কিইবা বলা যাবে।’
প্রতিবেদনে বস্তিবাসীদের সুরক্ষা দিতে কেনিয়ান সরকারের অব্যাহত ব্যর্থতার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে এবং সেখানে দেখানো হয়েছে কিভাবে কয়েক প্রজন্ম ধরে বস্তিবাসী মানুষগুলো রাজনীতিবিদদের অবহেলার শিকার হয়ে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠা ঘরে ‘দারিদ্র্য বন্দি’ হয়ে জীবনযাপন করছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বিশ্বাস করে দারিদ্র্যের ফাঁদ থেকে বের হয়ে আসার ক্ষেত্রে মানুষের বড় শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে মানবাধিকার।
প্রতিবেদনে বস্তিজীবনের নানান দিক বস্তিবাসীদের বর্ণনায় তুলে ধরা হয়েছে। তারা বলেছেন যে, বঞ্চনা, খাদ্যের উচ্চমূল্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থার অভাব, কর্তৃপক্ষের হয়রানি এবং সারাক্ষণই জোরপূর্বক উৎখাতের ভয় তাদেরকে তাড়িয়ে ফেরে। দুভোর্গের শিকার ব্যক্তিদের বর্ণনা মতে, জোরপূর্বক উৎখাতের ঘটনা সাধারণত রাতে কিংবা খারাপ আবহাওয়াতে ঘটে এবং বেশিরভাগ সময় অনেক বেশি বলপ্রয়োগ করা হয়। তারা আরো জানান যে, বেশিরভাগ সময় নোটিশ ছাড়াই উৎখাতের ঘটনা ঘটে, কিংবা দায়সারা গোছের নোটিশ দেয়া হয়, ফলে ঘরবাড়ির অবকাঠামোর পাশাপাশি তাদের ঘরে থাকা জিনিসপত্র ও সামান্য সম্পদগুলো পর্যন্ত ধ্বংসের শিকার হয়।
প্রতিবেদনে এখনই ঝুঁকির মুখে রয়েছে এমন প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার মানুষকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। এরা নাইরোবী নদীর তলদেশ পরিস্কারের সরকারী পরিকল্পনার কারণে হুমকির সম্মুখীন। এই কারণে তাদের ঘরবাড়ি ও ব্যবসা বাণিজ্য ধ্বংসের সম্মুখীন।
যদিও প্রায় চার বছর আগে সরকার একটি জাতীয় গৃহায়ন নীতিমালা প্রণয়ন করেছে যেখানে সকলের জন্যে আবাসনের অধিকারের বিষয়টি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করা হয়েছিলো কিন্তু বাস্তবে সরকার সকলের জন্যে উপযোগী ও সামর্থ্যের মধ্যে সকলকে আবাসন দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বস্তি উন্নয়ন কর্মসূচি খুবই ধীর গতিতে চলছে এবং এই কাজে বরাদ্দকৃত সম্পদের পরিমাণও যথেষ্ট কম। বস্তিবাসী জনগণ মনে করেন এই ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে যতোটা আলোচনা করার দরকার ছিলো সেটি করা হয়নি।
আইরিন খান বলেন, ‘ভূমিমালিকদের শোষন, পুলিশের ভীতি প্রদর্শন, মাস্তানদের নির্যাতন: সবমিলিয়ে নাইরোবীর বস্তিগুলো এখন মানবাধিকারের কৃষ্ণ-বিবরে পরিণত হয়েছে যেখানে বস্তিবাসী জনগণ মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তাদের কোনো নিরাপত্তা নেই এবং তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের কোনো কথা বলার সুযোগ নেই।’
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল নাইরোবীর বস্তি সংক্রান্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে কেনিয়ান সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে যে:
• জোরপূর্বক উচ্ছেদের সকল ঘটনা বন্ধ করুন;
• আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নির্দেশিকা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করে বস্তিবাসীদের বসবাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন এবং তাদেরকে ইচ্ছেমাফিক উচ্ছেদের হাত থেকে রক্ষা করুন;
• ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসীর সঙ্গে পর্যাপ্ত পরামর্শ করুন;
• ভূমি ও গৃহায়ন ইস্যু নিয়ে কর্মরত সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ করুন;
আইরিন খান বলেন, ‘বস্তিবাসী মানুষদের জন্যে পর্যাপ্ত বসতবাড়ি ও সেবা নিশ্চিত করার যে অঙ্গীকার তা পূরণের সময় অনেক আগেই শেষ হয়েছে।’
এ সম্পর্কিত আরো কিছু তথ্য:
• আইরিন খান সোয়েতো (কিবেরা) ও করোগোচো বসতি এলাকা পরিদর্শন করেছেন ও সেখানকার নিবাসী ও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দেখা করেছেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধিদল ডিপ সি বসতি এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
• মিজ খান একটি ফ্রি এসএমএস নাম্বার (৩২২১) উদ্বোধন করেছেন। কেনিয়ার নাগরিকগণ এই নাম্বারটি ব্যবহার করে মর্যাদাপূর্ণ বসবাস ও গৃহায়ন অধিকার বলতে তারা কি বোঝেন সেকথা সরকারকে জানাতে পারবেন।
• মিজ খান ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধগণ কয়েকশ বস্তির মানুষের অংশগ্রহণে বস্তিবাসী মানুষের অধিকার নিয়ে আয়োজিত ৠালীতে অংশ নেন।
• প্রতিবেদনে বিভিন্ন সময়ে ক্ষতির শিকার হওয়া ব্যক্তিদের স্বীকারোক্তিমূলক বর্ণনাও প্রকাশ করা হয়েছে। একজন নারী জানিয়েছেন তিনি উচ্ছেদের শিকার হয়ে দু’বার গৃহহারা হয়েছেন। প্রথমবার তাকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হয় এবং দ্বিতীয়বার তার ঘর যখন পুড়িয়ে দেয়া হয় তখন তিনি ও তার আত্মীয়রা ঘরের মধ্যে ঘুমাচ্ছিলেন। সেসময়ে তিনি একমাত্র যে জিনিসটি রক্ষা করতে পেরেছিলেন সেটি হলো তার পরিচয় পত্র। অন্য একজন নারী জানিয়েছেন কিভাবে তার সন্তানেরা কয়েক সপ্তাহের জন্যে প্রাইমারি স্কুলে যেতে পারেনি। কারণ তাকে যখন জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হয় তখন বুলডোজার তার ঘরবাড়ির সঙ্গে সন্তানদের বইপত্র, স্কুলের উপকরণ ও স্কুলের পোশাক পর্যন্ত ধ্বংস করে দিয়েছিলো। আরেকজন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি জানিয়েছেন কিভাবে তার ও তার প্রতিবেশীর ঘরবাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিলো। সেসময়ে তারা চার্চে ছিলেন।
Watch a slideshow of Amnesty International's high-level mission to Kenya

Delicious
Digg
Facebook
Technorati