ইরান: বিক্ষোভ প্রতিরোধে পুলিশী কাজে বাসিজ মিলিশিয়া ব্যবহার বন্ধ করুন
২২ জুন ২০০৯
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বিক্ষোভ প্রতিরোধে পুলিশী কাজে বাসিজ মিলিশিয়া ব্যবহার অতি সত্বর বন্ধ করার জন্যে ইরান সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহিতাবিহীন শাখা বাসিজ মিলিশিয়া কর্তৃক সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বিক্ষোভ প্রদর্শনরত জনগণের উপর অত্যাধিক বল প্রয়োগের ঘটনার বিবরণ প্রকাশিত হওয়ার পরই অ্যামেনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই আহ্বান জানালো।
বাসিজ মিলিশিয়া ইসলামী রেভুলেশনারী গার্ড কোরপস (আইআরজিসি) বা ইসলামী বিপ্লবী বাহিনী নিয়ন্ত্রণাধীন স্বেচ্ছাসেবী নারী ও পুরুষের আধাসামরিক বাহিনী। এই বাহিনীর সদস্যদের বিদ্যালয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, রাষ্ট্রীয় ও প্রাইভেট সংস্থায়, কারখানায়, এমনকি আদিবাসীদের মধ্যেও দেখতে পাওয়া যায়। আইন শৃংখলা রক্ষা ও ভিন্ন মতালম্বিদের নির্যাতন করার জন্যে বাসিজ বাহিনীকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয় এবং তারা মারাত্মক ধরনের নৃশংসতার জন্যে প্রায়ই অভিযুক্ত হয়ে থাকে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা দাবী করেছে যে তাদেরকে যারা বাঁধা দিয়েছে তারা ছিলো বেসামরিক পোশাকধারী সশস্ত্র লোক। এরা রাস্তায় বিক্ষোভ প্রদর্শনকারীদের উপর অত্যধিক বল প্রয়োগ করেছে, তাদেরকে পিটিয়েছে এবং আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করার মাধ্যমে মানবাধিকার লংঘন করেছে। একটি ভিডিও চিত্র থেকে দেখা যায় বাসিজ বাহিনীর একজন সদস্য একটি বিল্ডিংয়ের উপর থেকে গুলি ছুড়ছে। ঘটনাটি ১৫ জুন তারিখের। ওই দিনের বিক্ষোভে গুলি বর্ষনের ঘটনায় অন্তত ৮ জন মারা গিয়েছে। এই ঘটনার ত্বরিত গতিতে তদন্ত হওয়া দরকার। কর্তৃপক্ষের খতিয়ে দেখা দরকার কেন এমন ঘটনা ঘটেছিলো এবং এই ধরনের জীবননাশের ঘটনা ভবিষ্যতে এড়ানোর লক্ষ্যে সুস্পষ্ট ঘোষণা কর্তৃপক্ষের দিক থেকে থাকা দরকার। আরেকটি ভিডিও-তে দেখা যায় নেদা নামের এক তরুণী মেয়ে বুকে আঘাত পাওয়ার কারণে মারা যাচ্ছে, এই ভিডিওটি ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে। দাবী করা হচ্ছে যে, বাসিজ সদস্যরাই এই মৃত্যুর জন্যে দায়ী।
ইরানী কর্তৃপক্ষের দিক থেকে কোনো মৃত্যুর ঘটনারই সুষ্ঠু তদন্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়নি বরং প্রতিবাদকারীদের এই মর্মে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে যে কোনো ধরনের প্রতিবাদের ঘটনা ঘটলে সেগুলো ‘বৈপ্লবিক কায়দায়’ দমন করা হবে। এই কাজে ইসলামী বিপ্লবী বাহিনী, বাসিজ মিলিশিয়া ও অন্যান্য পুলিশ এবং নিরাপত্তা বাহিনীকে ব্যবহার করা হবে।
‘ইরানী জনগণ শান্তিপূর্ণভাবে বিরোধীতা প্রকাশ করতে চায়, যদিও সাম্প্রতিককালে নির্বাচনকে ঘিরে যে ঘটনাগুলো ঘটেছে সেখানে তেমনটা করার কোনো সুযোগ ছিলো না, কারণ তাদের উপর নির্যাতনের স্টিমরোলার চালানো হয়েছে এবং সেসব কাজ দেশের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক আইনসম্মত করা হয়েছে।’ এই কথা উল্লেখ করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির উপ-পরিচালক হাসিবা হার্জ সারাউ বলেন, ‘ইরানী কর্তৃপক্ষের দিক থেকে এখন ইরানী জনগণকে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ সমাবেশ করতে দেয়া উচিৎ এবং বাসিজকে রাস্তা থেকে সরিয়ে নেয়া দরকার। বিক্ষোভকারীদের উপর নজরদারি কিংবা তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করতে হলে সেই দায়িত্ব পুলিশ বাহিনী ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর উপর ছেড়ে দেয়া উচিৎ যারা এই ধরনের কাজের জন্যে উপযুক্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও যথাযথ অস্ত্রপাতি সমৃদ্ধ।’
গত শুক্রবার ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনী এই ধরনের প্রতিবাদ সমাবেশের অবসানের আহ্বান জানানোর পর গত শনিবার তেহরানসহ দেশের অন্যান্য শহর ও শহরতলীতে আরো অনেকে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। ওই ঘটনায় ১৩ জন ব্যক্তি মারা গিয়েছেন এবং আরো অনেকে আহত হয়েছেন। সরকারি সূত্র মতে, ৪০০ এরও বেশি ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদিকে গত সোমবার আরেকটি বিক্ষোভ প্রদর্শনকালে তেহরানে প্রায় ১০০০ মানুষ টিয়ার গ্যাস ও গ্রেফতারের শিকার হয়েছে।
হাসিবা হাজ সারাউ বলেন, ‘পুলিশ বিভাগের সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকে জানা যায় তারা প্রতিবাদকারীদের উপর গুলিবর্ষনের বিরোধীতা করেছেন এবং তেহরানের প্রসিকিউটর জেনারেল হত্যাকান্ডের জন্যে ‘অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের’ দায়ী করেছেন; এ থেকে মনে হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো সহিংসতা থেকে নিজেদের বিযুক্ত করার চেষ্টা করছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘এই ধরনের পরিস্থিতি থেকে একথা সুস্পষ্ট যে, এখন বাসিজদের ব্যবহার বন্ধের সময় হয়েছে। তাছাড়া তাদেরকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে চিহ্নিত করারও কোনো উপায় নেই বলে সহিংসতার জন্যে তাদেরকে এককভাবে দায়বদ্ধ করার সুযোগও কম। ইরানী কর্তৃপক্ষ যদি এই ধরনের মিলিশিয়া কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম না হয়, তাহলে তাদেরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা উচিৎ। এভাবে কাউকে অস্ত্র দেয়া যেমন দায়িত্বজ্ঞানহীন এক কাজ, তেমনি পরবর্তীতে সেই অস্ত্রের অপব্যবহারের দায়দায়িত্ব না নেয়াও আরেক দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতো কাজ।’
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইরানী কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে যে, তারা যেন সকল মৃত্যুর ঘটনার পূর্ণ তদন্ত করে, এমনকি সম্ভাব্য বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডেরও যেন তদন্ত করা হয় এবং এই ধরনের ঘটনার জন্যে যারাই দায়ী তাদেরকে যেন বিচারের আওতায় নিয়ে আসা হয়।
Delicious
Digg
Facebook
Technorati