মৃত্যুদন্ড বিলোপ করার জন্য জাতিসংঘে ক্রমবর্ধমানভাবে আহ্বান

১৮ ডিসেম্বর ২০০৮

বৃহস্পতিবার জাতিসংঘে “মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা মুলতবি রাখা” সম্পর্কিত দ্বিতীয় একটি প্রস্তাবের পক্ষে উল্লেখযোগ্যভাবে একশ’রও বেশি দেশ ভোট দেয়৷ প্রস্তাবটি মৃত্যুদণ্ড স্থগিত রাখা সম্পর্কিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের গত বছরের আহ্বানকে পুনর্ব্যক্ত করে৷

The flags of member nations fly outside of United Nations headquarters in New York.

১০৬টি দেশ প্রস্তাবটিকে সমর্থন করে, ৪৬টি দেশ বিপক্ষে ভোট দেয় এবং ৩৪টি দেশ ভোট দানে বিরত ছিল৷ ২০০৭ সালে, পক্ষে ভোট পড়েছিল ১০৪, বিপক্ষে ৫৪ এবং ভোট দানে বিরত ছিল ২৯টি দেশ৷

“এই ক্রমবর্ধমান সমর্থন বিশ্বব্যাপী মৃত্যুদন্ড বিলোপের লক্ষ্যে বলিষ্ঠ ও দীর্ঘ-দিনের প্রবণতাকে শক্তিশালী করেছে,” বলেছেন এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মার্টিন ম্যাকফারসন৷

১৯৪৮ সালে যখন মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র গৃহীত হয়, আটটি দেশ আইন করে বা প্রায়োগিকভাবে মৃত্যুদন্ড বিলোপ করেছিল৷ ষাট বছর পর, ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে এসে, এই সংখ্যাটি ১৩৭-এ দাঁড়িয়েছে৷

বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি দেশ মৃত্যুদন্ড বিলোপ করেছে এবং এই সংখ্যা ক্রমাগতভাবে বাড়ছে৷

“বিলোপের লক্ষ্যে এই গতিধারা সুস্পষ্ট,” বলেছেন মার্টিন ম্যাকফারসন৷ “এই গতিধারা বিশ্বের সবগুলো অঞ্চলে দেখা যায়৷”

মধ্য এশিয়ায়, বিলোপের লক্ষ্যে সুস্পষ্ট তৎপরতা লক্ষ করা যাচ্ছে৷ কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তান ১৯৯১ সালে স্বাধীনতা লাভের সময় মৃত্যুদন্ড প্রথা বহাল রেখেছিল৷ তবে, ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তান মমৃত্যুদন্ড প্রথা বিলোপ করেছে৷ রাশিয়ান ফেডারেশন ও তাজিকিস্তান মৃত্যুদন্ড কার্যকর ও মৃত্যুদন্ড প্রদান করা মুলতবি রেখেছে৷

ইউরোপ কার্যত একটি মৃত্যুদন্ড-মুক্ত এলাকা, এর একমাত্র ব্যতিক্রম হচ্ছে বেলারুশ৷

আফ্রিকা মহাদেশের বেশিরভাগ অংশই মৃত্যুদন্ড থেকে মুক্ত, আফ্রিকান ইউনিয়নের ৫৩টি দেশের মধ্যে শুধুমাত্র সাতটি দেশ ২০০৭ সালে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করে বলে জানা যায়ঃ বতসোয়ানা, মিশর, নিরক্ষীয় গিনি, ইথিওপিয়া, লিবিয়া, সোমালিয়া ও সুদান৷
 
২০০৮ সালের নভেম্বরে, আফ্রিকান কমিশন অন হিউম্যান অ্যান্ড পিপলস্ রাইট (আফ্রিকান কমিশন) মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা মুলতবি রাখার জন্য আফ্রিকান দেশগুলোকে আহ্বান জানিয়ে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে৷ আফ্রিকান ইউনিয়ন (এইউ)-কে সম্পূর্ণভাবে একটি মৃত্যুদন্ড-মুক্ত অঞ্চলে পরিণত করার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ৷

আরব লীগের অনেকগুলো দেশ, বাহরাইন, জর্দান, ওমান, মউরিতানিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত, বিপক্ষে ভোট দেয়ার পরিবর্তে ভোট দানে বিরত ছিল৷ জাতীয় পর্যায়ে, আলজেরিয়া, লেবানন ও তিউনিশিয়ায় বিলোপের জন্য খসড়া আইন পেশ করা হয়েছে৷

এশিয়ায়, এশিয়া প্রশান্তমহাসাগরীয় অঞ্চলে আইন করে বা প্রায়োগিকভাবে মৃত্যুদন্ড বিলোপকারী দেশের মোট সংখ্যা এখন ২৭-এ দাঁড়িয়েছে৷ ২০০৮ এর ২১ মে তারিখে চীনের বিচার মন্ত্রণালয় ও সুপ্রীম পিপলস্ কোর্ট (এসপিসি)মৃত্যুদন্ড প্রদানযোগ্য মামলাগুলোতে সরকারপক্ষের আইনজীবীর ভূমিকা নির্ধারণের জন্য যৌথভাবে একটি আইন পাশ করেছে৷

সুপ্রীম পিপলস্ কোর্টের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালের প্রথমার্ধে ঊর্ধ্বতন নাগরিক আদালত কর্তৃক প্রদত্ত মৃত্যুদন্ডগুলোর শতকরা প্রায় ১৫ ভাগকে পুনরায় বিচার করার জন্য এসপিসি ফিরিয়ে দিয়েছে৷ তবে, এটি নিশ্চিত করা অসম্ভব কারণ চীনে মৃত্যুদণ্ড সম্পর্কিত তথ্যকে রাষ্ট্রীয় গোপনীয় তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং সেগুলো প্রকাশ করা হয় না৷

দক্ষিণ কোরিয়ায়, ১৯৯৮ সাল থেকে কোনো মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়নি এবং মৃত্যুদন্ড বিলোপ করার একটি বিল বিবেচনাধীন রয়েছে৷ ভিয়েতনাম মৃত্যুদন্ড প্রদানযোগ্য অপরাধের সংখ্যা পুনর্বিবেচনা করছে৷

আমেরিকার দেশগুলো মৃত্যুদন্ড থেকে প্রায় মুক্ত৷ ২০০৩ সাল থেকে, শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রই নিয়মিতভাবে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করে আসছে৷ এই শতাব্দীতে অন্য যে দেশগুলো মৃত্যুদন্ড কার্যকর করেছে সেগুলো হচ্ছে কিউবা ২০০৩ সালে, গুয়াতেমালা ২০০১ সালে এবং বাহামা ২০০০ সালে৷

যদিও ইংরেজিভাষী ক্যারিবীয় ১০টি দেশ আইনগতভাবে মৃত্যুদন্ড বহাল রেখেছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করায় বিরতি চলছে৷ মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা কার্যত মৃত্যুদন্ড মুক্ত, শুধুমাত্র গুয়াতেমালা, বেলিজ ও গুইয়ানা মৃত্যুদন্ড প্রথা বহাল রেখেছে৷

২০০৮ সালের ২৯ এপ্রিল তারিখে, কিউবার রাষ্ট্রপতি রাউল ক্যাস্ট্রো কিউবার কম্যুনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির ষষ্ঠ সভার সমাপনী ভাষণে ঘোষণা করেন যে কিউবার সকল মৃত্যুদন্ড কার্যত যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ৩০ বছরের কারাদণ্ডে রূপান্তরিত করা হবে৷

যুক্তরাষ্ট্র মৃত্যুদন্ডের বিপক্ষে যাচ্ছে৷ মৃত্যুদন্ড তথ্য কেন্দ্র জানিয়েছে যে ১৯৯০-এর দশক থেকে মৃত্যুদন্ডের বার্ষিক সংখ্যা ৬০% কমেছে৷ ২০০৮ সালে ৩৭টি মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়, যা ১৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন এবং একটি নিম্নমুখী গতিধারা অনুসরণ করছে যা ২০০০ সাল থেকে শুরু হয়েছে৷

এই সপ্তাহে, ‘মেরিল্যান্ড কমিশন অন ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট’ তার চূড়ান্ত প্রতিবদেন প্রকাশ করেছে, এটি মৃত্যুদন্ড বিলোপের জন্য এবং জাতির মধ্যে মেরিল্যান্ডকে মৃত্যুদণ্ড বিলোপের ক্ষেত্রে সর্বশেষ স্টেটে পরিণত করার জন্য আহ্বান জানিয়েছে৷ যুক্তরাষ্ট্রের চৌদ্দটি স্টেটে মৃত্যুদণ্ড নেই৷


আরো পড়ুন

মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা মুলতবি রাখার জন্য আফ্রিকান কমিশনের আহ্বান (সংবাদ, ৫ ডিসেম্বর ২০০৮)
চীন, ইরান ও জ্যামাইকা মৃত্যুদণ্ডের গতিধারার বিপরীতে যাচ্ছে (সংবাদ, ২৮ নভেম্বর ২০০৮)
মৃত্যুদণ্ড বিলোপের জন্য জাতিসংঘ আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছে (সংবাদ, ২০ নভেম্বর ২০০৮)
এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করুন প্রচারাভিযান