খনি খনন ভারতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে

এই ভূমি আমাদের
খনি খনন ভারতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে

‘পাহাড় আমাদের দেবতা আর পৃথিবী আমাদের দেবী। এই দুয়ের মাঝে আমাদের আছে বৃষ্টি আর জল। এখানে যারা খনি খনন করতে চায় তারা ধীরে ধীরে এই দুটোরই দখল নিয়ে নেবে। তখন আমরা কোথায় যাবো?’
নিয়ামগিরি পাহাড়ের লাকপাদ্দরের আদিবাসী ডনগ্রিয়া কোন্দহ পুরুষ

‘আমাদের পাহাড়গুলোতে যদি আমাদের বিভক্ত করে দেয়া হয় এবং আমরা যদি ক্ষুধার জ্বালায় মৃত্যুমুখে পড়ি, তার দায়দায়িত্ব তোমাদেরই নিতে হবে।’
নিয়ামগিরি পাহাড়ের লাকপাদ্দরের আদিবাসী ডনগ্রিয়া কোন্দহ নারী

ভারতের উড়িষ্যার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত নিয়ামগিরি পাহাড়ে একটি খনি খননের পরিকল্পনা চলছে। কিন্তু এর ফলে ওই এলাকাতে প্রাচীণকাল থেকে বসবাসকারী আদিবাসীদের জীবন ও জীবিকা যে হুমকির মুখে পড়তে পারে সে বিষয়টিকে বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে না। ওখানে প্রাচীণকাল থেকে বসবাসকারী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নাম হলো ডনগ্রিয়া কোন্দহ। তারা শুধুমাত্র নিয়ামগিরি পাহাড়ী এলাকাগুলোতেই বসবাস করে। এখন তারা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। গত এপ্রিল মাসে ভারতীয় সরকার ভেদান্তা এলুমিনিয়াম লিমিটেড (যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি কোম্পানির সাবসিডিয়ারি) ও উড়িষ্যা রাজ্যের মালিকানাধীন উড়িষ্যা মাইনিং করপোরেশনকে ডনগ্রিয়া কোন্দহ-দের আদি ভূমিতে আগামী ২৫ বছর ধরে বক্সাইট (এক ধরনের কাদামাটি যা থেকে এলুমিনিয়াম পাওয়া যায়) অনুসন্ধানের লক্ষ্যে খনি খননের অনুমতি দিয়েছে।

সম্মতির প্রয়োজনীয়তা
আদিবাসীদের অধিকার সংক্রান্ত জাতিসংঘের ঘোষণার ৩২ ধারা অনুযায়ী আদিবাসীদের ভূমি, এলাকা কিংবা অন্য কোনো সম্পদকে প্রভাবিত করে এমন ধরনের প্রকল্প গ্রহণের আগে তাদেরকে বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো ও তাদের কাছ থেকে সম্মতি গ্রহণের দরকার রয়েছে। বিশেষ করে তাদের খনিজ সম্পদ, পানি কিংবা অন্য কোনো সম্পদ ব্যবহার করে উন্নয়নমূলক কাজ করার আগে তাদের কাছ থেকে সম্মতি নেয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

সুরক্ষিত জনগোষ্ঠী
শতাব্দীকাল ধরে নিয়ামগিরি পাহাড়ে বসবাসকারী আদিবাসী ডনগ্রিয়া কোন্দহ-র প্রায় ৮০০০ সদস্য নিয়ামগিরি পাহাড়গুলোকে পবিত্র ভূমি হিসেবে গণ্য করে। এখানকার পাহাড়গুলো তাদের পরিচয়, ধর্মীয় বিশ্বাস, জীবনযাপনের ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি ও সংস্কৃতির সম্মিলিত পরিচায়ক। এই পাহাড়গুলো ডনগ্রিয়া আদিবাসী সমাজের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড ও বেঁচে থাকার জন্যেও ‍অত্যাবশ্যক। এখানে তারা শিকার করে, পাহাড়ের ঢালে চাষাবাদ করে, প্রয়োজনীয় পানীয় জল, জ্বালানী কাঠ আর ঔষধি গাছের জন্যেও তারা পাহাড়গুলোর উপর নির্ভর করে, আর এভাবেই তারা সেখানে বেঁচে আছে।

ভারতীয় আইনে ডনগ্রিয়া কোন্দহ-র মতো আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোর বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। তাদের অধিকার, বসবাসের জন্যে ঐতিহ্যগতভাবে তাদের দখলে থাকা ভূমি ও এলাকাগুলো ভারতীয় সংবিধান ও একাধিক জাতীয় আইন দ্বারা সুরক্ষিত এবং সেই সুরক্ষার বিষয়টি আদিবাসীদের অধিকার সংক্রান্ত জাতিসংঘের ঘোষণা দ্বারা পুনর্বার নিশ্চিত করা হয়েছে। এসব কিছু সত্বেও এখানে খনি খনন সংক্রান্ত বিষয়টি নিয়ে আদালতে পরিবেশবাদীরা দীর্ঘ চার বছর ধরে লড়াই করছে, সেই সূত্রে ভারতীয় বিচারবিভাগ এই সংরক্ষিত এলাকাতে খনি খননের অনুমতি দিয়েছে। আদালতের এই রায় সম্পর্কে আদিবাসী ডনগ্রিয়া কোন্দহদের মন্তব্য হলো, এর মাধ্যমে বনাঞ্চল ধ্বংস হবে এবং যার ফলে তাদের জীবন হুমকির সম্মুখীন হবে।

ডনগ্রিয়া কোন্দহ আদিবাসীরা এখানে প্রস্তাবিত খনি খননের বিরোধীতা করেছে। তারা নিয়ামগিরি পাহাড়ী এলাকাকে পূণ্যভূমি হিসেবে গণ্য করে, তাই সেখানে খনন কাজ থেকে বিরত থাকার জন্যে কর্তৃপক্ষের প্রতি আবেদন জানিয়েছে। তারা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে আশঙ্কা করছে যে, খনি খনন করার মতো কর্মকান্ড পাহাড়গুলোর মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া তাদের জলের একমাত্র উৎস ঝর্ণাপ্রবাহে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। এছাড়াও পরিবহন ব্যবস্থা, খনি খননের কাজে বিপুল সংখ্যক মানুষের আগমন এবং খনি খননের কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি তাদের জীবনধারনের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

কোনো ধরনের যাচাই নয়, পরামর্শ নয়
গত মার্চ মাসে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল নিয়ামগিরি পাহাড়ী এলাকা পরিদর্শনকালে যা দেখতে পায় তা থেকে একথা সুস্পষ্ট যে সেখানে খনি খনন করা হলে ওই এলাকায় বসবাসরত ডনগ্রিয়া কোন্দহ ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মানবাধিকার বিপদাপন্ন হবে। বিশেষ করে প্রস্তাবিত খনন কার্য ওই এলাকায় বসবাসরতদের ঐতিহ্যবাহীভাবে সেখানকার ভূমি, জল, খাদ্য, স্বাস্থ্য, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও তাদের কাজের অধিকার মারাত্মভাবে লংঘিত করবে।

ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ডনগ্রিয়া কোন্দহ আদিবাসীদের জীবনযাপন ও সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী চর্চা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না বরং তারা তাদের ঐতিহ্য বজায় রেখে চলতে পারবে এমন বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে প্রকল্প অনুমোদনের আগে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখেনি।

ভেদান্ত এলুমিনিয়ামের পূর্বসূরি কোম্পানি স্টেরলিট ইন্ডাস্ট্রি ২০০২ সালে এখানকার পরিবেশগত প্রভাব যাচাইয়ের জন্যে একটি জরিপ করিয়েছিলো। ওই রিপোর্টে ডনগ্রিয়া কোন্দহ ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মানুষের খনির পাশে বসবাসের বিষয়টি সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে কিছুর উল্লেখ নেই। জরিপকারীরা ওখানে বসবাসরতরা কিভাবে তাদের প্রয়োজনীয় জল, কাঠ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ সংগ্রহ ও ব্যবহার করে তা পরীক্ষা করে দেখেনি। এবং ওখানে খনি খনন করা হলে দীর্ঘমেয়াদে আদিবাসীদের জীবনযাত্রায় তার কি প্রভাব পড়বে সেটি কার্যকরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখেনি।

ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এই প্রকল্প অনুমোদনের আগে ডনগ্রিয়া কোন্দহ কমিউনিটিকে সকল কিছু জানিয়ে তাদের কাছ থেকে স্বাধীন মতামত ও প্রয়োজনীয় পূর্বানুমতি নেয়নি যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। গত ফ্রেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে প্রস্তাবিত খনি খনন বিষয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সাধারণ জনগণের মতামত সংগ্রহ করার লক্ষ্যে গণশুনানির আয়োজন করে। যদিও এসময়ে ওই পাহাড়ী এলাকাগুলোতে বসবাসকারী ডনগ্রিয়া কোন্দাহ জাতিগোষ্ঠীকে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত করা হয়নি। কিংবা তাদেরকে মতামত দিতে গণশুনানিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। ওই এলাকাতে বক্সাইট খোঁজার জন্যে খনি খনন করার ফলে সম্ভাব্য কি ধরনের ঝুঁকি রয়েছে এবং এর নেতিবাচক দিকগুলো কি সেসম্পর্কে গণশুনানিতে কোনো ধরনের তথ্য উপাত্ত উপস্থাপন করা হয়নি।

ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের অনুমোদন নিয়ে এখন ভেদান্ত এলুমিনিয়াম ও উড়িষ্যা মাইনিং করপোরেশন যৌথভাবে ওই এলাকার উন্নয়নের জন্যে একটি প্রস্তাবনা তৈরি করছে। সেখানে ডনগ্রিয়া কোন্দহ ও অন্যান্য আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর উন্নয়নের রূপরেখাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই ধরনের প্রস্তাবনা তৈরির সময় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কোনো ধরনের পরামর্শ করা হচ্ছে না কিংবা তাদের কাছে কোনো কিছুই খুলে বলা হচ্ছে না।

আজকে খনি খননের কারণে বিলুপ্তপ্রায় আদিবাসী জনগোষ্ঠী ডনগ্রিয়া কোন্দহর অস্তিত্ব ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে। এই অবস্থায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো মানবাধিকার রক্ষা ও তাদের জীবনযাপনের ধারা বজায় রাখতে সহায়তা করা।


এখনই পদক্ষেপ নিন
মানবাধিকার রক্ষায় ভারতের জাতীয় পরিবেশগত আপিল কর্তৃপক্ষের (ন্যাশনাল এনভায়রণমেন্টাল এপিলেট অথরিটি) কাছে লিখুন:

- নিয়ামগিরিতে খনি প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেয়া পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রত্যাহার করে নিতে তাদের প্রতি আহ্বান জানান এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না ওখানে বসবাসরত ডনগ্রিয়া কোন্দহ ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মানবাধিকার পুরোপুরি রক্ষা না পাবে ও সেলক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হবে ততোক্ষণ পর্যন্ত কোম্পানিকে খনি খননের অনুমতি দেয়া থেকে বিরত থাকতে আবেদন জানান।

- এখানে খনি খননের ফলে কি ধরনের মানবাধিকার ও পরিবেশগত ক্ষতি হতে পারে সেটি যাচাইয়ের জন্যে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কমিটি গঠন ও সেখানে ডনগ্রিয়া কোন্দহ ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর পূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা ও সকল ধরনের ফলাফল জনসম্মুখে প্রকাশের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে তাদের প্রতি আহ্বান জানান।

- প্রস্তাবিত খনি প্রকল্পের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে ডনগ্রিয়া কোন্দহসহ এমন সকল আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে একটি সত্যিকারের পরামর্শ সভা আয়োজনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে তাদের প্রতি আহ্বান জানানো।

- তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিন যে, আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে নিয়ামগিরি পাহাড়ী এলাকায় যেকোনো ধরনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড করা ও ডনগ্রিয়া কোন্দহদের ঐতিহ্যবাহী ভূমি ব্যবহারের আগে তাদের কাছ থেকে পূর্বানুমতি নিতে হবে এবং সেলক্ষ্যে তাদেরকে সকল বিষয় সম্পর্কে তাদেরকে অবগত করে তাদেরকে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ ও সিদ্ধান্ত জানানোর সুযোগ দিতে হবে।


অনুগ্রহ করে লিখুন:

Chairperson
National Environmental Appellate Authority
J. L. Nehru Stadium, Gate No. 31
Lodi Road
New Delhi 110003, India
ফ্যাক্স: +91 11 2617 4594
সম্বোধন: প্রিয় চেয়ারপারসন


অনুলিপি দিন:
Mr Jairam Ramesh
Minister of State for Environment and Forests
Government of India
New Delhi 110003, India
ফ্যাক্স: Fax: +91 11 2436 0519
সম্বোধন: প্রিয় মন্ত্রী

Mr Naveen Patnaik
Chief Minister
Government of Orissa
Bhubaneswar
Orissa, India
ফ্যাক্স: +91 674 2400 100
সম্বোধন: প্রিয় মুখ্য মন্ত্রী


উপরে ও ইনসাইডে: নিয়ামগিরি পাহাড়ে প্রস্তাবিত বক্সাইট খনি খননের ফলে যাদের জীবন হুমকির মুখে পড়বে সেই ডনগ্রিয়া কোন্দাহ জাতিগোষ্ঠীর অনেক মানুষের কয়েকজন।

ডানে উপরে: খনি খননের বিরোধীতাকারীরা নিয়ামগিরি পাহাড়ে অবস্থিত তাদের গ্রামে কোম্পানির যানবাহন প্রবেশে বাধা দিতে রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে।

প্রচ্ছদ: একটি অব্যবহৃত কনভেয়র বেল্ট। এটি বেআইনীভাবে তৈরি করা হয়েছে। প্রস্তাবিত খনি খনন করে নিয়ামগিরি পাহাড় থেকে বক্সাইট লানজিগড়ে অবস্থিত রিফাইনারিতে নিয়ে যেতে এই কনভেয়র বেল্টটি তৈরি করা হয়েছে। কোম্পানি বলতে চায় যে, বক্সাইট খনি ও কনভেয়র বেল্ট খনির আশেপাশে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর জীবনে কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না।