গুয়ান্তানামোর বন্দীদেরকে মানবিক সুরক্ষা প্রদানের জন্য মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইউরোপীয় সরকারসমূহকে আহ্বান জানাচ্ছে

১০ নভেম্বর ২০০৮

(বার্লিন, নভেম্বর ১০, ২০০৮) -- গুয়ান্তানামোর যেসব বন্দীদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অপরাধের অভিযোগ আনা হবে না কিন্তু নির্যাতন বা অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কায় তাদের নিজেদের দেশে ফেরত পাঠানো যাবে না তাদেরকে মানবিক সুরক্ষা প্রদানের জন্য পাঁচটি নেতৃস্থানীয় মানবাধিকার সংগঠন আজ ইউরোপীয় সরকারগুলোকে আহ্বান জানিয়েছে৷ ইউরোপীয় সরকারগুলো তাদের দেশে তাদেরকে গ্রহণে সম্মত হওয়া উচিত এবং তাদেরকে পর্যাপ্ত সহায়তা প্রদান নিশ্চিত করা উচিত৷

 

এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, সেন্টার ফর কন্সটিটিউশনাল রাইটস্‌, হিউম্যান রাইটস্‌ ওয়াচ, রিপ্রাইভ এবং ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন ফর হিউম্যান রাইটস্‌ এই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রশাসনের সাথে কাজ করার জন্য সরকারগুলোকে আহ্বান জানাচ্ছে যাতে গুয়ান্তানামো বন্দী শিবিরটি সহজে বন্ধ করে দেয়া যায়৷

 

“কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই, শুধুমাত্র এই কারণে গুয়ান্তানামো কারাগারে বন্দী হয়ে থাকা ৫০ জন ব্যক্তির জন্য আমাদেরকে অবশ্যই একটি সমাধান খুঁজে বের করতে হবে,” বলেছেন এমি ম্যাকলিয়েন, সেন্টার ফর কন্সটিটিউশনাল রাইটস্‌-এর স্টাফ এ্যাটর্নি৷ “যুক্তরাষ্ট্র সরকার এর আগে দুইবার আমাদের মক্কেল, আবদুল রউফ আল কাশিমকে লিবিয়াতে পাঠানোর চেষ্টা করেছিল যদিও আশংকা করা হয় যে ফেরত পাঠানো হলে তাকে নির্যাতন করা হবে, অথবা তিনি লিবিয়ার জেলে হারিয়ে যেতে পারেন৷ তার জীবন নির্ভর করছে আরেকটি দেশের দরজা তার জন্য উন্মুক্ত করার মাধ্যমে সাধারণ মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শনের উপর৷”

 

“সবাই যথার্থভাবে একমত যে গুয়ান্তানামো অবশ্যই বন্ধ করে দেয়া উচিত, এবং প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত ওবামা বলেছেন যে তিনি এটা বন্ধ করে দিবেন,” বলেছেন ড্যানিয়েল গোরেভান, এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ‘ন্যায়বিচারের মাধ্যমে সন্ত্রাস প্রতিরোধ’ প্রচারাভিযানের ম্যানেজার৷

 

স্পষ্টতঃ, যে সব ব্যক্তিকে তাদের নিজেদের দেশে ফেরত পাঠানো যাবে না তাদেরকে সুরক্ষা প্রদানের মাধ্যমে অন্য সরকারগুলো এটি ঘটতে সাহায্য করতে পারে৷ এটির একটি দ্বৈত প্রভাব থাকবেঃ একজন ব্যক্তির মানবাধিকার লঙ্ঘন করে তাকে অবৈধভাবে আটক রাখার নিদারুণ যন্ত্রণার অবসানে সাহায্য করা, এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার স্ক্যান্ডাল - গুয়ান্তানামো - বন্ধ করতে সহায়তা করা৷”

 

“‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই’-এর ভ্রান্ত কর্মকান্ডঃ বন্দী হস্তান্তর, গোপনে আটক রাখা, ও নির্যাতন-কে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আটলান্টিকের উভয় পারের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ, বলেছেন কোরি ক্রাইডার, রিপ্রাইভের স্টাফ এ্যাটর্নি৷ “প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত ওবামা বলেছেন যে তিনি গুয়ান্তানামো বন্ধ করে দিবেন -- প্রশ্ন হচ্ছে কখন ও কীভাবে৷ রিপ্রাইভের একজন মক্কেলকে তিউনিশিয়ায় ফেরত পাঠানো হয়, তাকে মাদকাসক্ত করা হয়, আঘাত করা হয়, এবং তার স্ত্রী ও কন্যাকে ধর্ষণ করার হুমকি দেয়া হয়৷ আরেকজন এমনকি এখনো লড়াই করছেন, গুয়ান্তানামোতে থাকার জন্য, কারণ তিউনিশিয়া তাকে ‘পিপার ভেতরে ঢুকিয়ে পানি দিয়ে নির্যাতন’ করার হুমকি দিয়েছে৷ যুক্তরাষ্ট্র এখনো তাকে ফেরত পাঠানোর কথা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেছে৷ ইউরোপ ওবামার কাছে পৌঁছানো এবং এই অল্প কিছু ব্যক্তিকে নিরাপদ বিকল্প প্রদানের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী বার্তা পাঠাতে পারে৷”

 

“প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত ওবামা গুয়ান্তানামো বন্ধ করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কিন্তু তার ইউরোপের সাহায্য দরকার হবে,” বলেছেন জোয়ান মেরিনার, হিউম্যান রাইটস্‌ ওয়াচের সন্ত্রাসবাদ ও সন্ত্রাসদমন পরিচালক৷ “যে সব বন্দীকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো যাবে না তাদের কয়েকজনকে গ্রহণ করতে সম্মত হওয়ার মাধ্যমে ইউরোপীয় সরকারগুলো বহু-প্রয়োজনীয় সাহায্য প্রদান করতে পারে৷”

 

“এফআইডিএইচ ও সিসিআর ইউরোপীয় সংসদের ৭৭ জন সদস্যকে একত্রিত করেছে যারা গুয়ান্তানামোর বন্দীদেরকে আশ্রয় দেয়ার জন্য ইইউ-এর সদস্য দেশগুলোকে সম্মিলিতভাবে আহ্বান জানিয়েছে৷ যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে, ইইউ-এর উচিত এই ব্যক্তিদের সরিয়ে নিতে প্রশাসনকে সহায়তা করা,” বলেছেন এফআইডিএইচ-এর সভাপতি সোহায়ের বেলহাসেন৷

 

পটভূমি

গুয়ান্তানামোতে আটক সবার জন্য সমাধান খুঁজে বের করার প্রাথমিক দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের, কারণ যুক্তরাষ্ট্রই তাদেরকে বন্দী শিবিরে নিয়ে এসেছে এবং সেখানে তাদেরকে অবৈধভাবে আটক রেখেছে৷ যদি যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার এবং সাধারণ মার্কিন আদালতে তাদের বিচারের পরিকল্পনা না করে, এবং তাদেরকে তাদের নিজেদের দেশে নিরাপদে মুক্তি দিতে না পারে, তাহলে তাদেরকে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে মুক্তি দেয়ার সুযোগ সৃষ্টির জন্য তাদেরকে অবিলম্বে প্রস্তাব দেয়া উচিত৷

 

তবে, এটাও পরিষ্কার যে, ইউরোপ ও অন্যান্য দেশের সরকারগুলো এই ব্যক্তিদেরকে মানবিক সুরক্ষা প্রদানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা উচিত যাতে বছরের পর বছর যন্ত্রণা ভোগ করার পর তাদের জীবন নির্বাহ করার জন্য তারা একটি নিরাপদ স্থান পেতে পারে৷ এই সমস্যার একটি সমাধানে পৌঁছানোর জন্য ইউরোপীয় সরকারগুলোর সম্পৃক্ততা সহায়ক ভূমিকা রাখবে - যা গুয়ান্তানামো বন্ধ করার আন্তর্জাতিক লক্ষ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সমাধান ৷

 

গুয়ান্তানামোতে বর্তমানে আটক প্রায় ৫০ জন বন্দীকে তাদের নিজেদের দেশে আইনসম্মতভাবে ফেরত পাঠানো যাবে না কারণ তারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের, যেমন নির্যাতন বা অন্যান্য নিষ্ঠুর-আচরণের শিকার হওয়ার সত্যিকার ঝুঁকির মধ্যে থাকবে৷ তারা চীন, লিবিয়া, রাশিয়া, তিউনিশিয়া, ও উজবেকিস্তান সহ অন্যান্য দেশ থেকে এসেছে৷

 

এনজিও এবং মানবাধিকার রক্ষার বিষয়ে সক্রিয় অন্যান্য আন্তর্জাতিক কুশীলব কর্তৃক বার্লিনে আয়োজিত দুই-দিনব্যাপী একটি রুদ্ধদ্বার কৌশলগত কর্মশালার পর মানবাধিকার সংগঠনগুলো তাদের এই আহ্বান জানিয়েছে৷

 

আন্তর্জাতিক কুশীলবদের সমর্থনমূলক বিবৃতি

 

“আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছি৷ গুয়ান্তানামো বন্ধ করে দেয়া, শাসনমূলকভাবে বন্দী রাখার মার্কিন অনুশীলনের সমাপ্তি, এবং সকল পরিস্থিতিতে নির্যাতন নিষিদ্ধ করা সহ মৌলিক মানবাধিকারের মূলনীতিগুলো সুনিশ্চিত করার কথা পুনরায় ঘোষণা করা - যা এখন প্রত্যাশা করা সম্ভব৷ কিন্তু সেখানো পৌঁছানোর জন্য ইউরোপীয় সংশ্লিষ্টতা ও সমর্থন অপরিহার্য হবে৷ ইউরোপের সরকারগুলোকে যে পদক্ষেপটি গ্রহণ করতে হবে তা হচ্ছে গুয়ান্তানামোর অল্প কিছু ব্যক্তিকে তাদের সীমান্তে গ্রহণ করে নেয়া যাদেরকে নিরাপদে তাদের দেশে প্রত্যাবাসন করা যাবে না৷ এই লোকগুলো এমন একটি দেশ পাওয়ার আগে গুয়ান্তানামো বন্ধ করা যাবে না যে দেশটি তাদেরকে গ্রহণ করবে, এবং যেখানে তাদের জীবন ও স্বাধীনতা বিপন্ন হবে না৷”

ম্যানফ্রেড নোওয়াক, নির্যাতন সম্পর্কিত জাতিসংঘের বিশেষ দূত

 

“আমি ইউরোপীয় সরকারগুলোকে অল্প কয়েকজন মানুষের জন্য তাদের দরজা উন্মুক্ত করার আহ্বান জানাচ্ছি যাদেরকে তাদের নিজেদের দেশে স্থানান্তর করা হলে যন্ত্রণাভোগ বা নির্যাতনের আশঙ্কা রয়েছে৷ এই ধরনের সহায়তা হচ্ছে করার জন্য সঠিক কাজ, এবং গুয়ান্তানামো উপসাগর অবিলম্বে বন্ধ করার জন্য চাপ প্রয়োগে আমাদের প্রচেষ্টায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ৷”

টমাস হ্যামারবার্গ, ইউরোপীয় কাউন্সিলের মানবাধিকার কমিশনার

 

“গুয়ান্তানামো বন্ধ করার জন্য কর্মরত ইউরোপীয় সরকারগুলো এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের সাথে এই প্রচেষ্টাগুলো এখন অবশ্যই নবায়ন করতে হবে এবং যারা তাদের নিজেদের দেশে নিরাপদে ফিরে যেতে পারবে না তাদেরকে সুরক্ষার প্রস্তাব দিতে হবে৷ আগামী মাসগুলো সবচেয়ে ইতিবাচক উপায়ে ব্যবহার করার জন্য মানবাধিকার এনজিওগুলোর প্রচেষ্টা সর্বোত্তম সময়ে আসছে৷”

এ্যান-মেরি লিজিন, অর্গানাইজেশন ফর সিক্যুরিটি অ্যান্ড কোঅপারেশন ইন ইউরোপ (ওএসসিই)-এর সংসদীয় সভার গুয়ান্তানামো বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি, এবং ওএসসিই-এর সংসদীয় সভার সহ-সভাপতি৷