এশিয়াঃ মৃত্যুদন্ড বিলোপের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময়
অক্টোবর ১০, ২০০৮
প্রেস বিজ্ঞপ্তি
বিশ্বের অন্য যে কোনো অংশের তুলনায় এশিয়া প্রতি বছর অধিক সংখ্যক মানুষের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করায়, এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আজ (১০ অক্টোবর তারিখে), মৃত্যুদন্ডের বিরুদ্ধে বিশ্ব দিবসে, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানকে বিশ্ব জুড়ে মৃত্যুদন্ড বিলোপের জন্য যে প্রবনতা তৈরী হয়েছে তাতে যোগ দিতে এবং অবিলম্বে মৃত্যুদন্ডের প্রয়োগ স্থগিত রাখার জন্য বিধান তৈরী করতে আহ্বান জানিয়েছে৷
২০০৭ সালে এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের নজরে আসা যে ১,২৫২ জন ব্যক্তির মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার ঘটনা লিপিবদ্ধ করেছে তার মধ্যে শতকরা ৮৮ ভাগের জন্য দায়ী ছিল চীন, ইরান, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্র৷
এশিয়াতে, ১৪টি দেশ এখনো মৃত্যুদন্ড কার্যকর করছে কিন্তু ২৭টি দেশ এখন আইন করে বা প্রায়োগিকভাবে মৃত্যুদন্ড বিলোপ করেছে৷
‘‘এশিয়াতে এখন পরিবর্তনের একটি আশার আলো ও সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে৷ আজ আমরা ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানকে বিশ্ব জুড়ে মৃত্যুদন্ড বিলোপের জন্য যে শুভ প্রবনতা তৈরী হয়েছে তাতে যোগ দিতে এবং মহাদেশের বাকি দেশগুলোর জন্য অনুসরণ করার মত উদাহরণ স্থাপন করতে সনির্বন্ধভাবে আহ্বান জানাচ্ছি,’’ বলেছেন এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব আইরিন খান৷
ভারত ২০০৪ সাল থেকে কোন ব্যক্তির মৃত্যুদন্ড কার্যকর করেনি, যদিও এখনো মৃত্যুদন্ডের রায় প্রদান করা অব্যাহত রয়েছে। ২০০৭ সালে কমপক্ষে ১০০ জন এবং যা প্রায়ই এমন সব বিচারের মাধ্যমে ঘটেছে যেখানে গরীব আসামীরা পর্যাপ্ত আইনী প্রতিনিধিত্ব পায় না৷
দক্ষিণ কোরিয়া মৃত্যুদন্ড সর্বশেষ কার্যকর করেছিল ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরে, যখন ২৩ জন ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়৷ ২০০৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর তারিখে, প্রেসিডেন্ট ছয়জন ব্যক্তির মৃত্যুদন্ড পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেন৷ তবে, ৫৮ জন বন্দি মৃত্যুদন্ডের রায় নিয়ে অপেক্ষা করছে৷
২০০৫ সালের ডিসেম্বরের পর থেকে তাইওয়ান কোনো মৃত্যুদন্ড কার্যকর করেনি৷ এই বছর দুইজন ব্যক্তিকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হয়, যার অর্থ হচ্ছে তাইওয়ানে বর্তমানে ৩০ জন ব্যক্তি মৃত্যুদন্ডের সারিতে আছে৷
‘‘বিভিন্ন ধরনের অপরাধের কারণে মৃত্যুদন্ডের প্রয়োগ অব্যাহত রয়েছে এবং এশিয়ার অনেকগুলো দেশে অন্যায্য বিচারের মাধ্যমে প্রায়ই মানুষের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়৷ এছাড়াও মৃত্যুদন্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার গুরুতর অভাব রয়েছে,’’ বলেছেন আইরিন খান৷
জাপানে ২০০৮ সালে এখন পর্যন্ত ১৩ জন ব্যক্তির মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়েছে যেখানে ২০০৭ সালে মোট নয়জন ব্যক্তির মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়েছিলো এবং ১০০ জনেরও বেশি ব্যক্তি বর্তমানে মৃত্যুদন্ডের সারিতে রয়েছে৷ জাপানে ফাঁসি সাধারণত গোপনীতার বেড়াজালে মুড়ে রাখা হয় এবং একজন বন্দিকে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার মাত্র কয়েক ঘন্টা আগে তা জানানো হয়৷
পাকিস্তানে বর্তমানে প্রায় ৭,৫০০ ব্যক্তি মৃত্যুদন্ডের সারিতে রয়েছেন, যাদের মধ্যে শিশুরাও রয়েছে, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হত্যাকান্ডের জন্য। ২০০৭ সালে কমপক্ষে ১৩০ জন ব্যক্তির মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়েছে এমন বিচারের মাধ্যমে যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পক্ষপাতদুষ্টতা ও আসামীদের জন্য ন্যায়বিচারের অভাবের কারণে চিহ্নিত হয়ে আছে৷
ভিয়েতনামে, মোট ২৯টি অপরাধের কারণে দেশটির দন্ডবিধিতে ঐচ্ছিক মৃত্যুদন্ডের বিধান রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে মাদক পাচারের অপরাধ৷ ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে কার্যকর করা মৃত্যুদন্ড রাষ্ট্রীয় গোপনীয় তথ্য হিসেবে চিহ্নিত, কিন্তু ২০০৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০০৮ সালের মে মাসের শেষ পর্যন্ত, এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল প্রচারমাধ্যমের সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছে যে, ৯১ জন ব্যক্তিকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হয়েছে এবং যাদের মধ্যে ১৫ জন মহিলা৷
‘‘এক বছর আগে ব্যাপক সংখ্যক দেশ জাতিসংঘে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা স্থগিত রাখার পক্ষে ভোট দেয়৷ এই বছর এটিকে বাস্তবতায় পরিণত করার জন্য পদক্ষেপ নিতে আমরা এশিয়ার নেতাদেরকে আহ্বান জানাচ্ছি,’’ বলেছেন আইরিন খান৷ ‘‘তাদের উচিত সারাবিশ্বের মানুষের আহ্বান শোনা, যারা এই নিষ্ঠুর ও অমানবিক শাস্তি বিলোপের দাবিতে আজ একত্রিত হচ্ছে৷’’
এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বিশ্বাস করে যে মৃত্যুদন্ড জীবনের অধিকারকে লঙ্ঘন করে, অপরাধ কমানোতে এর কোনো সুস্পষ্ট প্রভাব নেই এবং আধুনিক অপরাধ বিচার পদ্ধতিতে এর কোনো স্থান নেই৷
সংগঠনটি ২০০৭ সালে ২৪টি দেশে কমপক্ষে ১,২৫২ জন ব্যক্তির মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার ঘটনা লিপিবদ্ধ করেছে, এবং সেইসাথে এটিও লিপিবদ্ধ করেছে যে ৫১টি দেশে কমপক্ষে ৩,৩৪৭ জন ব্যক্তিকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হয়৷ চীন, ইরান, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করেছে, যার মধ্যে চীন বিশ্বের নেতৃস্থানীয় ঘাতক রাষ্ট্র৷
পটভূমি
এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ওয়ার্ল্ড কোয়ালিশন আ্যাগেইনস্ট দি ডেথ পেনাল্টি ও এন্টি ডেথ পেনাল্টি এশিয়া নেটওয়ার্ক ও অন্যান্য মৃত্যুদন্ড-বিরোধী প্রচারাভিযান পরিচালনাকারী সংগঠনগুলো ১০ অক্টোবর তারিখে সারাবিশ্বজুড়ে স্থানীয় কর্মসূচির আয়োজন করছে৷ ডব্ল্যুসিএডিপি হচ্ছে ৭৪টিরও বেশি মানবাধিকার সংস্থা, আইনজীবী সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন এবং স্থানীয় ও আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষের একটি জোট, যারা বিশ্বকে মৃত্যুদন্ড থেকে মুক্ত করার প্রচেষ্টায় একত্রিত হয়ে ২০০২ সালের মে মাসে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে৷
২০০৭ সালে, চীন কমপক্ষে ৪৭০, ইরান ৩১৭, সৌদি আরব ১৪৩, পাকিস্তান কমপক্ষে ১৩৫, ভিয়েতনাম ২৫, আফগানিস্তান ১৫ এবং জাপান ৯ জন ব্যক্তির মৃত্যুদন্ড কার্যকর করেছে৷
এখন বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি দেশ আইন করে বা প্রায়োগিকভাবে মৃত্যুদন্ড বিলোপ করেছে৷ ২০০৮ সালের জুন মাসের শেষে, এই সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩৭-এ৷ এই ১৩৭টি দেশের মধ্যে, ৯২টি সকল অপরাধের জন্য বিলোপ করেছে, ১১টি শুধুমাত্র সাধারণ অপরাধের জন্য বিলোপ করেছে এবং ৩৪টি প্রায়োগিকভাবে বিলোপ করেছে৷
এশিয়াতে যে ২৭টি দেশ সব ধরনের অপরাধের জন্য আইন করে বা প্রায়োগিকভাবে মৃত্যুদন্ড বিলোপ করেছে সেগুলো হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, ভূটান, কম্বোডিয়া, কুক দ্বীপপুঞ্জ, কিরিবাতি, মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ, মাইক্রোনেশিয়া (ফেডারেল রাষ্ট্র), নেপাল, নিউজিল্যান্ড, নিউই, পালাও, ফিলিপাইন, সামোয়া, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, তিমুর-লেস্তে, টুভালু ও ভানুয়াতু৷ ফিজি শুধুমাত্র সাধারণ অপরাধের জন্য বিলোপ করেছে৷ ব্রুনাই, দক্ষিণ কোরিয়া, লাওস, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, নাউরু, পাপুয়া নিউগিনি, শ্রীলংকা ও টোঙ্গা প্রায়োগিকভাবে বিলোপ করেছে৷
২০০৭-এর ডিসেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ “মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা মুলতবি রাখার” আহ্বান জানিয়ে ব্যাপক ভোটাধিক্যের মাধ্যমে প্রস্তাবটি ৬২/১৪৯ ভোটে পাস করে যেখানে ১০৪টি দেশ পক্ষে ভোট দেয়, ৫৪টি দেশ বিপক্ষে ভোট দেয় এবং ২৯টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে৷
এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলো যেভাবে ভোট দেয় তা নিম্নরূপঃ
পক্ষে (১৫): অস্ট্রেলিয়া, কম্বোডিয়া, কিরিবাতি, মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ, মাইক্রোনেশিয়া, নাউরু, নেপাল, নিউজিল্যান্ড, পালাও, ফিলিপাইন, সামোয়া, শ্রীলংকা, তিমুর-লেস্তে, টুভালু ও ভানুয়াতু৷
ভোটদানে বিরত (৫): ভূটান, ফিজি, দক্ষিণ কোরিয়া, লাওস ও ভিয়েতনাম৷
বিপক্ষে (১৮): আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ব্রুনাই, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, মঙ্গোলিয়া, মিয়ানমার, উত্তর কোরিয়া, পাকিস্তান, পাপুয়া নিউগিনি, সিঙ্গাপুর, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, থাইল্যান্ড ও টোঙ্গা৷
Delicious
Digg
Facebook
Technorati