বস্তি: মানবাধিকার যেখানে অবিস্ফোরিত

মহাদেশগুলো জুড়ে ১০০ কোটিরও বেশি মানুষ বস্তিতে বাস করছে। এই ধরনের বস্তিগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো সেখানে বসবাসের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই, মৌলিক সেবাগুলো পাওয়া যায় না, অনেক মানুষ সেখানে গাদাগাদি করে বসবাস করে এবং উচ্চ পর্যায়ের সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতা থাকা। আবার এই রকম এক অবস্থার মধ্যে বসবাসকারী বস্তিবাসী মানুষগুলো বেঁচে থাকার জন্যে কাজ করে ও তাদের সন্তানদের গড়ে তোলে। অথচ এই মানুষগুলোর অধিকার রক্ষায় অনেক দেশের সরকার তাদের দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে।

এদিকে বস্তিবাসী মানুষের সংখ্যা বিশ্বজুড়ে বিপজ্জনকভাবে বেড়ে চলেছে। গ্রাম এলাকাগুলোতে বিনিয়োগ না ঘটা, সংঘাত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলবায়ু পরিবর্তন, জোরপূর্বক উচ্ছেদ ও বড় বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ভূমি দখলের কারণে মানুষজন এলাকা ছেড়ে শহরগুলোতে যেতে বাধ্য হচ্ছে যেখানে সাধ্যের মধ্যে বসতবাড়ি পাওয়া দুষ্কর।

বস্তিতে বসবাসকারী মানুষজন এমন অনেক ধরনের মানবাধিকার লংঘনের অনেক ঘটনার শিকার হয়, যা স্বাভাবিক চিন্তায় আসে না। তারা প্রায় নিয়মিতভাবে বসবাসের অপর্যাপ্ততা, নিরাপদ পানি প্রাপ্তি, স্যানিটেশন ও পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধা পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় এবং বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সুবিধা থেকেও তারা বঞ্চিত হয়। এছাড়াও তারা সবসময় পুলিশ ও সংঘবদ্ধ সহিংসতা ও জোরপূর্বক উচ্ছেদের ভয়ে ভীত থাকে।

বস্তিবাসীরা ‍অসামঞ্জস্যভাবে উচ্চ ভাড়া প্রদান করে থাকে কারণ ওই এলাকাগুলোতে ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন কালেভদ্রে প্রয়োগ করা হয়। কর্তৃপক্ষ ওই এলাকাগুলোকে ‘অবিধিসম্মত’ হিসেবে গণ্য করেন বিধায় এরা ন্যায়বিচার পাওয়া থেকে যেমন বঞ্চিত হয় তেমনি বিদ্যমান বৈষম্যের কারণে এখানকার বাসিন্দারা তাদের বসতবাড়ি কিংবা সেবার মান বাড়ানোর জন্যে কোনো ধরনের দাবী জানাতে পারে না।

বস্তিগুলোতে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ও বিদ্যালয় না থাকার কারণে বস্তিবাসী মানুষজনের পক্ষে স্বাস্থ্য যত্ন ও শিক্ষা পাওয়া কঠিন। বস্তিগুলো শহর এলাকাতে হওয়া সত্বেও এখানকার অপুষ্টি ও শিশু মৃত্যুর হার অনেকসময়ই গ্রাম এলাকাগুলোর সঙ্গে মিলে যায়।

উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক শহুরে বাসিন্দার বসবাসের ও কাজের নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় আইনী কাগজপত্র থাকে না, যেকারণে তাদের জোরপূর্বক উচ্ছেদের সম্ভাবনা বেড়ে যায় এবং বিভিন্ন ধরনের সেবা ও আনুষ্ঠানিক চাকরি ব্যবস্থায় তাদের প্রবেশাধিকার বাধাগ্রস্ত হয়। এমনকি সরকারি কাগজপত্র ছাড়াই বস্তি এলাকাগুলোতে বাস করে এমন নাগরিকদের ভোটের অধিকার পর্যন্ত অস্বীকার করা হয়।

জোরপূর্বক উচ্ছেদ মানবাধিকারের লংঘন এবং এই ধরনের উচ্ছেদের কারণে প্রায়শ দেখা যায় লোকজন তাদের নিজেদের সহায়-সম্বল হারাতে বাধ্য হয়, তাদের সামাজিক যোগাযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তারা কাজ ও সেবাসমূহে প্রবেশাধিকার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়। বিভিন্ন দেশের সরকার তাদের নিজ নিজ দেশে বস্তি সরিয়ে শহরের উন্নয়ন ঘটাতে, সৌন্দর্য্য বাড়াতে কিংবা বেইজিং অলিম্পিকের মতো প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বস্তিবাসীদের ব্যাপকভাবে জোরপূর্বক উচ্ছেদ ঘটায়। এই ধরনের উচ্ছেদের ঘটনা বেড়েই চলেছে।

বস্তিগুলোতে নারীরা বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে, সেখানকার পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় সুবিধাদির অভাব তাদেরকে যৌন আক্রমণ ও নিপীড়নের ঝুঁকির মধ্যে রাখে এবং এখানে আরো উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বস্তিতে সংঘটিত পারিবারিক সহিংসতার ঘটনাগুলোকে পুলিশ গুরুত্ব দিয়ে দেখে না। এছাড়াও সম্পত্তি আইনেও বস্তিবাসী নারীদের প্রায়শ বৈষম্যের শিকার হতে হয়।

বস্তিতে বসবাসকারী ব্যক্তিদের নেতিবাচক মনোভাব জনগণের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে মারাত্মক ধরনের অবনতি ঘটায় যা সামাজিক পরিবেশকে সরাসরি প্রভাবিত করে। ব্রাজিল ও জ্যামাইকাতে এই ধরনের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রের ব্যর্থতার কারণে অপরাধী চক্র ও মাদক নিয়ন্ত্রণকারী গ্রুপগুলো আধিপত্য বিস্তারের সূত্রে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয় যা জীবনের সকল ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করে।

বিশ্বের সরকারগণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় পর্যায়ের এই ধরনের বিষয়গুলো সমাধানে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জোরপূর্বক উচ্ছেদের অবসান, সরকারি সুযোগ-সুবিধায় বস্তিবাসী মানুষের সম অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এবং বস্তি উন্নয়নের সকল পরিকল্পনায় সেখানকার বাসিন্দাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকারসমূহের প্রতি আহ্বান জানায়।