অস্বীকৃতির বিবরণঃ বন্দী হস্তান্তর ও গোপনে আটক রাখার ক্ষেত্রে ইউরোপের ভূমিকা
“আমাকে জবাই করা গরুর মতো ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল, মাথা নিচে, পা উপরে, হাতগুলো পিছমোড়া করে বাঁধা, পাগুলোও একসাথে করে বাঁধা, এবং আমার সারা গায়ে বৈদ্যুতিক শক দেয়া হয় এবং বিশেষকরে মাথায়… ও স্তনের বোঁটায় এবং আমার যৌনাঙ্গে...”
আবু ওমর, তাকে বন্দী অবস্থায় মিশরে ফেরত পাঠানোর পর তার উপর নির্যাতনের বর্ণনা দিচ্ছিলেন
ওসামা মোস্তফা হাসান নাসের, সাধারণভাবে আবু ওমর নামে পরিচিত, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০০৩ তারিখে ইতালীর মিলান শহরের একটি রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলেন, যখন তাকে অপহরণ করা হয়৷ তারপর তাকে যুক্তরাষ্ট্রের এজেন্টদের কাছে হস্তান্তর করা হয়, উত্তর ইতালীর অ্যাভিয়ানো এয়ারবেসে নেয়া হয় এবং আকাশপথে, জার্মানি হয়ে, সিআইএ-এর ভাড়া করা একটি বিমানে মিশরের কায়রোতে নিয়ে যাওয়া হয়৷ সেখানে তাকে গোপনে ১৪ মাস আটক করে রাখা হয়৷ তিনি জানান যে সাত মাস ধরে তাকে দিনে ১২ ঘন্টা পর্যন্ত নির্যাতন করা হয়৷ অবশেষে ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়৷
আবু ওমর যুক্তরাষ্ট্রের বন্দী হস্তান্তর ও গোপনে আটক রাখা কর্মসূচির অনেক শিকারদের একজন যা “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই”-এর পটভূমিতে পরিচালনা করা হয়৷ ভিকটিমদেরকে আটক করা হয় এবং তারপর অন্য একটি দেশের বন্দীশালায় স্থানান্তর করা হয়, গোপনে এবং কোনো ধরনের বিচার প্রক্রিয়া ছাড়াই, এবং আরেকটি দেশে নিয়ে যাওয়া হয়৷ কাউকে কাউকে যুক্তরাষ্ট্রের কারাগার থেকে অন্য দেশের কারাগারে স্থানান্তর করা হয় যেখানে নির্যাতন বা অন্যান্য দুর্ব্যবহার নিয়মিতভাবে করা হয়; অন্যদেরকে গুয়ান্তানামো উপসাগর বা আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের আটক কেন্দ্রগুলোতে স্থানান্তর করা হয়৷ অন্যদেরকে সিআইএ কর্তৃক পরিচালিত “ব্ল্যাক সাইট” বা “কালো জায়গাগুলোতে” অবস্থিত গোপন বন্দীশালায় রাখা হয়৷ সবাইকে তাদের পরিবার বা আইনজীবীর সাথে দেখা করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত রাখা হয়৷ সবাইকে নির্যাতন বা অন্য কোনোভাবে দুর্ব্যবহার করা হয়৷
বন্দী হস্তান্তর ও গোপনে আটক রাখার ক্ষেত্রে ইউরোপিয়ান দেশগুলোর সংশ্লিষ্টতার ব্যাপ্তি, দীর্ঘদিন ধরে জানা ছিল যদিও সরকারিভাবে তা অস্বীকার করা হয়, এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সহ অন্যদের অসংখ্য, কষ্টকর তদন্তের মাধ্যমে এটি ক্রমবর্ধমানভাবে সুস্পষ্ট হয়ে এসেছে৷
এই ভূমিকার মধ্যে রয়েছে সক্রিয় অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে মৌন সম্মতি পর্যন্ত৷ ইউরোপিয়ান এজেন্টরা সন্দেহভাজনদেরকে আটক করেছে এবং বিচার প্রক্রিয়া ছাড়াই তাদেরকে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছে৷ হস্তান্তরের শিকার বন্দীদেরকে মাথায় আবরণী ও শিকল পরিয়ে সারাবিশ্বজুড়ে অবস্থিত স্থানগুলোতে জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতনের জন্য নিয়ে যেতে সিআইএ-পরিচালিত বিমানগুলো ইউরোপের বিমানবন্দরগুলোকে বিনাবাধায় ব্যবহার করেছে৷
২০০২ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত, ইউরোপ ছিল সিআইএ-এর “ব্ল্যাক সাইটগুলোর” আশ্রয়দাতা৷ এই সকল কর্মসূচির শিকারদেরকে গোপন স্থানে অবস্থিত নির্জন কারাকক্ষে বছরের পর বছর ধরে এমন অবস্থায় আটক রাখা হয় যা নির্যাতন ও অন্যান্য দুর্ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞাকে লঙ্ঘন করে৷
তদুপরি, যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে যে গোপন স্থানে আটক বন্দীদের উপর সিআইএ অনেকগুলো “উন্নত তদন্ত” পদ্ধতি ব্যবহার করে৷ ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, সিআইএ-এর পরিচালক নিশ্চিত করেছেন যে ২০০২ ও ২০০৩ সালে গোপন স্থানে আটক তিনজন বন্দীর উপর “ওয়াটারবোর্ডিং” নামে পরিচিত নির্যাতনের পদ্ধতিটি ব্যবহার করা হয়েছিল৷
এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইউরোপীয় দেশগুলোকে আহ্বান জানাচ্ছেঃ
বন্দী হস্তান্তর ও গোপনে আটক রাখাকে বেআইনী ঘোষণা করে তার নিন্দা করার জন্য৷
বন্দী হস্তান্তর, গোপনে আটক রাখা বা বলপূর্বক অন্তর্ধানের ঘটনাগুলোতে তাদের এজেন্টদের সংশ্লিষ্টতা বা ভূখন্ড ব্যবহারের অভিযোগ সম্পর্কে কার্যকর, স্বাধীন ও নিরপক্ষেভাবে তদন্ত করার জন্য৷
বন্দী হস্তান্তর, গোপনে আটক রাখা বা বলপূর্বক অন্তর্ধানের ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী হতে পারে এমন যুক্তিসঙ্গতভাবে সন্দেহভাজন যে কাউকে ন্যায়বিচারের সম্মুখীন করার জন্য৷
অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য৷
গোপনে আটক রাখা ও বন্দী হস্তান্তর প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য যাতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছেঃ কোনো ব্যক্তিকে অন্য দেশের হেফাজতে হস্তান্তর করা, বা এই ধরনের স্থানান্তরে সাহায্য করা শুধুমাত্র যদি স্থানান্তরটি বিচার বিভাগের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন করা হয়, এবং এটি নিশ্চিত করা যে কাউকে জোর করে এমন কোনো স্থানে যাতে ফেরত পাঠানো না হয় যেখানে তারা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে থাকে৷
বন্দী হস্তান্তর, গোপনে আটক রাখা বা বলপূর্বক অন্তর্ধানের শিকার ব্যক্তিদেরকে ক্ষতিপূরণ প্রদান করা৷
আরো তথ্যের জন্য দেখুন, অস্বীকৃতির বিবরণঃ বন্দী হস্তান্তর ও গোপনে আটক রাখার ক্ষেত্রে ইউরোপের ভূমিকা (ইইউআর ০১/০০৩/২০০৮)