ইরাকী হাজতে স্থানান্তর যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আটক ব্যক্তিদের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ করবে

২২ জুলাই ২০০৯

বিনাবিচারে আটক ব্যক্তিদের ঝুঁকির মুখে ইরাকী হাজতে না পাঠাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি  আহ্বান জানান

প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার অঙ্গীকার ছাড়াই সম্পাদিত এক চুক্তির আওতায় আমেরিকান সামরিক বাহিনীর হাতে আটক ডিটেনশনপ্রাপ্ত শত শত ব্যক্তিকে ইরাকের হাজতে দেয়ার যে প্রক্রিয়া চলছে সেটি সফল হলে আটক ব্যক্তিরা ফাঁসি, নির্যাতন কিংবা অন্য যেকেনো দুর্ব্যবহারের শিকার হতে পারেন।

আমেরিকান কারাগারে আটক ব্যক্তিদের স্ট্যাটাস অফ ফোর্সেস এগ্রিমেন্ট (সোফা) চুক্তির আওতায় ইরাকী হাজতে স্থানান্তর করার চুক্তিটি স্বাক্ষর করেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ও ইরাকী প্রধানমন্ত্রী নূরী আল-মালিকি। এই চুক্তিটি গত ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর করা হয়েছে। এই চুক্তির অধীনে ইরাক থেকে আমেরিকান সৈন্যরা আগামী ২০১১ সালের শেষভাগে ইরাক ছেড়ে চলে যাবে।
ইতোমধ্যে আমেরিকান হাজতে আটক কয়েকজনকে অন্যায্য বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে। এদের কারো মৃত্যুদন্ড এখনো কার্যকর করা হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে ইরাকের হেফাজতে দেয়ার পর এদের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হবে।

ইরাক সরকার ২০০৪ সাল থেকে সেদেশে মৃত্যুদণ্ড পুনরায় চালু করেছে। এরপর এযাবতকালে কয়েক শত মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। প্রায়শ অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে জোরপূর্বক কিংবা ভয় দেখিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় করে তাদেরকে দোষী প্রমাণ করা হয়।

গত ৯ মার্চ তারিখে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানতে পারে যে ১২৮ জন ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এই অবস্থায় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের জীবন রক্ষায় জরুরি আবেদন জানায়। আন্তর্জাতিক চাপ থাকা সত্ত্বেও ইরাকী কর্তৃপক্ষ গত ৩ মে তারিখে ১২ জন ব্যক্তির মৃত্যুদন্ড কার্যকর করে। পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে আরো কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক বাহিনী (এমএনএফ) কর্তৃক দেয়া গত ১৭ জুনের এক বিবৃতিতে জানানো হয় যে, ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বন্দী মোট ব্যক্তির সংখ্যা ১০,৯৫৬ জন। বিবৃতিতে আরো বলা হয় যে, গত ১ জানুয়ারি থেকে এমএনএফ ৮০০ এরও বেশি গ্রেফতারি পরোয়ানা কিংবা আটকাদেশ পাওয়ার পর এপর্যন্ত প্রায় ৭০০ জন ডিটেনশনপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে তারা ইরাকী কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছে।

সোফা চুক্তি অনুযায়ী আটক ব্যক্তিকে ইরাকের হাজতে স্থানান্তর করতে হলে তার বিরুদ্ধে ইরাকী কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকতে হবে। গত জুন মাসে ইরাকী সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, ইরাকী কর্তৃপক্ষ এমএনএফ এর হাজতে থাকা ৮০৭ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে, যাদের মধ্যে প্রায় ৬০৪ জনকে ইরাকী হাজতে স্থানান্তর করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী কর্তৃক আটক ব্যক্তিদের মধ্যে সাবেক ইরাকী রাষ্ট্রপতি সাদ্দাম হোসেনের অধীনস্থ সাবেক বাথ পার্টি, নিরাপত্তা ও সামরিক কর্মকর্তাগণ রয়েছেন। সাদ্দাম হোসেনকে এক অন্যায্য বিচার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ফাঁসি দেয়া হয়।

সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা, যাদের মধ্যে আলী হাসান আল-মাজেদ, সুলতান হাশিম আহমেদ আল-তাঈ, হুসেন রশিদ আল-তিকৃতি ও আবদুল গনি আবদুল গফুর বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হেফাজতে রয়েছেন। সাদ্দাম হোসেনের শাসনামলে মারাত্মক ধরনের অপরাধের শাস্তি হিসেবে তাদেরকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। তাদেরকে যে বিচার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সাজা দেয়া হয়েছে সেই বিচার প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক ন্যায্য বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিলো না। এবং তাদেরকে যদি ইরাকী কর্তৃপক্ষের হাতে হস্তান্তর করা হয় তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার খুবই সম্ভাবনা রয়েছে।

ইরাকী ডিটেনশন ক্যাম্প ও কারাগারে আটক ব্যক্তিদের উপর যেভাবে নির্যাতন চালানো হয় তা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের জন্যে একটি বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ। গত জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে বাগদাদে অবস্থিত আল-রুসাফা ডিটেনশন ক্যাম্পের কয়েকশত বন্দী কারাগারের বসবাসের অবস্থা এবং কারারক্ষী কর্তৃক নির্যাতন ও অন্যান্য দুর্ব্যবহারের প্রতিবাদে অনশন ধর্মঘট শুরু করে। এসময়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা স্বীকার করেন যে মন্ত্রণালয় পরিচালিত কারাগারগুলোতে মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা ঘটছে। ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত আল-দিওয়ানিয়াহ কারাগারে ইরাকী মানবাধিকার কমিশন কর্তৃক পরিচালিত এক তদন্ত থেকে ‘স্বীকারোক্তি’ আদায়ের লক্ষ্যে জেরাকালে আটক কয়েকজন ব্যক্তিকে নির্যাতন করার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে।