জরুরি পদক্ষেপ
বাংলাদেশ জাহাঙ্গীর আলম আকাশ (পুরুষ), সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী
মানবাধিকার রক্ষাকর্মী জাহাঙ্গীর আলম আকাশকে গত ২৪ অক্টোবর, ২০০৭ তারিখে গ্রেফতার করা হয় ৷ তথ্য মতে, তার উপর ব্যাপক নির্যাতন চলানো হয় এবং তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে প্রয়োজনীয় জরুরি চিকিৎসা পর্যন্ত দেয়া হয়নি৷
Rapid Action Battalion (RAB) এর ১০-১২ জনের একটি গ্রুপ সাদা পোশাকে রাজশাহী শহরের উত্তর-পশ্চিমাংশে অবস্থিত তার বাড়িতে আসে৷ রাত তখন প্রায় ২টা৷ তার স্ত্রী পরিচয় না পাওয়া পর্যন্ত র্যাশব সদস্যদের ঘরে ঢুকতে দিচ্ছিলেন না৷ ঘরে ঢোকার পর RAB সদস্যরা তল্লাশি করতে চাইলে তিনি তল্লাশি পরোয়ানা দেখতে চান৷ তখন RAB সদস্যরা তল্লাশি পরোয়ানা দেখাতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলে যে, ‘অবৈধ অস্ত্র’ এর খোঁজে তারা ঘরে তল্লাশি করবে৷ RAB তার স্বামীকে মেরে ফেলবে এই ভয় থেকে আকাশের স্ত্রী কি ঘটছে দেখানোর জন্যে কয়েকজন প্রতিবেশীকে ডেকে আনে৷ RAB সদস্যরা জাহাঙ্গীর আলম আকাশকে শক্ত করে ধরে মুখে মারতে থাকে ও অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করতে থাকে৷ এরপর হাতকড়া পরিয়ে কালো কাপড় দিয়ে মুখচোখ ঢেকে তাকে নিয়ে চলে যায়৷
তাকে কাছাকাছি এক সেনা ছাউনিতে নিয়ে গিয়ে প্রচন্ডভাবে মারধোর করা হয়৷ এখন তাকে রাজশাহী জেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে৷ তার সারা শরীরে কাটাকুটি ও আঁচড়ের দাগ, তার পা ফুঁলে গিয়েছে এবং তিনি হাঁটতে পারেন না৷ জানা যায় হাসপাতালে তার প্রয়োজনীয় ও উপযুক্ত চিকিৎসা দেয়া হয়নি৷
জাহাঙ্গীর আলম আকাশ দুটি এনজিও’র স্থানীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন৷ একটি এনজিও-র নাম- টাস্কফোর্স এগেইনস্ট টর্চার এবং অন্যটি বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অফ হিউম্যান রাইটস৷ মানবাধিকার বিষয়ে তার উদ্বেগ স্বাধীন টেলিভিশন কেন্দ্র সিএসবি নিউজের রাজশাহী ব্যুরো প্রধান হিসেবে তার কাজকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে৷ মে মাসের ২ তারিখ তিনি ওইদিনই রাজশাহীতে ঘটে যাওয়া RAB কর্তৃক বিচার বহির্ভূত এক হত্যা প্রচেষ্টার উপর একটি প্রতিবেদন তৈরি করেন৷ প্রতিবেদনটি মে মাসের ৩ তারিখে একাধিকবার সিএসবি নিউজে প্রচার করা হয়৷ প্রতিবেদনে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ঘটনার শিকার ব্যক্তির স্ত্রীর জবানবন্দী প্রচার করা হয়৷ তার স্ত্রী র্যা ব সদস্যদের বাড়িতে আসা ও তার ও তাদের মেয়ের সামনে তার স্বামীকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর সবিস্তার বর্ণনা করেন৷ তিনি এও জানান যে এসময়ে তার স্বামী কোনো প্রতিরোধের চেষ্টাই করেনি৷
সেদিন সন্ধ্যায় নিজেকে স্থানীয় RAB অফিসের মেজর পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি ফোনে জাহাঙ্গীর আলম আকাশকে RAB কর্মকাণ্ড নিয়ে কোনো ধরনের রিপোর্ট করা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেয়৷ তাকে RAB কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত না হওয়ার জন্যে সতর্ক করে দেয়৷ আর কোনো ধরনের রিপোর্ট যাতে সে প্রকাশ না করে সে বিষয়ে সতর্ক করে দিয়ে বলে নতুবা তাকে মারাত্মক পরিণতি ভোগ করতে হবে৷ এই ধরনের ভীতি প্রদর্শন আন্তর্জাতিকভাবে নিন্দিত হয়, যা RAB-কে এখন পর্যন্ত আরো কোনো ধরনের প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নেয়া থেকে বিরত রেখেছে৷
এরপর ২৩ অক্টোবর তার বিরুদ্ধে আনীত এক ব্যক্তির অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে ‘বলপূর্বক চাঁদাবাজি’-র অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়৷ একজন সচেতন মানুষ হিসাবে জাহাঙ্গীর আলম আকাশের দেয়া তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে এই অভিযোগকারীই ইতিপূর্বে ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিলেন৷ আকাশের বন্ধু ও স্বজনরা আকাশের বিরুদ্ধে আনীত এই অভিযোগকে মিথ্যা ও রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্য প্রণোদিত উল্লেখ করে বলেছেন যে, RAB এর মানবাধিকার লংঘনের ঘটনার বিরোধীতা করার প্রেক্ষিতে তাকে শায়েস্তা করার জন্যেই এমন অভিযোগ সাজানো হয়েছে৷
জাহাঙ্গীর আলম আকাশ তার কাজের জন্য অনেকবার মৃত্যুর হুমকি পেয়েছেন এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সমালোচনা করে লেখার জন্যে তাকে কয়েকবার নির্যাতিত হতে হয়েছে৷ ক্ষমতাসীন দলের মধ্যেকার বিবদমান দুই গ্রুপের উপর এক রিপোর্ট প্রকাশের পর ২০০৩ সালের জুলাই মাসে তাকে চোখ বেঁধে অপহরণ করে ব্যাপকভাবে পেটানো হয়৷
পটভূমি
রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ ক্ষমতাসীন জোট সরকার এবং বিরোধী দলগুলোর সমর্থকদের মধ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা নির্বাচন সংক্রান্ত সংঘর্ষ চলাকালে ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন৷ এ অবস্থায় ২২ জানুয়ারিতে নির্ধারিত নির্বাচন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয় এবং সামরিক বাহিনীর সমর্থনপুষ্ট একটি নতুন বেসামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশ পরিচালনার শপথ নেয়৷ জরুরি অবস্থার মধ্যে রাজনৈতিক মিছিল, সভা সমাবেশ এবং অন্য সকল ধরনের রাজনৈতিক কর্মকান্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় এবং স্বাধীন মত প্রকাশের উপর কিছুটা বিধিনষেধ আরোপ করা হয়৷
RAB-এর হাতে শতাধিক লোক মারা গিয়েছে৷ RAB হলো একটি প্যারামিলিটারি পুলিশ ফোর্স যা গঠন করা হয়েছে সেনা ও পুলিশ সদস্যদের সমন্বয়ে ২০০৪ সালের মার্চ মাসে৷ সরকারি সূত্রে জানা যায়, মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে RAB এজেন্ট ও সন্দেহভাজন অপরাধীদের মধ্যে সংঘটিত ক্রসফায়ারে৷ কিন্তু একাধিক রিপোর্ট মতে, হ্ত্যার ঘটনাগুলো RAB কর্তৃক ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটানো হয়েছে৷ এছাড়াও এখন পর্যন্ত এই ধরনের হত্যাকান্ডের জন্যে কোনো RAB সদস্যকে বিচারের সম্মুখীন হতে হয়নি৷
বাংলাদেশের পূর্ববর্তী সরকারসমূহের মতোই তত্ত্বাবধায়ক সরকার সামরিক বাহিনী ও RAB এর মাত্রাতিরিক্ত কর্মকান্ডের হাত থেকে জনগণকে রক্ষা করতে কিংবা মানবাধিকার লংঘনের ঘটনায় তাদের কাউকে বিচারের সম্মুখীন করতে ব্যর্থ হয়েছে৷
সাধারণের জন্যে এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইনডেক্স: এএসএ ১৩ ৷ ০১২ ৷ ২০০৭
১ নভেম্বর ২০০৭
ইউএ ২৮৫৷০৭৷নিরাপত্তার জন্য ভয়৷নির্যাতন৷বিবেক-বন্দী
বাংলাদেশ: নিরাপত্তার জন্য ভয়৷নির্যাতন ৷ বিবেক-বন্দী : জাহাঙ্গীর আলম আকাশ (পুরুষ)