অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল প্রতিবেদন ২০০৯: গণপ্রজাতন্ত্রী ভারত
ভারত
গণপ্রজাতন্ত্রী ভারত
রাষ্ট্রপ্রধানঃ প্রতিভা পাতিল
সরকার প্রধানঃ মনমোহন সিং
মৃত্যুদণ্ডঃ রেখে দেয়ার পক্ষে
জনসংখ্যাঃ ১,১৮৬.২ মিলিয়ন
প্রত্যাশিত জীবনকালঃ ৬৩.৭ বছর
৫-বছরের কম বয়সীদের মৃত্যুহার (ছেলে/মেয়ে): ৭৩/৮৩ প্রতি ১,০০০ জনে
বয়স্ক সাক্ষরতাঃ শতকরা ৬১ ভাগ
ধর্মীয় ও ভাষাগত সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে উপদলীয় সহিংসতায় এবং জাতিগত সংঘর্ষের সময় পুলিশ হয় নিষ্ক্রিয় ছিল অথবা মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল৷ আদিবাসী (আদিবাসী জনগোষ্ঠী) ও ক্ষুদ্র কৃষকরা নতুন উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলোতে সরকারের সিদ্ধান্ত-গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে তাদেরকে বাইরে রাখার বিরুদ্ধে অব্যাহতভাবে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে, যে প্রকল্পগুলো তাদের জীবিকাকে হুমকির সম্মুখীন করতে পারে এবং যার ফলে তারা বলপূর্বক উচ্ছেদ হতে পারে৷ মাওবাদী ও সরকার ও মিলিশিয়াদের মধ্যে অব্যাহতভাবে চলা স্বল্প মাত্রার সংঘাত সরকার দ্বারা সমর্থিত বলে ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয়৷ উভয় পক্ষই নির্যাতন করেছে যাতে বেসামরিক জনগণকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়৷ দেশের বিভিন্ন অংশে বোমা বিস্ফোরণ শত শত মানুষকে হত্যা করে৷ এর প্রতিক্রিয়ায় সরকার সন্দেহভাজনদেরকে বিনা বিচারে আটক রেখেছে এবং নির্যাতন করেছে৷ নভেম্বর মাসে মুম্বাইয়ে হামলার পর, যাতে ১৭০ জনেরও বেশি ব্যক্তি নিহত হয়, সরকার নিরাপত্তা আইন কঠোর করে এবং সন্ত্রাসী হামলা সম্পর্কে তদন্ত করার জন্য একটি কেন্দ্রীয় সংস্থা গঠন করে৷ বিচার প্রক্রিয়া সাম্প্রদায়িক সহিংসতার শিকার অনেক ব্যক্তির জন্য সুবিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে৷ আদালতগুলো কমপক্ষে ৭০ জন ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছে৷ কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি৷
পটভূমি
নভেম্বর মাসে মুম্বাই হামলায় ১৭০ জন নিহত হওয়ার পাশাপাশি, জয়পুর, আহমেদাবাদ, বাঙ্গালোর, মালেগাঁ, দিল্লী ও ইমফল শহরে এবং ত্রিপুরা ও আসাম রাজ্যে বোমা হামলায় ৪০০ জনেরও বেশি ব্যক্তি নিহত হয়৷
নভেম্বরের মুম্বাই হামলাগুলো পাকিস্তান-ভিত্তিক ব্যক্তি বা দল কর্তৃক সংঘটিত হয়েছে বলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করার পর ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের অবনতি ঘটে৷ কাশ্মীর সম্পর্কে আলোচনা সহ ভারত-পাকিস্তান শান্তি উদ্যোগ অগ্রগতি অর্জনে ব্যর্থ হয়৷
নারীর বিরুদ্ধে ব্যাপক সহিংসতার বিরুদ্ধে সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল অপর্যাপ্ত৷
যদিও ভারত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন অব্যাহত রেখেছে, জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ, প্রায় ৩০ কোটি লোক দারিদ্রসীমার নিচে রয়ে গেছে, যাদের প্রায় শতকরা ৭০ ভাগ গ্রামে বসবাস করে৷
ভারতীয় কর্তৃপক্ষ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর, যেমন ভূমিহীন কৃষক ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের, অধিকার নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করতে পারেনি, যারা শিল্প-কারখানার জন্য তাদের জমি ও অন্যান্য সম্পদের অপব্যবহারের বিরোধীতা করে৷
সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা
অগাস্ট মাসে, একজন উল্লেখযোগ্য হিন্দু নেতা এবং তার চারজন সহযোগী, যারা হিন্দুদেরকে খ্রিস্টানে পরিণত করার বিরুদ্ধে প্রচারাভিযান চালিয়েছিলেন, উড়িষ্যা রাজ্যে খুন হন, যা খ্রিস্টান সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে দুই মাসব্যাপী হামলার সূচনা করে৷ এই হামলাগুলোতে কমপক্ষে ২৫ জন নিহত হয়, যা হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলোর সমর্থকদের দ্বারা পরিচালিত হয় যারা ভারতীয় জনতা পার্টির (উড়িষ্যার ক্ষমতাসীন জোটের শরিক) সহযোগী বলে জানা যায়, এবং হামলাগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল অগ্নি-সংযোগ, লুটতরাজ ও নারীদের ওপর যৌন নির্যাতন৷ পুলিশ হয় ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে অথবা মাত্রাতিরিক্ত শক্তি ব্যবহার করেছে যার মধ্যে ছিল ১৫ জন ব্যক্তির ওপর প্রাণঘাতী গুলিবর্ষণ৷ এই সহিংসতায় কমপক্ষে ১৫,০০০ ব্যক্তি বাস্তুচ্যুত হয়, যাদের অধিকাংশই খ্রিস্টান৷ বাস্তুচ্যুতদের কমপক্ষে দুইটি ক্যাম্পে, হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলোর সমর্থকদের দ্বারা খ্রিস্টানরা সহিংস হামলার শিকার হওয়া অব্যাহত থাকে৷ দুই মাসের সহিংসতায়, হামলাগুলোর সাথে জড়িত থাকার দায়ে ২৫০ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়৷ তবে, বছরের শেষ পর্যন্ত কোনো বিচার বিভাগীয় তদন্ত সম্পন্ন করা হয়নি৷
সেপ্টেম্বর মাসে, হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠনের সমর্থকরা কর্ণাটকে খ্রিস্টানদের ৩০টি ধর্মীয় উপাসনালয় ক্ষতিগ্রস্ত করে৷ শুধুমাত্র বিরোধী দলের প্রতিবাদের পরেই সন্দেহভাজন অপরাধীদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়৷
মুম্বাই শহরে এবং মহারাষ্ট্রের অন্যান্য জায়গায়, উত্তরের জেলাগুলোর ভাষাগত সংখ্যালঘুরা বার বার মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনার সমর্থকদের হামলার শিকার হয়, যার ফলে প্রায় ১,০০০ পরিযায়ী কর্মী রাজ্যটি থেকে পালিয়ে যায়৷ হামলা বন্ধে এবং সন্দেহভাজন অপরাধীদেরকে গ্রেপ্তারে পুলিশ মন্থর ছিল৷
আসামের বড়ো সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলায় মুসলিম সম্প্রদায় ও বড়ো সম্প্রদায়ের সদস্যদের মধ্যে আন্তঃ-জাতিগত সংঘাতে ৫০ জনেরও বেশি ব্যক্তি নিহত হয়৷ সহিংসতা প্রতিরোধে কর্তৃপক্ষ সময়মত ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হয়৷
জুলাই ও অগাস্ট মাসে, জম্মু ও কাশ্মীরে জাতিগত বিক্ষোভ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যা আগে আর কখনো দেখা যায়নি এবং অনেক ক্ষেত্রে তা সহিংসতায় ফেটে পড়ে৷ সহিংসতা মোকাবেলায় পুলিশ মাত্রাতিরিক্ত শক্তি ব্যবহার করে এবং ৬০ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করে৷
অনেকগুলো রাজ্যে দলিত সম্প্রদায়ের সদস্যরা হামলা ও বৈষম্যের শিকার হওয়া অব্যাহত ছিল৷ জাতিগত সহিংসতার জন্য দায়ী অপরাধীদের বিচার করার জন্য তৈরি করা বিদ্যমান বিশেষ আইন প্রয়োগে কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে৷
ছত্রিশগড়ে দলিত ও আদিবাসী সহ সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে কাজ করা মানবাধিকার কর্মীরা হয়রানির শিকার হওয়া অব্যাহত রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে রাজ্য পুলিশ কর্তৃক বিনা বিচারে অনির্দিষ্ট কালের জন্য আটক রাখা৷
সাম্প্রদায়িক সহিংসতা মোকাবেলার জন্য ২০০৫ সালে প্রণীত আইন বছরের শেষ পর্যন্ত সংসদে বিবেচনাধীন ছিল৷
জোরপূর্বক উচ্ছেদ
খনিজ আহরণ, সেচ প্রকল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শহুরে অবকাঠামো নির্মাণ ও অন্যান্য শিল্প প্রকল্পের জন্য গ্রামীণ এলাকাগুলোতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোকে জোর করে বাস্তুচ্যুত বা উচ্ছেদ করে, যাদের মধ্যে ছিল ভূমিহীন কৃষক ও আদিবাসীরা৷ অনেকগুলো রাজ্যে, কর্তৃপক্ষ আদিবাসীদেরকে এমন সব ভূমি থেকে উচ্ছেদ করেছে যেগুলো সাংবিধানিক বিধিতে শুধুমাত্র আদিবাসীদের জন্য নির্ধারণ করা ছিল৷ কর্তৃপক্ষ নতুন আইন মেনে চলতে ব্যর্থ হয়েছে যা পরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর জন্য ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে তথ্য লাভের নিশ্চয়তা প্রদান করে৷ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জনগোষ্ঠীগুলোকে সিদ্ধান্ত-গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে বাইরে রাখা হয়েছে৷ ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া এবং পুনর্বাসন ও পুনরায় বসতি স্থাপন সম্পর্কিত নীতির উন্নয়ন সংক্রান্ত আইন সংসদে বিবেচনাধীন ছিল৷
ভূমি অধিগ্রহণ ও জোরপূর্বক উচ্ছেদের বিরুদ্ধে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রতিবাদ অব্যাহত ছিল৷ কিছু কিছু ক্ষেত্রে, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদেরকে লাঠিচার্জের মাধ্যমে পুলিশ প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং কোনো অভিযোগ আনা ছাড়াই তাদেরকে এক সপ্তাহ পর্যন্ত আটক রাখে৷ ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সহযোগী হিসেবে পরিগণিত মিলিশিয়ারা যখন বিক্ষোভকারীদেরকে সহিংসভাবে দমন করে, তখন পুলিশ বিক্ষোভকারীদেরকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়৷ কর্তৃপক্ষ এই ঘটনাগুলোর অনেকগুলোরই সময়মত বা নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করেনি৷
• মে মাসে, উড়িষ্যার কালিঙ্গনগর ইস্পাত শহর কমপ্লেক্সে জোরপূর্বক উচ্ছেদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের সময় প্রাইভেট মিলিশিয়া বাহিনী একজন আদিবাসী নেতা আমিন বানরাকে গুলি করে হত্যা করে বলে জানা যায়৷ কর্তৃপক্ষ দুইজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে কিন্তু তারা যে একটি বিরাট প্রাইভেট মিলিশিয়া বাহিনীর সদস্য ছিল সেই সম্পর্কিত রিপোর্টের তদন্ত করতে ব্যর্থ হয়৷
• অগাস্ট মাসে, বেদান্ত নামক একটি বহুজাতিক কোম্পানি ও সরকারের যৌথ উদ্যোগে ডংগ্রিয়া খন্দ এলাকার সংরক্ষিত বনাঞ্চলে একটি বক্সাইটের খনি চালু করার জন্য সুপ্রীম কোর্ট অনুমোদন দিলে উড়িষ্যার বিপন্ন ডংগ্রিয়া খন্দ আদিবাসী সদস্যরা পুনরায় বিক্ষোভ শুরু করে৷
• পশ্চিমবঙ্গের সিঙ্গুরে কৃষকদের পূর্বানুমতি এবং অবহিত সম্মতি ছাড়াই একটি গাড়ি নির্মাণ কারখানার জন্য তাদের জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে কৃষক ও বিরোধী দলগুলোর ছয়-মাস-দীর্ঘ বিক্ষোভে কমপক্ষে ৩০ জন ব্যক্তি আহত হয়৷ পরবর্তীতে বিক্ষোভরত জনগণ ও রাজ্য কর্তৃপক্ষের মধ্যে আলোচনা ব্যর্থ হয়, যার ফলে কর্তৃপক্ষ এই প্রকল্পটি গুজরাটে স্থানান্তর করতে বাধ্য হয়৷
মানবাধিকার রক্ষাকর্মী
গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ভূমি ও পরিবেশগত অধিকারের জন্য প্রচারাভিযান পরিচালনাকারী মানবাধিকার রক্ষাকর্মীরা পুলিশ কর্তৃক হয়রানি, নির্যাতন ও অন্যান্য দুর্ব্যবহারের শিকার হয় এবং প্রাইভেট মিলিশিয়া বাহিনীর সহিংস হামলার শিকার হয়, যা কখনো কখনো মৃত্যুর কারণ হয়৷
স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও মানবাধিকার রক্ষাকর্মীদের অব্যাহত পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করেছে যে গ্রামীণ দরিদ্র জনগণের বছরে কমপক্ষে ১০০ দিন কাজ করার অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদানকারী নতুন আইনটি অল্প কিছু রাজ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে৷
নিরাপত্তা বাহিনী, মিলিশিয়া ও মাওবাদীদের মধ্যে সহিংসতা
ছত্রিশগড়ে, সশস্ত্র মাওবাদী দলগুলো ও সালওয়া জুদুম (একটি মিলিশিয়া বাহিনী যাকে রাষ্ট্র-সমর্থিত বলে ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয়) সমর্থিত রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মধ্যে সংঘাত অব্যাহত ছিল৷ উভয় পক্ষই বেসামরিক লোকজনকে লক্ষ্যবস্তু করে, মূলতঃ আদিবাসীদেরকে, যারা হত্যাকাণ্ড, অপহরণ ও নির্যাতন এবং অন্যান্য নিপীড়ন সম্পর্কে জানিয়েছে৷ প্রায় ৪০,০০০ আদিবাসী এখনো আভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত অবস্থায় আছে, যার মধ্যে ২০,০০০ জন ছত্রিশগড়ের ক্যাম্পগুলোতে ছিল এবং ২০,০০০ জন পার্শ্ববর্তী অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল৷
নভেম্বর মাসে, সালওয়া জুদুম ও মাওবাদী সশস্ত্র দলগুলোর মানবাধিকার লঙ্ঘন সম্পর্কিত রিপোর্টগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য মাস-ব্যাপী তদন্ত শেষে ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস কমিশন, এনএইচআরসি) তার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়৷ এনএইচআরসি দেখতে পেয়েছে যে উভয় পক্ষই নিপীড়নের জন্য দায়ী ছিল৷ মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই প্রতিবেদনের সমালোচনা করেছে, তারা বলেছে যে এনএইচআরসি সালওয়া জুদুম কর্তৃক সংঘটিত নিপীড়নের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে৷
উড়িষ্যা ও ঝাড়খন্ডে মাওবাদী সশস্ত্র দলগুলো এবং পুলিশের মধ্যে সহিংসতা বৃদ্ধি পায়৷
• ১৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে, ৫০০ এরও বেশি সশস্ত্র মাওবাদী উড়িষ্যার নয়াগড় জেলার পুলিশ অস্ত্রাগারে হামলা চালায়, ১৬ জন পুলিশকে হত্যা করে৷ এই হামলার পর একটি চিরুনি অভিযানের মাধ্যমে, উড়িষ্যা পুলিশ নিকটবর্তী জঙ্গলে ২০ জন ব্যক্তিকে গুলি কর হত্যা করে, এবং তাদেরকে মাওবাদী ও তাদের সমর্থক বলে দাবি করে৷
উড়িষ্যা ও ঝাড়খন্ড রাজ্যে যে সব মানবাধিকার রক্ষাকর্মী সংঘাতে জড়িত পক্ষগুলোর নিপীড়নকে প্রকাশ করেছিল তারা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের হয়রানির ঝুঁকিতে রয়ে গেছে৷
• ড. বিনায়ক সেন, যিনি আদিবাসী ও চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের অধিকারের জন্য কাজ করেছিলেন এবং সালওয়া জুদুমের সমালোচনাকারী ছিলেন, ছত্রিশগড় কারাগারে আটক ছিলেন এবং তার বিচার চলছিল৷ মাওবাদীদেরকে সাহায্য করার অভিযোগে ২০০৭ সালের মে মাসে তাকে কারারুদ্ধ করা হয়৷ মানবাধিকার সংগঠনগুলো ন্যায়বিচার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে৷
নিরাপত্তা ও মানবাধিকার
নভেম্বর মাসে মুম্বাইয়ে হামলার প্রতিক্রিয়ায় কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা আইন কঠোর করে এবং একটি কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা গঠন করে৷ সংশোধিত আইনে “সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড” ও সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সদস্যপদ সম্পর্কে ব্যাপক ও বিস্তৃত সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং সন্ত্রাসবাদের জন্য সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার আগে তাদেরকে আটক রাখার ন্যূনতম ও সর্বোচ্চ মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়৷
সারা বছরজুড়ে অনেকগুলো রাজ্যে বোমা-হামলার সাথে সংযোগ থাকার সন্দেহে অভিযোগ আনা ছাড়াই ৭০ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে এক সপ্তাহ থেকে দুই মাস মেয়াদী সময়ের জন্য আটক রাখা হয়৷ সন্দেহভাজনদের ওপর নির্যাতন ও অন্যান্য নিপীড়নের খবর পেয়ে মুসলিম ও হিন্দু উভয় ধরনের সংগঠন প্রতিবাদ করে৷
• নভেম্বর মাসে, অন্ধ্রপ্রদেশ কর্তৃপক্ষ ২১ জন মুসলমানের জন্য নগদ ক্ষতিপূরণের ঘোষণা দেয় যাদেরকে গত বছরের অগাস্টে হায়দ্রাবাদের অনেক জায়গায় বোমা বিস্ফোরণের সময় কোনো অভিযোগ ছাড়াই পাঁচ থেকে দশ দিনের জন্য আটক রাখা হয় এবং নির্যাতন করা হয়৷ তাদের নির্যাতনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারী বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়নি৷
• ২০০৭-এর ডিসেম্বর মাসে বোমা-হামলায় মনিপুরে সাতজন ব্যক্তি নিহত হওয়ার পর জানুয়ারিতে, আবুজাম শিদামকে, একজন কলেজ শিক্ষক এবং বিরোধী মনিপুর পিপলস্ পার্টির সদস্য, গ্রেপ্তার করা হয় এবং পুলিশ হেফাজতে চার দিন ধরে নির্যাতন করা হয়৷ তার নির্যাতনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি৷
অব্যাহত প্রতিবাদ সত্ত্বেও, সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৫৮ বাতিল করতে কর্তৃপক্ষ অস্বীকৃতি জানিয়েছে৷ বিচারবহির্ভুতভাবে, সংক্ষিপ্ত বিচারের মাধ্যমে বা অযৌক্তিকভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা সম্পর্কিত জাতিসংঘের বিশেষ তদন্তকারীরা বলেছেন যে এই আইনটি বিচারবহির্ভুত হত্যাকাণ্ডকে সহজতর করতে পারে, কারণ এটি নিরাপত্তা বাহিনীকে এমন পরিস্থিতিতে হত্যা করার উদ্দেশ্যে গুলি করার ক্ষমতা দিতে পারে যখন তারা সত্যিকারভাবে আসন্ন বিপদের সম্মুখীন নয়৷
গুজরাট, রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশ সেইসব রাজ্যের তালিকায় যোগ দিয়েছে যারা সংগঠিত অপরাধমূলক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা আইন পাস করেছে৷ এই আইনটি ছয় মাস থেকে এক বছর মেয়াদের জন্য কোনো অভিযোগ ছাড়াই আটক রাখার ক্ষমতা প্রদান করে৷ উত্তরপ্রদেশ অনুরূপ একটি আইন প্রত্যাহার করেছে৷
জম্মু ও কাশ্মীর
জুন ও অগাস্টের মধ্যে, কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী কমপক্ষে ৪০ জন ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করে যারা কারফিউয়ের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেছিল৷ অমরনাথ মন্দির বোর্ডের অনুকূলে বনের জমি হস্তান্তরের একটি প্রস্তাব নিয়ে বিক্ষোভ ও পাল্টা-বিক্ষোভ চলাকালে এই কারফিউ জারি করা হয়৷
১৯৮৯ সাল থেকে কাশ্মীরে সশস্ত্র সংঘাত চলার সময় হাজার হাজার ব্যক্তির বলপূর্বক অন্তর্ধানের ঘটনাগুলো সহ অতীতের অপরাধের জন্য দায়মুক্তি অব্যাহত ছিল৷
দায়মুক্তি
দায়মুক্তি ব্যাপকভাবে অব্যাহত রয়েছে৷
গুজরাট
২০০২ সালের সহিংসতার জন্য, যখন হাজার হাজার মুসলমানকে আক্রমণ করা হয় এবং ২,০০০-এরও বেশি মুসলমানকে হত্যা করা হয়, দায়ী ব্যক্তিরা এখনো বিচার এড়িয়ে চলছে৷ যৌন লাঞ্ছনার একটি ঘটনায় ১২ জন ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করার মাধ্যমে মুম্বাই হাই কোর্ট দায়বদ্ধতার লক্ষ্যে সামান্য অগ্রগতি করেছে৷
পাঞ্জাব
১৯৮৪ থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী অনেক পুলিশ কর্মকর্তাকে বিচারের সম্মুখীন করা হয়নি৷ ২,০৯৭ জন ব্যক্তিকে বেআইনীভাবে হত্যা করার পর পুলিশ তাদেরকে পুড়িয়ে ফেলার অভিযোগ সম্পর্কে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা ব্যুরোর তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য এখনো সম্পূর্ণভাবে জনগণের কাছে প্রকাশ করা হয়নি৷
আসাম
২০০৭ সালে প্রকাশিত তদন্ত কমিশনের প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি, যাতে দেখা গেছে যে ১৯৯৮ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে ৩৫ জন ব্যক্তির বেআইনি হত্যাকাণ্ড একজন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও প্রাদেশিক পুলিশের নির্দেশে সংঘটিত হয়েছিল৷
মৃত্যুদণ্ড
কতজন ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে এবং কতজন ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রাপ্ত বন্দীদের কারাকক্ষে রয়েছে তার সংখ্যা প্রকাশ করতে কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে৷ তবে, জানামতে এই বছর কোনো ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি৷ যদিও সরকার দাবি করেছে যে শুধুমাত্র “বিরল ধরনের মামলায়” মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে, আদালতগুলো কমপক্ষে ৭০ জন ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছে৷ এনএইচআরসি মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার সম্পর্কে একটি গবেষণা শুরু করেছে৷
ডিসেম্বর মাসে, বিশ্বব্যাপী মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করার জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের একটি প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভারত ভোট দেয়৷
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের পরিদর্শন/প্রতিবেদন
• মে, জুলাই-অগাস্ট ও ডিসেম্বর মাসে এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধিরা ভারত সফর করে এবং সরকারি কর্মকর্তা ও নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোর সাথে সাক্ষাত করে৷
• ভারতঃ পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন সিপিআই(এম)-এর সমর্থকদের দ্বারা নন্দীগ্রাম “পুনরায় দখল” করার সময় মানবাধিকার লঙ্ঘন সম্পর্কে উদ্বেগ (ASA 20/001/2008)
• ভারতঃ প্রাণঘাতী লটারি - ভারতে মৃত্যুদণ্ডঃ ১৯৫০-২০০৬ এর মধ্যে মৃত্যুদণ্ডের মামলাগুলোতে সুপ্রীম কোর্টের রায় সম্পর্কিত একটি গবেষণা (ASA 20/007/2008)
• ভারতঃ ছত্রিশগড়ে মানবাধিকার রক্ষাকর্মী ড. বিনায়ক সেনের সুবিচার সম্পর্কে গুরুতর উদ্বেগ (ASA 20/013/2008)
• ভারতঃ উড়িষ্যায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলো জোরপূর্বক গণ উচ্ছেদের ঝুঁকিতে (ASA 20/017/2008)
• ভারতঃ সরকার তার প্রতিশ্রুতিকে কাজের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করতে হবে এবং উড়িষ্যায় খ্রিস্টান সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধ করতে হবে (ASA 20/021/2008)
• ভারতঃ জম্মু ও কাশ্মীরে নির্বাচনের সময় সংযমের সাথে কাজ করতে হবে (ASA 20/028/2008)
• ভারতঃ ভারতে নতুন মাত্রায় সহিংসতা, চরম সন্ত্রাসী হামলা (ASA 20/030/2008)
• ভারতঃ নতুন সন্ত্রাস-বিরোধী আইনগুলো অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডসমূহ পূরণ করতে হবে (ASA 20/031/2008)
• ভারতঃ জম্মু ও কাশ্মীরে দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ প্রত্যাহার করুন, ১৩ অগাস্ট ২০০৮