অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল প্রতিবেদন ২০০৯: আঞ্চলিক পর্যালোচনা-এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল

গত ২০ মে ইয়াঙ্গুনের নিকটবর্তী শহর কহমুতে ঘূর্ণিঝড় নার্গিস থেকে বেঁচে যাওয়া ভয়ভাবনাহীন ও সাহায্য পাওয়ার আশায় মরিয়া হয়ে উঠা মানুষগুলো যখন বাড়ি ছেড়ে রাস্তায় বের হয়ে আসতে লাগলো তখন মায়ানমার কর্তৃপক্ষ তাদের বাঁধা দিলো, এমনকি তাদেরকে যারা সহায়তা করার চেষ্টা করছিলো তাদেরকেও শাস্তি দেয়া হয়। এভাবেই সব কিছু হারানো মানুষদের অনানুষ্ঠানিক সহায়তা পাওয়ার পথগুলোও মায়ানমার কর্তৃপক্ষ কার্যকরভাবে বন্ধ করে দেয়। এই ঘটনার তিন সপ্তাহ আগে ঘূর্ণিঝড় নার্গিস মায়ানমারের দক্ষিণাঞ্চলে আঘাত হেনে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষের জীবন কেড়ে নেয় এবং কয়েক লাখ মানুষকে বাস্তুহারা করে ও তাদের জীবনজীবিকার পথ রুদ্ধ করে দেয়।

সরকারের দমনমূলক নীতি একটি জনগোষ্ঠীকে কতোটা দরিদ্র ও নিঃস্ব করে তুলতে পারে সেটা নিয়ে যদি কোনো সন্দেহ থেকেও থাকে ঘূর্ণিঝড় নার্গিস সেই সন্দেহের অবসান ঘটিয়েছে। বিশ্বের মানুষ ভয়ার্ত চোখে দেখেছে মায়ানমারের সরকার তথা দি স্টেট পিস এন্ড ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিল (এসপিডিসি) দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি অস্বীকার করেছে এবং ঘূর্ণিঝড় থেকে প্রাণে বেঁচে যাওয়া প্রায় ২৪ লাখ মানুষকে খুব অল্প পরিমাণে সাহায্য করেছে। তিন সপ্তাহ পর্যন্ত এসপিডিসি আন্তর্জাতিক সহায়তাও প্রত্যাখান করেছে এবং আয়েয়ারওয়াদি ডেলটাতে প্রবেশ বন্ধ রেখেছে। অথচ ওই সময়েই প্রাণে বেঁচে যাওয়া মানুষদের সবচেয়ে বেশি খাদ্য, আশ্রয় ও ওষুধের দরকার ছিলো। ঘূর্ণিঝড়ের এক সপ্তাহ পরে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরা যখন বেঁচে থাকার লড়াই করছে তখন তাদেরকে সাহায্য করার পরিবর্তে  এসপিডিসি ত্রুটিযুক্ত একটি নতুন সংবিধান অনুমোদনের লক্ষ্যে দেশে গণভোট আয়োজনের জন্যে রাষ্ট্রের মূল্যবান অর্থ ও সম্পদ নিয়োজিত করেছিলো। এভাবে এসপিডিসি একদিকে জীবনরক্ষাকারী সাহায্য ইচ্ছেকৃতভাবে আটকে দিয়েছে আবার অন্যদিকে তারা নিজেরাও ঘূর্ণিঝড় দুর্গতদের পর্যাপ্ত সহায়তা দিতে পারেনি। ফলে মায়ানমারের হাজার হাজার মানুষের বেঁচে থাকা, খাদ্য ও চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার লংঘিত হয়েছে।

এভাবেই সরকারি নীতিমালার কারণে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে লক্ষ লক্ষ মানুষ দুঃখকষ্টে অবর্ণনীয় জীবনযাপন করছে কিন্তু তারা এর বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারছে না কিংবা ভয়ে সব কিছু মেনে নিচ্ছে। কয়েক কোটি মানুষ খাদ্য, জ্বালানী ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি ও বিশ্বব্যাপী আর্থিক সঙ্কটের কারণে দারিদ্র্যে নিপতিত হচ্ছে। এই সঙ্কটময় মুহুর্তে পরিস্থিতি মোকাবেলায় নিজ দেশের সরকারের কাছ থেকে বেশিরভাগ মানুষ যথাপোযুক্ত সহায়তা পাচ্ছে না।

কিন্তু ঘূর্ণিঝড় নার্গিসকে ঘিরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো এতোটা চরম আকার ধারণ করেছিলো যে, এসোসিয়েশন অফ সাউথ ইস্ট এশিয়ান নেশনস (আসিয়ান)ভুক্ত মায়ানমারের প্রতিবেশী দেশগুলো এমনকি মায়ানমারের প্রধান আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষক চীন পর্যন্ত মায়ানমারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। যদিও অতীতে এই দেশগুলোর সরকারগণ দাবী করেছিলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ‘এশিয়ান মূল্যবোধ’-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক, জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকিস্বরূপ এবং জাতীয় উন্নয়নের পথে অন্তরায়। কিন্তু নার্গিসের মতো বৃহদাকারের দুর্যোগের মুখোমুখি হয়ে আসিয়ান প্রকাশ্যে মায়ানমার কর্তৃপক্ষকে সেদেশে আন্তর্জাতিক সাহায্য প্রবেশের অনুমতি দিতে আহ্বান জানায় এবং এসপিডিসি-র সঙ্গে আন্তর্জাতিক কমিউনিটির সমঝোতার লক্ষ্যে মধ্যস্থতা করে।

আরো লক্ষণীয় যে, এই ঘটনায় সাড়া দিয়ে (এবং বেইজিং অলিম্পিক ২০০৮ আয়োজনের ভাবমূর্তি ধরে রাখতে) চীন সরকার স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করা সংক্রান্ত তাদের দীর্ঘদিনের নীতি থেকে সরে আসে এবং আন্তর্জাতিক সাহায্য গ্রহণে এসপিডিসিকে রাজী করানোর লক্ষ্যে প্রভাব বিস্তার করে।

বেইজিং অলিম্পিক ও দেশের ভাবমূর্তির প্রতি চীনা কর্তৃপক্ষের সংবেদনশীলতা চীনের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতির সত্যিকারের ও টেকসই উন্নয়নের ব্যাপারে সবাইকে আশাবাদী করে তোলে। সত্যি বলতে কী, মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে এমন আশাবাদকে সামনে রেখেই আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি বেইজিংকে অলিম্পিক গেমস ‍আয়োজনের অনুমতি দেয়। কিন্তু বাস্তবে চীনে মানবাধিকার রক্ষাকারী, ধর্মপালনকারী, সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠী, আইনজীবি ও সাংবাদিকদের উপর দমনমূলক নির্যাতন দেশ জুড়ে বেড়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষ বেইজিংয়ের হাজার হাজার নাগরিককে তাদের বাড়ি থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করেছে এবং যারা সরকারী পদক্ষেপকে চ্যালেঞ্জ করার সাহস দেখিয়েছে তাদের উপর নির্যাতনের খড়গ নেমে এসেছে।

এমনিতে অলিম্পিক গেমস আয়োজন ও এর চমৎকারিত্ব ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। বিপুল সম্পদের সমাবেশ ঘটিয়ে সফল গেমস আয়োজনের মাধ্যমে চীন সরকার তাদের ইচ্ছার অনুরূপ সামর্থ্যের প্রকাশ ঘটিয়েছে এবং প্রমাণ করেছে চীন বিশ্বের অন্যতম নেতৃস্থানীয় শক্তি। তবে এই গেমস আরো একটি বিষয়ের প্রতি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তাহলো যে দেশটি এতো বড় জাকজমকপূর্ণ আয়োজনের সামর্থ্য রাখে সেই দেশটি নিজ দেশের মানুষের মানবাধিকার পূরণে ব্যর্থতার কোনো যুক্তিসঙ্গত জবাব দিতে পারে না। বিশেষ করে চীনের কয়েক কোটি মানুষ দেশের বিষ্ময়কর অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভাগ পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত।

বঞ্চনা
অনেক বছর ধরে চীন সরকার দেশের কমবেশি ১৫ কোটি মাইগ্রেন্ট শ্রমিকের উপর ভিত্তি করে দেশের আর্থিক নীতিমালা সাজিয়েছে। এই মানুষগুলোর বেশিরভাগ দেশের গ্রাম এলাকা থেকে ক্রমবর্ধিষ্ণু শহরগুলোর বস্তিতে আবাস গড়ে তুলেছে। কিন্তু অলিম্পিকসের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নির্মাণশিল্পভিত্তিক উন্নয়ন কর্মকান্ড শেষ হওয়া ‌এবং বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সঙ্কটের প্রভাবে কয়েক কোটি মাইগ্রেন্ট শ্রমিক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি হয়ে পড়ে ও তারা অব্যাহত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অঙ্গীকার ছাড়াই গ্রামে ফিরে যায়। মাইগ্রেন্ট শ্রমিক হিসেবে শহরে বসবাসের কারণে তারা চীনের ক্রমবর্ধমান স্বচ্ছল শহুরে মধ্যবিত্তের সঙ্গে তাদের জীবনযাপনের কতোটা ভিন্নতা সেটি ইতোমধ্যে জেনেছে। এভাবে সমাজের ধনী ও গরিবের মধ্যে এবং শহর ও গ্রামের মধ্যেকার বৈষম্য সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি হওয়ায় পুরো দেশজুড়ে এক ধরনের সামাজিক উত্তেজনা/অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যা চীন জুড়ে হাজার হাজার মানুষকে বিক্ষোভ প্রদর্শনে উদ্বুদ্ধ করছে।

এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বিশ্বের কয়েকটি ধনী রাষ্ট্র (অস্ট্রেলিয়া, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া)-এর অবস্থান। আর এদের পাশেই রয়েছে বিশ্বের বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্রতম জনগোষ্ঠী (আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, লাওস, মায়ানমার, উত্তর কোরিয়া, পাপুয়া নিউগিনি)। পুরো ২০০৮ সাল জুড়ে এই মানুষগুলোর কল্যাণের বিষয়টি প্রাকৃতিক সম্পদের বণ্টনের চেয়ে সরকারের নীতিমালার সঙ্গে বেশি সংশ্লিষ্ট বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

এশিয়ার আরেক বিকাশমান অর্থনীতি ভারত তাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টার মধ্যেও নিজ দেশের অভ্যন্তরে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারগুলোর প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার বজায় রেখে চলেছে।  তবে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ শহরের দরিদ্র মানুষ ও গ্রাম এলাকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করতে পারছে না। গ্রামের প্রান্তিক মানুষের মধ্যে ভূমিহীন কৃষক ও আদিবাসীরাও রয়েছেন। এই মানুষেরা শিল্প প্রকল্পের নামে ‍ভূমি ও অপরাপর সম্পদের অপব্যবহার ও শোষনের সরকারি সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করছে। ভারতের কয়েকটি রাজ্যে কর্তৃপক্ষ ভূমির সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংবিধানের বর্তমান ধারাগুলো উপেক্ষা করছে। যেখানে কিছু এলাকা সম্পূর্ণরূপে আদিবাসীদের জন্যে নির্ধারিত রাখার কথা সেগুলোও তারা খনি খনন ও অন্যান্য শিল্পের জন্যে বরাদ্দ দিচ্ছে। ভারতের দরিদ্রতম রাজ্য উড়িষ্যার সীমিত সম্পদ নিয়ে যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে তাতে পুরো ব্যাপারটি রাজনৈতিক সংগ্রাম, আদিবাসীদের অধিকার, ধর্মের স্বাধীনতা এবং সরকারের উন্নয়ন নীতিমালার সঙ্গে তালগোল পাকিয়ে গেছে। এই সূত্রেই চলমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছে যার ফলে ইতোমধ্যে ২৫ জন মারা গিয়েছে এবং আরো অন্তত ১৫ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এদের বেশিরভাগ খৃষ্টান ধর্মাবলম্বি। হাজার হাজার মানুষ স্বাস্থ্য যত্ন, শিক্ষা ও বসবাসের পর্যাপ্ত সুযোগ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের আদিবাসী সমাজও সরকারি নীতির কারণে ভোগান্তি পোহাচ্ছে। সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গে প্রবীণ ও অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যেকার রাজনৈতিক সংগ্রামের চিত্র যখন সংবাদ বা খবরের শিরোণাম দখল করে আছে, সেসময়ে নেপথ্যে পাবর্ত্য চট্টগ্রামের জুম চাষী আদিবাসীদের জমি দখল করতে বাঙালি বসতি স্থাপনকারীদের সরকার অব্যাহতভাবে সমর্থন ও সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।

গত অক্টোবরে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক সতর্ক করে দেয় যে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সঙ্কটের কারণে খাদ্য, জ্বালানী ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বৃদ্ধির কারণে ২০ লাখ কম্বোডিয়ান দারিদ্র্যের মধ্যে পতিত হতে পারে। এই সংখ্যাটি দেশটিতে ইতোমধ্যে দারিদ্র্যে বাসবাসকারী ৪৫ লাখ মানুষের অতিরিক্ত। চার  হাজারেরও বেশি নম পেন পরিবার বোয়েংকাক লেকের চারপাশে বসতি গড়ে তুলেছে। তাদের বেশিরভাগ সেখানে কোনোমতে ঘর তুলে বসবাস করছে। লেকটিকে ময়লা-আবর্জনা ফেলার জায়গা হিসেবে চিহ্নিত করায় এখন তাদেরকে এই বসতি ছেড়ে চলে যেতে হবে। অথচ তাদেরকে আগেভাগে কিছুই বলা হয়নি। মাটিভর্তি করার কাজ ২৬ আগস্ট ২০০৮ এ শুরু করলে তারা প্রতিবাদ করে। প্রতিবাদকারীরা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও কোম্পানির শ্রমিকদের কাছ থেকে ব্যাপকভাবে হুমকির সম্মুখীন হন। এরিমধ্যে, নমপেনের পুলিশ লেকের পাড়ে রাতের বেলা টহল জোরদার করে এবং দারিদ্র ও প্রান্তিক সমাজের লোকজনের ঘরে তল্লাশি চালাতে শুরু করে এবং বাছবিচারহীনভাবে যৌনকর্মী, গৃহহারা মানুষ ও ভিক্ষুকদের গ্রেফতার করে।

উত্তর কোরিয়াতে লাখ লাখ মানুষ এতো বেশি পরিমাণে দুর্ভিক্ষের শিকার হচ্ছে যা গত এক দশকে দেখা যায়নি। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে আছে নারী, শিশু ও বয়স্ক মানুষেরা। হাজার হাজার মানুষ সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চীনে যাচ্ছে মূলত খাদ্য ও অর্থনৈতিক কারণে। এসময়ে সীমান্তে আটককৃত ব্যক্তিদের জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো হচ্ছে তাদেরকে বন্দীশালায় জোরপূর্বক শ্রম, নির্যাতন ও অন্যান্য ধরনের দুর্ব্যবহারের শিকার হতে হচ্ছে। উত্তর কোরিয়ার সরকার এই পরিস্থিতির উন্নয়নে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এমনকি বিগত বছরগুলোতে দেশটির চাল ও সারের সবচেয়ে বড় দাতা দেশ দক্ষিণ কোরিয়া থেকেও কোনো ধরনের সহায়তা পাওয়ার অনুরোধ করছে না শুধুমাত্র সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে।

নিরাপত্তাহীনতা
এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কোনো দেশ ২০০৮ সালে একে অন্যের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে লিপ্ত হয়নি। তবে সরকারের সঙ্গে সশস্ত্র বিরোধী দলগুলোর সংঘাতের  কারণে পুরো এশিয়া জুড়ে হাজার হাজার মানুষের জীবন হুমকির সম্মুখীন হয়েছে এবং লাখ লাখ মানুষের স্বাস্থ্যযত্ন, শিক্ষা, আবাসন ও খাদ্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এই ধরনের সংঘাত কিছুটা হলেও জাতিগত কারণে ঘটেছে। একদল মানুষ অন্যদলের সমান সুবিধার দাবীতে কিংবা সম্পদের বড় অংশের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছে।

সংঘাতের কারণ নির্বিশেষে এই ধরনের সংঘাতে বেসামরিক নাগরিকগণ বিশেষ করে জেন্ডার, জাতিগত কারণ, ধর্ম ও সামাজিকভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সংঘাতের কারণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

আফগানিস্তান, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, মায়ানমার, দক্ষিণ থাইল্যান্ড এবং ফিলিপিন্সের দক্ষিণাঞ্চলের বাসিন্দারা সরকারি ও সরকার-বিরোধী সশস্ত্র বাহিনীর হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। এই ধরনের সংঘাতে  প্রায়শ সশস্ত্র সংঘাতের মৌলিক আইনগুলো পর্যন্ত লংঘিত হচ্ছে।

আফগানিস্তানের দক্ষিণ ও পুর্বাঞ্চলে বসবাসকারী লাখ লাখ মানুষ তালেবান ও অন্যান্য বিদ্রোহী গ্রুপ ও সরকারের মিত্র হিসেবে পরিচিত স্থানীয় মিলিশিয়াদের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে ভীত সন্ত্রস্ত জীবনযাপন করছে। তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে ও এই ধরনের পরিস্থিতি তাদের খাদ্য, স্বাস্থ্যযত্ন ও স্কুলে যাতায়াতের সীমিত পরিসরকে আরো বেশি সংকুচিত করেছে। বিশেষ করে নারী ও মেয়েদের জন্যে পরিস্থিতি বিশেষভাবে নাজুক হয়ে পড়েছে। এই বছর আফগানিস্তানে আরেকটি রক্তাক্ত সংঘাত ঘটেছে। সেই ঘটনায় প্রায় ১৪০০ বেসামরিক নাগরিক মৃত্যুবরণ করেছে। জীবন বাঁচাতে আরো সহস্রাধিক মানুষ বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে, অনেকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ও সমৃদ্ধ শহর যেমন কাবুল ও হেরাতে ছুটে গিয়েছে, সেখানে তারা গাদাগাদি করে থাকার জন্যে নতুন বস্তি গড়ে তুলেছে। তালেবান ও অন্যান্য সরকার বিরোধী গ্রুপগুলো বেসামরিক নাগরিকদের জখমের জন্যে মূলত দায়ী। তবে আফগানিস্তানে অবস্থানকারী প্রায় ৬০ হাজার আন্তর্জাতিক সৈন্যের অব্যাহত আকাশ হামলা ও রাতের হামলায়ও বেসামরিক নাগরিক ও তাদের সম্পদের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে, যার ফলে জনগণের মধ্যে তীব্র জনরোষ তৈরি করছে।

আফগান সরকার দেশে আইনের শাসন বজায় রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে, এমনকি তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলোতে বসবাসকারী লাখ লাখ আফগান নাগরিককে তারা মৌলিক সেবাগুলো পর্যন্ত দিতে পারছে না। তালেবান ও সরকার বিরোধী অন্য শক্তিগুলো দেশের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি জায়গা তাদের দখলে রেখেছে। সেখানে তারাই শাসন করছে। তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে মেয়েশিশুদের শিক্ষা গ্রহণ ও স্বাস্থ্যযত্ন পাওয়া থেকে দূরে রাখা হচ্ছে এবং তারা তাদের নিজস্ব নিষ্ঠুর ধরনের বিচার কায়েম করেছে। এই সূত্রে প্রায়শ জনসম্মুখে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়া হচ্ছে এবং চাবুক মারা হচ্ছে। দেশটিতে বিদ্যালয়ে শিশু ভর্তির হার ও মৌলিক স্বাস্থ্যযত্নের উন্নতি কিছুট উন্নতি ঘটলেও বেশিরভাগ আফগান নাগরিক দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে স্বল্পায়‍ু হচ্ছে। দেশটিতে প্রত্যাশিত গড় আয়ু মাত্র ৪২.৯ বছর। বিশ্বের সর্বাধিক মাতৃমৃত্যুর ঘটনা ঘটে আফগানিস্তানে এবং মাথাপিছু গড় আয় বছরে মাত্র ৩৫০ আমেরিকান ডলার, যা বিশ্বের মধ্যে নিম্নতম দেশগুলোর একটি।

আফগানিস্তানের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি দেশটির সীমানা ছাড়িয়ে পাকিস্তানের কিছুটা অংশে ছড়িয়ে পড়েছে। এটি যে শুধুমাত্র পাকিস্তানের উপজাতি অধ্যুষিত এলাকাতে সীমিত, তা নয়। এটি এখন দেশের অন্যান্য অংশেও ছড়িয়ে পড়েছে। পাকিস্তানে বসবাসরত পাকিস্তানী তালেবান সদস্যরা এখন বেসামরিক নাগরিকদের জিম্মি করছে, তাদেরকে টার্গেট করে হত্যা করছে এবং নারী ও মেয়ে শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতামূলক আচরণ করছে। বছর শেষে পাকিস্তানী তালেবান গ্রুপগুলো ফ্রন্টিয়ার উপজাতি এলাকাগুলোর বড় অংশে এবং উপজাতিদের এলাকার বাইরের বসতি এলাকা ও ইসলামাবাদ থেকে সহজ দূরত্বের সোয়াত উপত্যকায় তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। তালেবানরা ইতোমধ্যে কয়েক ডজন মেয়েদের স্কুল, স্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং যথেষ্ট ধর্মীয় নয় এমন প্রতিষ্ঠান যেমন গানের ক্যাসেটের দোকান ইত্যাদি বন্ধ করে দিয়েছে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে পাকিস্তানের উপজাতি অঞ্চলে বসবাসরত মানুষজন, বিশেষ করে নারী ও শিশুরা পাকিস্তানের অন্যান্য অংশের মানুষদের তুলনায় কম দিন বাঁচে। তাদের মধ্যে শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার বেশি এবং শিক্ষার হার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কম।

একটি নবনির্বাচিত বেসামরিক সরকার পাকিস্তানের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। তারা ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নের লক্ষ্যে অনেক ধরনের প্রতিশ্রুতি ও প্রতিজ্ঞা করেছে।  প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারির সরকার তাদের প্রতিশ্রুত বিষয়গুলোর কিছু কিছু পূরণ করেছে, কিন্তু পূর্ববর্তী জেনারেল পারভেজ মোশাররফের সামরিক সরকারের মতোই তাদের দুর্ভাগ্য যে দেশের ক্রমবর্ধমান ‍নিরাপত্তাহীনতার সঙ্কট মোকাবেলায় তারা কার্যকর কোনো কিছু করতে পারছে না। বছর শেষে সেই পুরনো দুর্ভাগ্যমূলক দোদুল্যমানতার পুনরাবৃত্তি ঘটলো। পাকিস্তানের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের নাগরিকদের নৃশংস বিদ্রোহী গ্রুপগুলোর শাসনে পরিত্যক্ত অবস্থায় রেখে দেয়া কিংবা এমন একটি নীতি অনুসরণ করা যার অধীনে সরকার বিরোধী গ্রুপগুলোর যুদ্ধ করার সামর্থ্যকে নিঃশেষ না করে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে শাস্তি দেয়ার মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নেয়া।

পুরো এশিয়া জুড়ে বেসামরিক নাগরিকদের ভালো ও মন্দ থাকার ধরণটি সরকারপন্থী ও সরকারবিরোধী এই দুই অংশে বিভক্ত করা হয়েছে। থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে গত প্রায় এক শতক ধরে থেমে থেমে সংঘাত অব্যাহত আছে, যা এই অঞ্চলের নাগরিকদের দীর্ঘস্থায়ীভাবে তাদের অধিকার হরণ কর‍া হয়েছে। যারা জাতিগত ও ভাষায় মালয় এবং ধর্মীয়ভাবে মুসলমান। এই এলাকাটি থাইল্যান্ডের সবচেয়ে দরিদ্রতম ও অনুন্নত অংশ। থাইল্যান্ডের কেন্দ্রীয় বুড্ডিষ্ট সরকার ও বেশিরভাগ জনগণ তাদেরকে আত্তীকরণের চেষ্টা করেছে। বিদ্রোহী গ্রুপগুলো বারবার নৃশংস কৌশল বেছে নিয়েছে, যেমন তারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী জনগণকে টার্গেট করেছে, তারা তাদের শিরোচ্ছেদ করে কিংবা স্কুলগুলোতে হামলা চালায়। এই অবস্থায় সন্দেহভাজন মুসলমানদের উপর নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারসহ সরকারের অদক্ষতামূলক নিরাপত্তা ব্যবস্থা মানবাধিকার লংঘনের ব্যাপকতা বাড়িয়েছে এবং এলাকার মানুষকে বিচ্ছিন্নতাবোধের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

যেকোনো কারণেই হোক ঠিক একই ধরনের ঘটনা দেখা যায় ফিলিপিন্সের দক্ষিণাঞ্চলের শহর মিন্দানাওয়ে। সেখানকার মুসলমান জনগোষ্ঠী দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ খৃষ্টান জনগোষ্ঠী ও নেতৃত্ব থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন ভাবে, তাদের এলাকায় উল্লেখযোগ্যভাবে নিম্নমাত্রার অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটছে। ফিলিপাইন সরকার ও মোরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্ট (এমআইএলএফ) এর মধ্যেকার শান্তি আলোচনার ব্যর্থতা গত আগস্টে পুনরায় দেশটিতে সহিংসতার সূচনা ঘটিয়েছে যার সূত্র ধরে উভয় পক্ষে নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। সাম্প্রতিক এই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত বেসামরিক নাগরিকের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। এর শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বেসামরিক নাগরিকদের উপর এমআইএলএফ এর আক্রমণের ঘটনা বেড়েছে। তারা মূলত খৃষ্টানদের উপর এবং কখনো কখনো খৃষ্টান ও মুসলিম উভয় জনগোষ্ঠীর উপর ২০০৮ সালের আগস্টে হামলা চালায়। এই ঘটনায় প্রায় ৬ লাখ ১০ হাজার মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায়। এদিকে এমআইএলএফ এর সরাসরি আক্রমণ ছাড়াও তাদের সঙ্গে সরকারি নিরাপত্তা বাহিনীর যুদ্ধে বেসামরিক নাগরিকগণ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পরবর্তীতে ফিলিপাইনের সামরিক বাহিনী তাদের গ্রামগুলোকে নিরাপদ ঘোষণা করার পর প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার মানুষ তাদের বসতবাড়িতে ফেরত এসেছে। তবে তারা অনেকেই বাড়ি ফিরে এসে যেভাবে বাড়ি রেখে গিয়েছিলো সেভাবে আর ফেরত পাইনি। তাদের অনেকেরই ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে, গৃহপালিত পশু চুরি হয়েছে এবং তারা এখন ভয়ে ভয়ে বাস করছে।

মায়ানমারে সরকারের নীতির কারণে পুরো দেশটির জনগণ এখন কপদর্কশূণ্য হয়ে পড়েছে। এসপিডিসি দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্বকারী ১৩৫টি জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু গ্রুপগুলোর জন্যে বিশেষ ধরনের বিদ্বেষপূর্ণ শাসন ব্যবস্থা চালু করেছে। মায়ানমারের সামরিক বাহিনী দেশটির কায়েন (কারেন) প্রদেশ ও বাগো (পেগু) বিভাগের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক ভূমিকা বহাল রেখেছে। ২০০৫ সালের নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া বর্তমান সরকারের আক্রমণাত্মক ভূমিকার কারণে ১৪০ হাজারেরও বেশি বেসামরিক কারেনবাসী খুন, নির্যাতন জোরপূর্বক বাস্তুভিটাচ্যুত হওয়া, যৌন নির্যাতন, জোরপূর্বক কাজে নিয়োগ করার মতো ঘটনার শিকার হয়েছে। জোরপূর্বক কাজের মধ্যে সামরিক অনুশীলনের মতো মারাত্মক ধরনের বিষয়াদিও রয়েছে। যেমন, ভূমিমাইন সরানো, এবং ব্যাপকভাবে ও নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তাদের মানবাধিকার লংঘিত হয়েছে। এসবই মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।

২০০৮ সালের আরেকটি ‘ভুলে যাওয়া সংঘর্ষ’ হলো শ্রীলংকান সরকারের সঙ্গে লিবারেশন টাইগার্স অফ তামিল এলম (এলটিটিই) এর মধ্যেকার সংঘাত। দ্বীপ দেশটির বৃহত্তম তামিল জনগণ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে, তারা শাসক সিংহলি সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে তাদের দ্বারা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। সংঘাতে এলটিটিই নানা ধরনের নিষ্ঠুর কৌশল ব্যবহার করছে, যেমন বেসামরিক নাগরিকদের উপর বোমা আক্রমণ করা এবং শিশুদের জোরপূর্বক সৈন্যপদে নিয়োগ দেয়া। এসব কিছুরই উদ্দেশ্য হলো প্রায় এক দশক আগে শুরু হওয়া দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে একটি স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু এই অঞ্চলটি তামিল জনগণের জন্যে তেমন কোনো স্বর্গ হিসেবে প্রমাণিত হয়নি। ২০০৮ সাল শেষ হয়ে আসতে আসতে শ্রীলংকার সরকার এই স্থানে তাদের একাধিক সামরিক বিজয় দাবী করে। উত্তরাঞ্চলের ওয়ানি থেকে প্রায় সকল তালিম জনগোষ্ঠী নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে। এখানকার বাসিন্দাদের সকলে না হলেও অনেকেই ইতোমধ্যে একাধিকবার যুদ্ধের কারণে তাদের বসতবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে। গত বছরও একই ঘটনা হয়েছে। এবং এদের কেউ কেউ ২০০৪ সালে ভারতীয় মহাসাগরে সৃষ্ট হওয়া সুনামীর ভয়াবহতা থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষ।

শ্রীলংকান সরকার আন্তর্জাতিক ত্রাণকর্মীদের এবং সাংবাদিকদের সংঘাতপূর্ণ এলাকাগুলোতে যেতে দেয়নি ফলে তারা দুই পক্ষের সংঘর্ষে যে দুঃখদুর্দশার সৃষ্টি হয়েছে তা বুঝতে কিংবা প্রয়োজনীয় সহযোগিত‍া করতে পারেনি। অবরুদ্ধ এলটিটিই তাদের দিক থেকে এই জনতাকে জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োগ দেয়া, যোদ্ধা হিসেবে কাজ করানো এবং শ্রীলংকান সৈন্যদের সঙ্গে লড়াই করার সময় এদেরকে এলটিটিই নিজেদের রক্ষাব্যুহ হিসেবে ব্যবহার করে।


বর্জন করা
জাতিগত বৈষম্যের কারণে সশস্ত্র সংঘাতের জন্ম হয়নি এমন দেশেও আদিবাসীদের বর্জন করার মতো ঘটনা ঘটে। এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জন্যে এটি একটি সাধারণ সামাজিক বৈশিষ্ট্য। এই ধরনের বৈশিষ্ট্য ধনী দেশের সমাজ থেকে শুরু করে সবচেয়ে দরিদ্র সমাজেও বিদ্যমান। গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে অস্ট্রেলিয়ার সরকার একটি ঐতিহাসিক ক্ষমা চেয়েছে ‘স্টোলেন প্রজন্ম’-এর কাছে। সেই দেশের সরকারি আইন ও নীতির কারণে আদিবাসী ও টোরেস স্ট্রেইট আইল্যান্ডাফরের লোকজনকে জোরপূর্বক তাদের পরিবার থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছিল, ওই সময়ে তারা শিশু ছিলো। কিন্তু ওই ঘটনায় সরকার তাদের জন্যে কোনো ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা না করে বরং ঘোষণা করেছিলো যে তাদের জন্যে কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠন করা হবে না কিংবা অন্য কোনোভাবেও তাদের ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে না।

বিশ্বের নবীনতম প্রজাতন্ত্র নেপালে সরকার তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণে হিমশিম খাচ্ছে, তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো  কয়েক প্রজন্ম ধরে কষ্ট করছে এমন নেপালীদের জীবনমান উন্নয়নে তারা কাজ করবে। মাওবাদী নিয়ন্ত্রিত সরকার নারী, নিম্নবর্ণ হিন্দু ও দরিদ্রদের অধিকার পূরণে তাদের অঙ্গীকারের কথা বলেছে। যদিও তারা সবচেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বাসিন্দা দেশের বৃহৎ জনসংখ্যার অধিকারী মাধেহসিসের পক্ষ থেকে। তারা মনে করে নতুন সরকার তাদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিচ্ছে না।

চীনের সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীপূর্ণ এলাকা যেমন দেশের পশ্চিমাঞ্চল, তিব্বতীয় জন-অধ্যুষিত এলাকা এবং মুসলিম অধ্যুষিত ঝিনজিয়াং উইগুর স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চল পদ্ধতিগতভাবে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। উভয় এলাকাই ২০০৮ সালে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মন্দ ধরনের অস্থিরতা প্রত্যক্ষ করেছে। মার্চের ১০ তারিখে তিব্বতীয় মঙ্করা প্রতিবাদ করেছে এবং এরপর আরো মঙ্ক প্রতিবাদ করেছে, তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সরকার যেন চাপিয়ে দেয়া রাজনৈতিক শিক্ষার প্রচারণা স্থগিত করে এবং ধর্মীয় অনুশীলনের উপর আরোপিত বিধিনিষেধ শিথিল করে। এই ধরনের প্রতিবাদের সঙ্গে সাধারণ তিব্বতীয়রা যুক্ত হওয়ার পর সংঘাত আরো ব্যাপক আকার ধারণ করে। তারা তাদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করে যেখানে তারা মনে করে তাদেরকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে এবং সরকারি নীতির মাধ্যমে তিব্বতীয় সংস্কৃতি ও জাতিগত পরিচয় দুর্বল করা হচ্ছে। প্রতিবাদকারীদের কেউ কেউ অভিবাসী হান ও তাদের ব্যবসাস্থল লাসাতে হামলা চালায় যদিও বেশিরভাগক্ষেত্রে প্রতিবাদের ঘটনা তীব্বতীয় এলাকায় শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। চীনা কর্তৃপক্ষ জানায় যে, এই ঘটনায় শেষ পর্যন্ত ২১ জন বিক্ষোভকারী মারা গিয়েছে এবং ১০০০ এরও বেশি আটক ব্যক্তিকে মুক্তি দেয়া হয়েছে, এবং প্রবাসী তিব্বতীয় সংস্থাগুলোর মতে ১০০ এরও বেশি তিব্বতীয় হ্ত্যার শিকার হয়েছে ও বছর শেষে কয়েকশ তিব্বতীয় এখনো আটক অব্স্থায় রয়েছে। তবে তাদের সঠিক সংখ্যা নির্ণয় করা কঠিন। কারণ কর্তৃপক্ষ গণমাধ্যম ও সংখ্যালঘু ব্যক্তিদের সেখানে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না।

ঝিনজিয়াং-এ ১৪ আগস্ট ঝিনজিয়াং কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি ওয়াং লিকুয়ান উইগুরর ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ মুসলমানদের বিরুদ্ধে ‘জীবন-মরণ’ সংগ্রামের ডাক দেয়। কর্তৃপক্ষ প্রমাণহীনভাবে দোষী সন্ত্রাসীদের দ্বারা সহিংস ঘটনার কথা উল্লেখ করে তাদের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণকে যুক্তিযুক্ত করার চেষ্টা করছে এবং সেসঙ্গে ধর্ম চর্চার উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা করছে। তারা সকল সরকারি কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের ও তাদের সন্তানদের মসজিদে নামাজ পড়া নিষিদ্ধ করেছে। চীনা কর্তৃপক্ষের দেয়া তথ্য মতে, এই বছর ১৩০০ এরও বেশি লোককে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড, ধর্মীয় উগ্রতা কিংবা দেশের নিরাপত্তা আইনের লংঘনের দায়ে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং ১১৫৪ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়েছে কিংবা তারা বিচার কিংবা প্রশাসনিক শাস্তি পেয়েছে।

কণ্ঠস্বর
বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দেয়ার কারণে পুরো এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মানুষ চাকরি হারাচ্ছে, তাদের খাবার টেবিলে খাদ্যের পরিমাণ কমে যাচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় চাহিদাগুলো পূরণের জন্যে যেমন: বসতবাড়ি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যযত্ন রক্ষায় দরকারি আয়ও কমে গেছে। যেকারণে আগের চেয়ে আরো বেশি মানুষ সরকারের কাছ থেকে জবাবদিহিতা পেতে চাচ্ছে। এই অবস্থায় জনগণের চাহিদার প্রতি সাড়া দেয়ার পরিবর্তে সরকারসমূহ জনগণকে কথা বলার স্বাধীনতা কেড়ে নিতে চাচ্ছে। তাদের কণ্ঠস্বর থামিয়ে দিতে ‍চাচ্ছে। এই প্রবণতা এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অনেক সরকারের মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি সরকারসমূহের দীর্ঘস্থায়ী ও বিরাজমান অসহিষ্ণুতা বাড়িয়ে তুলছে। উত্তর কোরিয়া ও মায়ানমারে মত প্রকাশের স্বাধীনতা অনেক বছর ধরেই কার্যকরভাবে পুরোপুরি নিষিদ্ধ রয়েছে।

অলিম্পিক আয়োজনকালে চীনা কর্তৃপক্ষ অস্থায়ীভাবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছিলো। তারা অভূতপূর্বভাবে বিদেশী সাংবাদিকদের খবর সংগ্রহ ও পরিবেশনের সুযোগ দিয়েছিল এবং তখন তারা ওয়েবসাইটও বন্ধ করেনি, ফলে এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও বিবিসির মতো ওয়েবসাইটও সকলেই দেখতে পেয়েছে। বছর শেষে যদিও, অসন্তোষের বিষয়টি বাড়তে থাকে, চীনা কর্তৃপক্ষ সমালোচনাকারীদের কণ্ঠস্বর রোধ করা ও তাদেরকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের পথ পুনরায় বেছে নেয়। চার্টার ০৮ এ স্বাক্ষরকারী ব্যক্তিদের অনেককে সরকার হয়রানি করে ও তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের পথ বেছে নেয়া হয়। চার্টার ০৮ হলো মৌলিক আইন ও রাজনৈতিক সংস্কারের দলিল। সরকার পুরো বিষয়টিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ শুরু করে ও নজরদারিতে রাখে। একাজের সঙ্গে জড়িত অন্তত একজন স্বাক্ষরকারী লিউ ঝিয়াওবোকে বছর শেষে বিনাবিচারে ইচ্ছেমাফিক আটক করা হয়। ২০০৯ সালের শুরুতে অন্য আরো ‍অনেক ওয়েবসাইটের সঙ্গে চীনে এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ওয়েবসাইটটিও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

একইভাবে, ভিয়েতনাম সরকার সেই দেশের গণতন্ত্রকামী আন্দোলনের মুখপত্র ইন্টারনেটভিত্তিক ওয়েবসাইট ‘ব্লক ৮৪০৬’ এর সমর্থকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। সেসঙ্গে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য কর্মরত অন্যান্য অননুমোদিত গ্রুপগুলোকে বন্ধ করার ব্যবস্থা নেয়। এদের অনেকের বিরুদ্ধে পেনাল কোডের ৮৮ ধারা মোতাবেক অভিযোগ গঠন করা হয়। পেনাল কোডের ৮৮ ধারায় বলা হয়েছে, ‘ভিয়েতনাম সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের প্রচারণা’  কিংবা আইন অপরাধ হিসেবে গণ্য করবে ‘গণতান্ত্রিক স্বাধীনতাকে রাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী কাজে ব্যবহার করলে’।

মত প্রকাশের উপর আক্রমণ শুধুমাত্র সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতেই সীমিত নয়। সিঙ্গাপুর সরকার কুৎসাপূর্ণ রচনা সংক্রান্ত আইনটি সরকারের সমালোচনাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে এর অপপ্রয়োগ করছে। যেমন ফার ইস্টার্ণ ইকনোমিক রিভিউ প্রধানমন্ত্রী লী হিসেং লী বিরুদ্ধে কুৎসা রচনার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছে, অন্যদিকে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এশিয়া গত সেপ্টেম্বরে বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে চ্যালেঞ্জ করার দায়ে আইনী ব্যবস্থার মুখোমুখি হয়েছে। দারিদ্র্য বিরোধী প্রচারণার অংশ হিসেবে রাস্তায় অননুমোদিতভাবে সমবেত হওয়ার অপরাধে প্রায় ১৯ জনকে আইনভঙ্গের অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।

থাইল্যান্ডে লেসে-মেজিস্ট্রি আইনের অধীনে অভিযুক্ত ব্যক্তির সংখ্যা সুস্পষ্টভাবে বেড়েছে। এই আইনে রাজ পরিবারের সম্মান হানিকর, অপমানকর বা ভীতিমূল শব্দ বা আচরণকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফিজির অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গত আগস্টে ঘোষণা করে যে গণমাধ্যমের ‘কঠোর নিয়ন্ত্রণের’ লক্ষ্যে তারা একটি মিডিয়া ট্রাইবুনাল গঠন করবে।

শ্রীলংকার একদার প্রাণচাঞ্চল্যময় মিডিয়া পরিবেশ সাংবাদিক ও মিডিয়া কর্মীদের উপর আক্রমণের কারণে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে ২০০৬ সাল থেকে এপর্যন্ত অন্ততপক্ষে ১৪ জন মিডিয়া কর্মী বেআইনীভাবে মৃত্যুর শিকার হয়েছে। আরো অনেককে ইচ্ছামাফিকভাবে আটকাদেশ দেয়া হয়েছে, কারাগারে অন্তরীণ করা হয়েছে, নির্যাতন করা হয়েছে কিংবা নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে থাকাকালীন তারা জোরপূর্বক ‍অন্তর্ধানের শিকার হয়েছে। বিশজনেরও বেশি সাংবাদিক মৃত্যুর ভয়ে দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।


উপসংহার
ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অনেক মানুষ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোর প্রতি মুখাপেক্ষী হয়েছে যাতে করে তারা তাদের উদ্যোগগুলো টিকিয়ে রাখতে পারে এবং তাদের নিজেদের ও অন্যদের মর্যাদা আরো ভালোভাবে সুরক্ষা করতে পারে।

ঐতিহাসিকভাবে মানবাধিকারের ভাষায় কথা বলার ব্যাপারে অনিচ্ছুক আসিয়ান ঘূর্ণিঝড় নার্গিসের আঘাতে বিধ্বস্ত মানুষ যাতে প্রয়োজনীয় ত্রাণ সহায়তা পেতে পারে সেলক্ষ্যে মূল্যবান ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে যায়। গত নভেম্বর থেকে আসিয়ান সনদ কার্যকর হয়েছে। এই সনদ আসিয়ানের সদস্য ১০টি রাষ্ট্রের সকলেই স্বাক্ষর দ্বারা সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন করেছে। এই সনদে মানবাধিকারের প্রতি সদস্য রাষ্ট্রগুলো অঙ্গীকারের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে এবং আসিয়ানকে একটি শক্তিশালী মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার এক অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। ডিসেম্বরে প্যাসিফিক পার্লামেন্টারিয়ানস কনফারেন্সে সংসদ সদস্যরা সর্বসম্মতিক্রমে একটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জন্যে একটি আঞ্চলিক মানবাধিকার কৌশল প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তাদের সমর্থন জানায়। এই বিষয়টি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল তো বটেই সেসঙ্গে পুরো এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জন্যে সামগ্রিকভাবে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রবর্তী পদক্ষেপ।

এমন উদ্যোগের জন্যে কৃতিত্বের দাবীদার এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মানবাধিকার কর্মীগণ, যারা এমন ধরনের পরিবর্তনের লক্ষ্যে সামনে থেকে পুরো বিষয়টিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। এবং সরকারের দিক থেকে স্থূল ধরনের পদক্ষেপ ও নিজেদের মারাত্মক ধরনের ব্যক্তিগত ঝুঁকি থাকা সত্বেও মানবাধিকার কর্মীরা বঞ্চনা ও নির্যাতনের শিকার ও অধিকার বঞ্চিত মানুষদের অধিকার রক্ষার জন্যে অব্যাহতভাবে কাজ করে যাচ্ছে। অনেক স্থানে ক্রমবর্ধমান সংখ্যক মানবাধিকার কর্মী/আন্দোলনকারী ও সরকারের সমালোচনাকারীরা তাদের বক্তব্য তুলে ধরতে ইন্টারনেটকে কাজে লাগাচ্ছে এবং তাদের স্বপক্ষে ও তাদের সমর্থনে জনগণকে এগিয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ করছে। চীনে ইন্টারনেট ব্যবহার দুর্বার গতিতে বেড়ে চলেছে। ফলে জনগণ তাদের দেশের সরকারের নেয়া পদক্ষেপগুলো সম্পর্কে নিজেদের মধ্যে তথ্যের আদান প্রদান করতে পারছে এবং ক্ষেত্রবিশেষে সাহসী কেউ কেউ সংস্কারের জন্যে পর্যন্ত আহ্বান জানাচ্ছে। একইভাবে, ভিয়েতনামে সাহসী আন্দোলনকারীরা ক্রমবর্ধমানহারে ব্লগের মাধ্যমে ক্রমবর্ধমানহারে পরিবর্তনের ডাক দিচ্ছে ও তাদের ভিন্নমত প্রকাশ করছে। মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে মত প্রকাশের স্বাধীনতা তীব্রভাবে অবদমন করা হয় সেখানে স্বাধীনভাবে তথ্য পাওয়া, তার বিশ্লেষণ ও সমালোচনা করার মূল ‍উৎস হলো ব্লগার। অবশ্য এজন্যে তাদেরকে মাশুলও গুনতে হয়।

এই ধরনের সকল চেষ্টার গোড়ার কারণটি হলো ব্যক্তির মানবাধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবী। যদিও প্রায়শ ত‍াদের আশা ভঙ্গ হয়। তবে ২০০৮ সালের ঘটনাগুলো আমাদেরকে এই ইঙ্গিত দেয় যে তাদের সেই বিশ্বাস এখন এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অনেক কমিউনিটিতে দৃঢ়ভাবে বিস্তার লাভ করেছে।

‘আমাদেরকে প্রথম যখন উচ্ছেদ করা হয় তখন আমি একজন তরুণী। এরপর যখন উচ্ছেদ করা হলো তখন আমি মা, আমার ছোট ছোট সন্তান ছিলো। আর এখন আমার তিনটি নাতি-নাতনী আছে, কিন্তু অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি।’
৬৩ বছর বয়সী নারী, ‍আভ্যন্তরীণভাবে শরনার্থী ব্যক্তি, উত্তর কোটাবাটো প্রদেশ, ফিলিপিন্স, আগস্ট ২০০৮

‘একজনকে গ্রেফতার করা মানে কয়েকশ, কয়েক হাজার মানুষকে ভয় দেখানো যে তাদেরকেও গ্রেফতার করা হতে পারে, তাদেরকে সংগ্রাম করা ও কোনো কিছুর জন্যে আবারো চাহিদা জানানো থেকে বিরত রাখা---- আমার মতে এটি হলো কম্বোডিয়ান জনগণের প্রতি এক ধরনের অবিচার করা।’
ওয়েন সারিম, কৃষক ও মানবাধিকার রক্ষাকারী কর্মী, তিনি কম্বোডিয়ার ভূমি আন্দোলনকারীদের পদ্ধতিগতভাবে গ্রেফতার করা প্রসঙ্গে তার মতামত দিচ্ছিলেন, ফেব্রুয়ারি ২০০৮

‘আমরা সবসময়ই হুমকির মধ্যে রয়েছি। আমরা রাষ্ট্রের কাছ থেকে সমর্থন চাই, পুলিশের কাছ থেকে সহায়তা চাই। আমরা যখন কোনো সহিংস ঘটনার প্রতিকারের জন্যে পুলিশের কাছে যাই ও রিপোর্ট করি, তখন আমরা দেখতে চাই পুলিশ ব্যবস্থা নিয়েছে। তারা যেন আমাদেরকে উপেক্ষা না করেন।’
মোহনা আনসারী, মুসলমান আইনজীবি, নারীর মানবাধিকার রক্ষাকারী,
নেপালগুঞ্জ, নেপাল, নভেম্বর ২০০৮


আমাদের কাছে ত্রাণ মানে আমরা যখন দেখি আমাদের প্রিয় মানুষটি নিরাপদ ও সুস্থভাবে মুক্তমানুষ হিসেবে আমাদের সামনে আছে ------- আমি বিশ্বাস করি আমার স্বামীকে আমাদের বাড়ি থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে আটকে রাখা হয়েছে। তারপরও সে অজানা দুর্ব্যবহারের কারণে কষ্ট পাচ্ছে।’
আমিনা মাসুদ জানজুয়া, ‘অন্তর্ধান’ হওয়া মাসুদ জানজুয়ার স্ত্রী, পাকিস্তান, জুলাই ২০০৮