অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল প্রতিবেদন ২০০৯: ইসলামিক রিপাবলিক অফ পাকিস্তান
পাকিস্তান
ইসলামিক রিপাবলিক অফ পাকিস্তান
রাষ্ট্রপ্রধানঃ আসিফ আলী জারদারি (সেপ্টেম্বর মাসে পারভেজ মোশাররফের স্থলাভিষিক্ত হন)
সরকার প্রধানঃ ইউসুফ রাজা গিলানি (মার্চ মাসে তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মিয়া সুমরোর স্থলাভিষিক্ত হন)
মৃত্যুদণ্ডঃ রেখে দেয়ার পক্ষে
জনসংখ্যাঃ ১৬৭ মিলিয়ন
প্রত্যাশিত জীবনকালঃ ৬৪.৬ বছর
৫-বছরের কম বয়সীদের মৃত্যুহার (ছেলে/মেয়ে): ৮৯/৯৯ প্রতি ১,০০০ জনে
বয়স্ক সাক্ষরতাঃ শতকরা ৪৯.৯ ভাগ
ফেব্রুয়ারি মাসে একটি বেসামরিক সরকার নির্বাচিত হয়৷ ২০০৭ এর নভেম্বরে জরুরি অবস্থা চলাকালীন সময়ে আটক কারাবন্দীদেরকে নতুন সরকার মুক্তি দিয়েছে কিন্তু মানবাধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য তাদের অনেক প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়েছে৷ নির্যাতন, নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যু, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, বলপূর্বক অন্তর্ধান, “সম্মানের জন্য” হত্যাকাণ্ড এবং নিজ বাড়ীতে সহিংসতা অব্যাহত ছিল৷ নতুন সরকার মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়ার ঘোষণা করার পর, তারা কমপক্ষে ১৬ জন ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে; সারা বছর জুড়ে কমপক্ষে ৩৬ জন ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়৷ আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী উপজাতি এলাকাগুলোতে সহিংসতা পাকিস্তানের অন্যান্য এলাকাগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে, পাকিস্তানী তালেবানরা মানুষকে জিম্মি করে, বেসামরিক ব্যক্তিদেরকে লক্ষ্যবস্তু ও হত্যা করে, এবং নারী ও মেয়েশিশুদের বিরুদ্ধে সহিংস কর্মকাণ্ড ঘটায়৷
পটভূমি
১৮ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচনের পর, ৩১ মার্চ একটি বেসামরিক সরকার ক্ষমতায় আসে৷ তবে, ২০০৭ সালের নভেম্বরে জরুরি অবস্থা চলাকালীন সময়ে অবৈধভাবে বরখাস্ত করা বিচারপতিদেরকে কীভাবে পুনর্বহাল করা হবে সেই সম্পর্কে দলগুলো একমত না হতে পারার কারণে ক্ষমতাসীন জোটে ভাঙ্গন শুরু হয়৷ সংবিধান লঙ্ঘন ও অযোগ্যতার অভিযোগে অভিসংশনের হুমকির মুখে অগাস্ট মাসে প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ পদত্যাগ করেন৷ ৬ সেপ্টেম্বর তারিখে, আসিফ আলী জারদারি, বেনজীর ভূট্টোর স্বামী এবং পাকিস্তান পিপলস্ পার্টির নেতা, প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন৷
নতুনভাবে শপথ গ্রহণের মাধ্যমে পদচ্যুত অধিকাংশ বিচারপতি পুনর্বহাল হন৷ আইনজীবীদের আন্দোলন এই বলে এর বিরোধীতা করে যে, নতুন শপথের মাধ্যমে পুনরায় নিয়োগ, ২০০৭ সালের নভেম্বরে অবৈধভাবে জরুরি অবস্থা জারি এবং বিচারপতিদের পদচ্যুতিকে স্বীকৃতি দেয়ার শামিল৷
আত্মঘাতী বোমা হামলা সহ সশস্ত্র আক্রমণ বৃদ্ধির মুখোমুখি হয়ে নতুন সরকার সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং উপজাতি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ও পাকিস্তানী তালেবানদেরকে মেনে নেয়ার মধ্যে কোনটি গ্রহণ করবে তা নিয়ে দ্বিধান্বিত ছিল৷ ২২ অক্টোবর তারিখে, সংসদের উভয় কক্ষ সর্বসম্মতভাবে একটি প্রস্তাব পাস করে, আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে সামরিক কার্যক্রমের পরিবর্তে বেসামরিক আইন প্রয়োগ করার জন্য এবং সহিংসতা ত্যাগ করতে আগ্রহী তালেবানদের সাথে আলোচনা শুরু করার জন্য সরকারকে সনির্বন্ধভাবে অনুরোধ জানায়৷ ৯ ডিসেম্বর তারিখে, প্রেসিডেন্ট জারদারি বলেছেন যে গত পাঁচ বছরে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে সামরিক কার্যক্রমের কারণে ১,৪০০ বেসামরিক ব্যক্তি, ৬০০ নিরাপত্তা কর্মী ও ৬০০ জঙ্গি নিহত হয়৷
যে সব ঘাঁটি থেকে তালেবানরা আফগানিস্তানে হামলা করে সেগুলো ধ্বংস করে দেয়ার জন্য আফগান ও মার্কিন সরকার পাকিস্তানকে বার বার আহ্বান জানিয়েছে৷ পাকিস্তানের পক্ষ থেকে দৃঢ় প্রতিবাদ সত্ত্বেও, আফগানিস্তানে কর্মরত মার্কিন বাহিনী ক্রমবর্ধমান হারে সীমান্ত অতিক্রম করে পাকিস্তানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়৷
নভেম্বরের মুম্বাই হামলাগুলো পাকিস্তান-ভিত্তিক ব্যক্তি বা দল কর্তৃক সংঘটিত হয়েছে বলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করার পর ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের অবনতি ঘটে৷
আইনগত ও সাংবিধানিক উন্নয়ন
কিছু ইতিবাচক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, পাকিস্তানের নতুন বেসামরিক সরকার মানবাধিকার রক্ষা করার জন্য তাদের অনেক প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়েছে৷ মার্চ মাসে, সরকার ব্যাপক সংখ্যক রাজনৈতিক কর্মীকে মুক্তি দেয় যাদেরকে জরুরি অবস্থার সময় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং অবৈধভাবে গৃহবন্দী করে রাখা বিচারপতিদেরকে মুক্ত করে৷ এপ্রিল মাসে, পাকিস্তান অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি (ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট অন ইকোনমিক, সোস্যাল অ্যান্ড কালচারাল রাইটস, আইসিইএসসিআর) অনুমোদন করে, এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি (ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস, আইসিসিপিআর) এবং সেইসাথে নির্যাতনের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ সমঝোতায় (ইউএন কনভেনশন অ্যাগেইনস্ট টর্চার) স্বাক্ষর করে৷ মে মাসে, সরকার ঘোষণা করে যে পাকিস্তান ‘বলপূর্বক অন্তর্ধান থেকে সকল ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সমঝোতা’য় সম্মতি দেবে, কিন্তু বছরের শেষ পর্যন্ত তারা তা করেনি৷
নভেম্বর মাসে, একটি পৃথক মানবাধিকার মন্ত্রণালয় স্থাপন করা হয়৷ ১৫ অক্টোবর, একটি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠনের জন্য কেবিনেট একটি খসড়া প্রস্তাব অনুমোদন করে কিন্তু বছরের শেষ পর্যন্ত সংসদ তা পাস করেনি৷
নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও আটক রাখা
আইন অনুযায়ী বন্দীদেরকে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির না করে পুলিশ তাদেরকে বেশি সময়ের জন্য আটক রাখা অব্যাহত রেখেছে৷
নভেম্বর মাসে ভারতের মুম্বাইয়ে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোতে হামলার সময়, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ জামাতুদ-দাওয়া সংগঠনটি ও এর নেতাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা আরোপ করে, যার ফলে নিবৃত্তিমূলক আটক আইনের অধীনে ডিসেম্বরে সংগঠনটির শত শত কর্মীকে আটক করা হয়৷
নির্যাতন ও অন্যান্য নিপীড়ন
আইন-শৃঙ্খলা প্রয়োগকারী ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো নিয়মিতভাবে নির্যাতন ও অন্যান্য নিপীড়ন ব্যবহার করে, যেমন পেটানো, দীর্ঘ সময় ধরে দাঁড়া করিয়ে রাখা, পায়ের গোড়ালিতে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা ও ধর্ষণ করা৷ নিরাপত্তা হেফাজতে অনেকগুলো মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে৷
বলপূর্বক অন্তর্ধান
এপ্রিল মাসে, আইনমন্ত্রী ফারুক নাইক অঙ্গীকার করেছিলেন যে সরকার বলপূর্বক অন্তর্ধানের শিকার সকল ব্যক্তির সন্ধান বের করবে৷ সরকারের নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী, শুধুমাত্র বেলুচিস্তান প্রদেশেই ১,১০২ ব্যক্তি নিরুদ্দেশ হয়েছে৷ মে মাসে, নিরুদ্দেশ হওয়া ব্যক্তিদেরকে খুঁজে বের করতে সরকার দুইটি কমিটি গঠন করে৷ জুন মাসে, সরকার জানিয়েছে যে নিরুদ্দেশ হওয়া ৪৩ জন ব্যক্তিকে বেলুচিস্তানে খুঁজে পাওয়া গেছে এবং তাদেরকে হয় মুক্তি দেয়া হয়েছে অথবা সরকার নির্ধারিত কারাগারে আটক রাখা হয়েছে৷ অন্তর্ধানের শত শত ঘটনা সম্পর্কিত পিটিশন সুপ্রীম কোর্টে মুলতবি রয়ে গেছে৷
২১ নভেম্বর তারিখে, মানবাধিকার মন্ত্রী মুমতাজ আলম গিলানি ঘোষণা করেন যে নিরুদ্দেশ হওয়া ব্যক্তিদেরকে খুঁজে বের করতে সহায়তা করার জন্য একটি নতুন আইন তৈরি করা হয়েছে এবং বলেন যে তার মন্ত্রণালয়ে বলপূর্বক অন্তর্ধানের ৫৬৭টি ঘটনার নথিপত্র রয়েছে৷ ২৫ নভেম্বর তারিখে, সিনেটের অভ্যন্তরীণ বিষয়ক স্ট্যাণ্ডিং কমিটি স্বীকার করেছে বলে জানা যায় যে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সারাদেশজুড়ে “অসংখ্য গোপন নির্যাতন সেল” চালু রেখেছিল৷ এই সব উদ্যোগ সত্ত্বেও, নতুন করে বলপূর্বক অন্তর্ধানের ঘটনা ঘটেছে বলে জানা যায়৷
• আফিয়া সিদ্দিকী, একজন স্নায়ুবিজ্ঞানী, এবং তার তিনটি ছোট শিশুকে ২০০৩ এর মার্চ মাসে পাকিস্তান গোয়েন্দা সংস্থা করাচিতে আটক করে বলে জানা যায়৷ তবে, মার্কিন সূত্র অনুযায়ী তাকে ১৭ জুলাই ২০০৮ পর্যন্ত আটক করা হয়নি যখন আফগানিস্তানের গজনিতে তাকে ও তার ১১-বছর-বয়সী ছেলে মোহাম্মদ আহমেদকে আফগান পুলিশ আটক করে৷ মার্কিন সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, মার্কিন কর্মকর্তারা ১৮ জুলাই তারিখে আফগান কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তাকে গ্রহণ করার সময় আত্মরক্ষার জন্য তাকে গুলি করে৷ তাকে নিউ ইয়র্কের একটি আটক কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়, এবং সেপ্টেম্বর মাসে মার্কিন কর্মকর্তা ও কর্মীদেরকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়, যা আল-কায়েদার সাথে সহযোগিতা করা সম্পর্কিত তার বিরুদ্ধে আনা আগের অভিযোগ থেকে ভিন্ন৷ তার ছেলেকে পাকিস্তানে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হয়৷ মার্কিন কর্তৃপক্ষ বার বার বলেছে যে তার অন্য সন্তানরা তাদের হাতে ছিল না৷ ২০০৩ ও ২০০৮-এর জুলাইয়ের মধ্যকার সময়ে তার ও তার দুইটি ছোট শিশুর ভাগ্য ও অবস্থান অস্পষ্ট রয়ে গেছে৷ ডিসেম্বর মাসে, যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আদালত বিচারের সম্মুখীন হওয়ার জন্য তার সামর্থ্য সম্পর্কে আরো মানসিক মূল্যায়নের আদেশ দেয় এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করে৷
• ২২ সেপ্টেম্বর তারিখে, হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে ড. আব্দুর রাজ্জাককে রাওয়ালাপিণ্ডিতে আটক করা হয়৷ তার স্ত্রী ইসলামাবাদ হাই কোর্টে একটি হেবিয়াস কর্পাস পিটিশন দাখিল করেন৷ ৭ নভেম্বর তারিখে, রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা তার অবস্থান সম্পর্কে কোন তথ্য জানার বিষয়টি অস্বীকার করেন৷ ১৭ ডিসেম্বর তারিখে, আদালতের প্রধান বিচারপতি সরদার মোহাম্মদ আসলাম বলেছেন “নিখোঁজ ব্যক্তিরা কোথায় রয়েছে তা সবাই জানে”, এবং ডাক্তারকে অবিলম্বে আদালতে হাজির করার জন্য আদেশ দেন৷ বছরের শেষ পর্যন্ত তার অবস্থান অজানা রয়ে গেছে৷ তার আইনজীবী বলেছেন “সন্ত্রাসীদের” চিকিৎসা করার কারণে ডাক্তারকে হয়তো নিরুদ্দেশ করা হয়েছে৷
বিদ্রোহ দমন করার সময় আইনের লঙ্ঘন
পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী উপজাতি এলাকাগুলো এবং উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ (সোয়াত)-এর সন্নিহিত এলাকাগুলোতে নিয়োজিত পাকিস্তানী নিরাপত্তা বাহিনীগুলো, উপজাতীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং পাকিস্তানী তালেবানদের বিরুদ্ধে কার্যক্রম চালানোর সময় বেসামরিক ব্যক্তিদেরকে হত্যা ও আহত করেছে৷
• ১৯ অক্টোবর তারিখে পাকিস্তানী ও বিদেশি যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে একটি অপারেশনের সময়, যুদ্ধবিমানগুলো সোয়াতের একটি গ্রামে বোমা হামলা চালায়৷ স্থানীয় অধিবাসীরা জানান যে অনেক বেসামরিক ব্যক্তি সহ ৪৭ জন ব্যক্তি নিহত হয়৷
সরকারি কার্যক্রমগুলো লক্ষ লক্ষ ব্যক্তিকে বাস্তুচ্যুত করে৷ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত অনেক ব্যক্তি মানবিক সহায়তা বা সরকারের কাছ থেকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সুবিধা ছাড়া অবস্থান করছে৷ আফগানিস্তানে আশ্রয়ের খোঁজে প্রায় ২০,০০০ পাকিস্তানী সীমান্ত অতিক্রম করেছে৷
সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কর্তৃক নিপীড়ন
সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো, এদের অনেকেই স্পষ্টত তালেবান-পন্থী, গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে, যার মধ্যে রয়েছে বেসামরিক ব্যক্তিদের ওপর সরাসরি আক্রমণ, নির্বিচারে হামলা, অপহরণ, জিম্মি-গ্রহণ, নির্যাতন ও অন্যান্য দুর্ব্যবহার, এবং বন্দীদেরকে হত্যা করা৷
• অক্টোবর মাসে, একজন তালেবান আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী ওরাকজাই এজেন্সিতে একটি শান্তি সম্মেলনে ৮০ জনেরও বেশি নিরস্ত্র বেসামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করে এবং প্রায় ১০০ জনকে আহত করে যারা ওই এলাকায় সহিংসতা কমানোর জন্য একটি কৌশল নির্ধারণ করছিলো৷
পাকিস্তানী তালেবানরা কয়েক ডজন ব্যক্তিকে জিম্মি করে, যাদের মধ্যে ছিল একজন আফগান ও একজন ইরানী কূটনীতিবিদ, একজন পাকিস্তানী ও একজন কানাডীয় সাংবাদিক, ও একজন পোলিশ প্রকৌশলী৷ আফগান কূটনীতিবিদকে পরে ছেড়ে দেয়া হয় কিন্তু অন্যরা এখনো নিখোঁজ রয়েছে৷
সেপ্টেম্বর মাসে, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান-এর সোয়াত শাখা (পাকিস্তানী তালেবান) জেলে থাকা তাদের ১৩৬ জন সহযোগীকে ছাড়িয়ে নিতে চাপ সৃষ্টি করার জন্য কয়েকজন বিদেশিকে জিম্মি করে৷
স্থানীয় তালেবানরা অবৈধভাবে বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে এবং যাদেরকে তারা ইসলামী আইন ভঙ্গ করা বা সরকারের পক্ষে গোয়েন্দাগিরি করার জন্য অভিযুক্ত করে তাদের “বিচার” করে এবং “দণ্ড” দেয়৷ এই ধরনের “বিচারের” পর কয়েক ডজন ব্যক্তিকে অবৈধভাবে হত্যা করা হয়৷
• ২৭ জুন তারিখে, মার্কিন বাহিনীর পক্ষে “গুপ্তচরবৃত্তির” জন্য একটি পরিষদ দুইজন আফগানকে দোষী সাব্যস্ত করার পর বাজাউর এজেন্সিতে হাজার হাজার লোকের সামনে তাদেরকে অবৈধভাবে হত্যা করা হয়৷
নারী ও মেয়েশিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা
নারী ও মেয়েশিশুরা রাষ্ট্রের হাতে এবং যথাযথ সরকারি ব্যবস্থার অভাবে সমাজের মধ্যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়, যার মধ্যে রয়েছে “সম্মানের জন্য” হত্যাকাণ্ড, জোর করে বিয়ে, ধর্ষণ ও নিজ বাড়ীতে সহিংসতা৷ কর্মস্থলে হয়রানি থেকে সুরক্ষার বিল নভেম্বরে কেবিনেটে অনুমোদিত হয়, এবং নিজ বাড়ীতে সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) বিল অগাস্টে নারী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হয়, কিন্তু এগুলো এখনো বিবেচনাধীন রয়েছে৷
• ১৩ জুলাই তারিখে, ১৬ বছর বয়সী একটি মেয়েশিশু এবং ১৮ ও ২০ বছর বয়সী দুইজন নারীকে অপহরণ করা হয় বলে জানা যায় এবং তাদেরকে সরকারি নম্বর প্লেটযুক্ত একটি গাড়ীতে করে বাবাকোটে নিয়ে যাওয়া যায়, এবং তাদের পছন্দের পুরুষকে বিয়ে করতে চাওয়ার কারণে হত্যা করা হয়৷ ময়না তদন্ত পরীক্ষায় দেখা গেছে যে দুইজন তরুণী নারী ভোতা অস্ত্রের আঘাতের কারণে মাথায় আঘাত পেয়ে মারা গেছেন৷ তৃতীয় দেহটি পাওয়া যায়নি৷ একজন বালুচ সিনেটর হত্যাকাণ্ডগুলোকে “উপজাতীয় রীতি” বলে সমর্থনের চেষ্টা করেন; স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা পুলিশি তদন্তকে ব্যাহত করে বলে জানা যায়৷ বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য মেয়েশিশুদেরকে বিয়েও দিয়ে দেয়া হয়৷
• অক্টোবর মাসে, দুইমাস আগে সংঘটিত একটি “সম্মানের জন্য” হত্যাকাণ্ডের বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সিন্ধু প্রদেশের শিকারপুর জেলার দ্রিঘপুরে ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী তিনটি মেয়েশিশুকে একটি জিরগা (অনানুষ্ঠানিক উপজাতীয় পরিষদ) কর্তৃক বিয়েতে বাধ্য করা হয়৷ কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি৷
পাকিস্তানী তালেবানদের হুমকি ফেব্রুয়ারি মাসের নির্বাচনে হাজার হাজার নারীকে ভোট দেয়া থেকে বিরত রাখে৷
ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বৈষম্য
সরকার ধর্মীয় সংখ্যালঘুদেরকে ব্যাপক বৈষম্য, হয়রানি ও সহিংসতার হাত থেকে পর্যাপ্তভাবে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে৷
• সেপ্টেম্বর মাসে, একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেল উপস্থাপনাকারীর আহ্বান হিসেবে, ধর্ম পরিত্যাগকারী ও ধর্মের অবমাননাকারীদেরকে হত্যা করাটা ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে প্রচার করার পর দুইজন আহমাদিয়া, আব্দুল মান্নান সিদ্দিকী, সিন্ধুর মিরপুরখাসের একজন ডাক্তার, এবং সিন্ধুর নওয়াবশাহ-এর ৭৫-বছর-বয়সী একজন ব্যবসায়ী, শেখ মোহাম্মদ ইউসুফ অজ্ঞাত ব্যক্তিদের গুলিবর্ষণে নিহন হন৷ কোনো তদন্ত শুরু করা হয়েছে বলে জানা যায়নি৷
২৫টি নিবন্ধিত মামলার মাধ্যমে ছিয়াত্তর জন ব্যক্তিকে ধর্মের অবমাননা করার জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৭ জনকে পাকিস্তান দণ্ডবিধির (পাকিস্তান পেনাল কোড, পিপিসি) ২৯৫সি ধারা অনুসারে অভিযুক্ত করা হয়েছে যাতে নবী মোহাম্মদ (সাঃ)-এর নামকে অবমাননা করার জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে৷
• জুন মাসে, পাঞ্জাবের নানকানা সদরে ১৬ জন আহমাদিয়াকে ধর্মের অবমাননা করার জন্য অভিযুক্ত করা হয়, এমন একটি পোস্টার ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগে যাতে তাদের ধর্মীয় নেতাকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরা হয়েছিল৷
শিশুদের অধিকার
সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কর্তৃক শিশুদেরকে রিক্রুট করা, শিশু পাচার, নিজ বাড়ীতে শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, বিশেষ করে মেয়ে শিশুদের বিরুদ্ধে, অব্যাহত ছিল৷ সাহিল এনজিও’র তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে ৯৯২টি শিশু, ৩০৪টি ছেলে ও ৬৮৮টি মেয়ে, যৌন নিপীড়নের শিকার হয়৷
জুলাই মাসে, সোয়াত কর্তৃপক্ষ আবিষ্কার করে যে পাকিস্তানী তালেবানরা ২৬টি ছেলেকে প্রশিক্ষণের জন্য রিক্রুট করে যাদের বয়স ১৩ থেকে ১৮-এর মধ্যে৷
মৃত্যুদণ্ড
কমপক্ষে ২৩৬ জন ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয় বলে জানা যায়, অধিকাংশই হত্যাকাণ্ডের জন্য৷ মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত বন্দীর মোট সংখ্যা কমপক্ষে ৭,০০০ ছিল৷
২১ জুন তারিখে, প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানী ঘোষণা করেন যে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হবে৷ তবে, প্রেসিডেন্ট জারদারি নভেম্বরে একটি অধ্যাদেশ জারি করেন যা সাইবার অপরাধ মৃত্যুদণ্ডের কারণ হলে তার জন্য মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে৷
এই বছর কমপক্ষে ৩৬ জন ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, এর মধ্যে ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় পরিবর্তিত শাস্তির বিষয়টি ঘোষণা করার পর৷
ডিসেম্বর মাসে, বিশ্বব্যাপী মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করার জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের একটি প্রস্তাবের বিরুদ্ধে পাকিস্তান ভোট দেয়৷
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদন
• পাকিস্তানঃ ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা - মানবাধিকারের শক্তিশালী রক্ষাকবচগুলো সুনিশ্চিত করা (ASA 33/001/2008)
• পাকিস্তানঃ অনস্বীকার্যকে অস্বীকার করা - পাকিস্তানে বলপূর্বক অন্তর্ধান (ASA 33/018/2008)