অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল প্রতিবেদন ২০০৯: মুখবন্ধ
এটা কেবল অর্থনীতির জন্যই নয়, এটা মানবাধিকারের জন্যও সংকট।
আইরিন খান
২০০৮-এর সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলস্, এমডিজি), ২০১৫ সালের মধ্যে দারিদ্র্য হ্রাসের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে সম্মত লক্ষ্যমাত্রা সম্পর্কিত উচ্চ-পর্যায়ের বৈঠকে অংশগ্রহণ করার জন্য আমি নিউ ইয়র্কে ছিলাম৷ ক্ষুধা নির্মূল করা, নবজাত শিশু ও গর্ভবর্তী নারীদের প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু কমানো, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা, ও মেয়েশিশুদেরকে শিক্ষিত করে তোলার জন্য আরো তহবিলের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে প্রতিনিধির পর প্রতিনিধি বক্তব্য দিয়েছেন৷ কোটি কোটি লোকের জীবন ও মর্যাদা ঝুঁকির সম্মুখীন ছিল, কিন্তু মুখের কথাকে টাকার মাধ্যমে সমর্থন দেয়ার ইচ্ছা অত্যন্ত সীমিত ছিল৷ আমি জাতিসংঘ ভবনটি ছেড়ে বের হয়ে আসার পর দেখতে পাই যে ম্যানহাটানের অন্য একটি অংশ থেকে একেবারেই ভিন্ন একটি কাহিনী প্রকাশিত হচ্ছিলঃ ওয়াল স্ট্রিটের বৃহত্তম একটি বিনিয়োগ ব্যাংকের পতন৷ এটা ছিল একটা কার্যকর সংকেত যে বিশ্বের মনোযোগ ও সম্পদ আসলে কোথায় নিবদ্ধ ছিল৷ দারিদ্র্য নিরসনের জন্য যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন ছিল, ধনী ও ক্ষমতাবান সরকারগুলো হঠাৎ করে তারচেয়ে অনেকগুণ বেশি অর্থের খোঁজ পেতে সক্ষম হয়েছিল৷ তারা সেগুলো ধ্বসে পড়া ব্যাংকে এবং অর্থনীতির জন্য উদ্দীপক প্যাকেজ হিসেবে ব্যাপক পরিমাণে ঢেলেছিল, এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে বছরের পর বছর ধরে অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলতে দেয়া হয়েছিল আর এখন এগুলো স্থবির হয়ে গেছে৷
২০০৮ শেষ হওয়ার আগে, এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে আমাদের বঞ্চনা ও অতিলোভের দুই-স্তর বিশিষ্ট বিশ্ব - অল্প কিছু লোকের লালসা মেটানোর জন্য বহুলোককে নিঃস্ব করা - একটি সুগভীর গহবরে তলিয়ে যাচ্ছিল৷
জলবায়ু পরিবর্তন সহ, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার ক্ষেত্রেওঃ অধিকাংশ ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডের জন্য ধনীরা দায়ী হলেও, গরীবরাই সবচেয়ে খারাপভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়৷ যদিও মন্দার তীক্ষ্ণ দাঁত থেকে কেউই রেহাই পায়নি, দরিদ্র দেশগুলো থেকে বিপর্যয়ের যে খবর আসছে সেই তুলনায় ধনী দেশগুলোর দুর্দশা কিছুই নয়৷ চীনের পরিযায়ী কর্মী থেকে শুরু করে গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোর (ডিআরসি) কাতাঙ্গার খনি শ্রমিক পর্যন্ত, যারা নিজেদেরকে দারিদ্র্য থেকে টেনে বের করে আনার জন্য বেপরোয়া হয়ে চেষ্টা করছে, তারা ধকলটা তীব্রভাবে বুঝতে পারছে৷ বিশ্বব্যাংক অনুমান করছে যে এই বছর আরো ৫.৩ কোটি মানুষ দারিদ্র্যে নিপতিত হবে, এটা গত বছর খাদ্য সংকটে নিপতিত ১৫ কোটি মানুষের সাথে যোগ হবে, যা গত দশকে অর্জিত সাফল্যকে মুছে ফেলবে৷ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্য অনুযায়ী ১.৮ থেকে ৫.১ কোটি মানুষ তাদের চাকরি হারাতে পারে৷ খাদ্যদ্রব্যের অত্যধিক মূল্যবৃদ্ধি আরো বেশি ক্ষুধা ও রোগ বয়ে আনছে, জোরপূর্বক গণ উচ্ছেদ ও বন্ধকী সম্পত্তির দখলগ্রহণ আরো বেশি গৃহহীনতা ও দুর্গতি বয়ে আনছে৷
সাম্প্রতিক বছরগুলোর অপব্যয়ীতা মানবাধিকারের ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে তা অনুমান করার জন্য এখনো সময় আসেনি, তবে এটা স্পষ্ট যে মানবাধিকারের ক্ষতি এবং অর্থনৈতিক সংকটের পরিণতি সুদীর্ঘ ছায়া ফেলবে৷ এটাও স্পষ্ট যে, সরকার কেবল বাজারের শক্তির কাছে অর্থনৈতিক ও আর্থিক বিধি-বিধানকে ছেড়ে দিয়েছে তাই নয়, তারা মানবাধিকার, জীবন ও জীবিকাকে রক্ষা করতে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে৷
কোটি কোটি লোক নিরাপত্তাহীনতা, অবিচার ও মর্যাদাহীনতায় ভুগছে৷ এটা মানবাধিকারের সংকট৷
এই সংকট হচ্ছে খাদ্য, চাকরি, বিশুদ্ধ পানি, ভূমি ও গৃহায়ন সম্পর্কিত এবং সেইসাথে বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতা, বিদেশিদের প্রতি ঘৃণা ও জাতিগত বৈষম্যমূলক আচরণ, সহিংসতা ও নিপীড়ন সম্পর্কিত৷ একত্রে এগুলো একটি বৈশ্বিক সংকট সৃষ্টি করে যার জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের ভিত্তিতে বৈশ্বিক সমাধান প্রয়োজন৷ দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ক্ষমতাবান সরকারগুলো তাদের নিজেদের দেশে আর্থিক ও অর্থনৈতিক পরিণতির ওপর অন্তর্মুখী সঙ্কীর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ করছে আর বিস্তৃত বিশ্ব সংকটকে উপেক্ষা করছে৷ অথবা, যদি তারা আন্তর্জাতিক কার্যক্রমের বিষয়টি বিবেচনা করে, তারা এটিকে শুধু আর্থিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ রাখছে, আর তাই অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি করছে৷
বিশ্বের একটি ভিন্ন ধরনের নেতৃত্ব, একটি ভিন্ন ধরনের রাজনীতি এবং সেইসাথে একটি ভিন্ন ধরনের অর্থনীতি দরকার - এমন কিছু যা সবার জন্য কাজ করবে এবং পক্ষপাতমূলকভাবে কেবলমাত্র কয়েকজনের জন্য নয়৷ আমাদের এমন ধরনের নেতৃত্ব দরকার যা রাষ্ট্রগুলোকে সঙ্কীর্ণ জাতীয় স্বার্থ থেকে বহুজাতিক সহযোগিতার পথে নিয়ে যাবে, যাতে করে সমাধানগুলো হবে সামগ্রিক, সমন্বিত, টেকসই ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল৷ একেবারেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে আর্থিক সমৃদ্ধির প্রত্যাশায় সরকার ও সংস্থাগুলোর মধ্যে গড়ে ওঠা মৈত্রী অবশ্যই বিচ্ছিন্ন করতে হবে৷ সুবিধাভোগীদের মৈত্রী, যা নিপীড়নকারী সরকারগুলোকে দায়বদ্ধতা থেকে রক্ষা করে, অবশ্যই বন্ধ করতে হবে৷
অসাম্যের অনেক রূপ
অনেক বিশেষজ্ঞ সেই সব লক্ষ লক্ষ লোকের দিকে ইঙ্গিত করেন যাদেরকে অর্থনৈতিক উন্নতির মাধ্যমে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা হয়েছে, কিন্তু সত্য ঘটনা হচ্ছে আরো অনেক লোক পিছনে পড়ে রয়েছে, সাফল্য অনেক বেশি ভঙ্গুর ছিল - যা সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংকটে দেখা গেছে - আর মানবাধিকারের ক্ষতি হয়েছে অনেক বেশি৷ অনিয়ন্ত্রিত বিশ্বায়নের যাঁতাকল বিশ্বকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উন্নতির উন্মত্ততায় ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ার ফলে, মানবাধিকারকে প্রায়ই পিছনের আসনে নিয়ন্ত্রিত রাখা হয়৷ পরিণতি ছিল স্পষ্টঃ ক্রমবর্ধমান অসাম্য, বঞ্চনা, বিতাড়ন ও নিরাপত্তাহীনতা; ধৃষ্টতা ও দায়মুক্তি সহ নিপীড়িতদের বিরুদ্ধে কথা বলা মানুষের কন্ঠ; এবং নির্যাতনের জন্য যারা দায়ী - সরকার, বড় ব্যবসায়ী ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ - ছিল মূলতঃ অননুতপ্ত ও দায়বদ্ধতাহীন৷ মারাত্মক সংঘাতের কারণে ইতিপূর্বে বিদ্যমান বৈশ্বিক নিরাপত্তাহীনতার সাথে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতার ক্রমবর্ধমান চিহ্ন দেখা যাচ্ছে, যেগুলোর সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অক্ষম বা অনিচ্ছুক বলে মনে হয়৷ অন্য কথায়ঃ আমরা অসাম্য, অবিচার ও নিরাপত্তাহীনতার এক বারুদের পিপার ওপর বসে আছি, এবং এটি বিস্ফোরিত হতে যাচ্ছে৷
আফ্রিকার অনেক জায়গায় টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সত্ত্বেও, লক্ষ লক্ষ লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়ে গেছে, তাদের মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য সংগ্রাম করছে৷ সম্ভবত ল্যাটিন আমেরিকাই বিশ্বের সবচেয়ে অসম অঞ্চল, তাদের জাতীয় অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হওয়া সত্ত্বেও গ্রামীণ ও শহুরে এলাকাগুলোতে আদিবাসী ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোকে তাদের স্বাস্থ্যসেবা, বিশুদ্ধ পানি, শিক্ষা ও পর্যাপ্ত বাসস্থানের অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হচ্ছে৷ ভারত এশিয়ার বৃহৎ শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে কিন্তু এখনো তার শহুরে গরীব জনগোষ্ঠী ও গ্রামীণ এলাকাগুলোর প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোর প্রতি বঞ্চনা দূর করতে পারেনি, অন্যদিকে চীনে গ্রামীণ ও পরিযায়ী কর্মীদের এবং ধনী শহুরে শ্রেণির মধ্যকার দূরত্ব আরো বেশি প্রকট হচ্ছে৷
এখন বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ শহরে বসবাস করে এবং তাদের মধ্যে, একশ কোটিরও বেশি মানুষ বস্তিতে বসবাস করে৷ অন্যভাবে বলা যায়, শহরের অধিবাসীদের প্রতি তিনজনে একজন অপর্যাপ্ত বাসস্থানে বসবাস করে যেখানে মৌলিক পরিষেবাগুলো হয় নেই অথবা খুব সামান্য পরিমাণে রয়েছে, এবং সেখানে নিরাপত্তাহীনতা, সহিংসতা ও জোরপূর্বক উচ্ছেদের ঝুঁকি প্রতিদিনই থাকে৷ কেনিয়ার নাইরোবির শতকরা ষাটভাগ মানুষ বস্তিতে বসবাস করে - যার মধ্যে ১০ লক্ষ বাস করে কিবেরাতে, যা আফ্রিকার সবচেয়ে বড় বস্তি৷ আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে, জমি নিয়ে বিরোধ, জমি দখল, এবং কৃষি-ভিত্তিক শিল্প ও নগর পুনঃউন্নয়ন প্রকল্পের কারণে প্রায় ১৫০,০০০ কম্বোডিয়ান বলপূর্বক উচ্ছেদের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে৷
বিশ্বায়নের একটি উপজাত হিসেবে অসাম্য শুধু উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বসবাসরতদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না৷ অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, ওইসিডি)-এর অক্টোবর ২০০৮-এর প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে যে, শিল্পোন্নত দেশগুলোতেও “সাম্প্রতিক দশকের অর্থনৈতিক উন্নয়ন দরিদ্রদের চেয়ে ধনীদেরকে বেশি লাভবান করেছে৷” যুক্তরাষ্ট্র, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ, দারিদ্র্যকে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত করা এবং ক্রমবর্ধমান আয় বৈষম্যের জন্য ৩০টি ওইসিডি রাষ্ট্রের মধ্যে ২৭তম অবস্থানে এসেছে৷
নোংরা সত্য হচ্ছে এই যে, ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোর বস্তি এলাকাগুলোর শহুরে দরিদ্র থেকে শুরু করে ইউরোপীয় দেশগুলোর রোমা সম্প্রদায় পর্যন্ত, অনেক মানুষ গরীব হওয়ার কারণ হচ্ছে ব্যবসায়ী বা বেসরকারি খাতের সাথে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে রাষ্ট্রের বৈষম্য, প্রান্তিকতা ও বাধাদান সম্পর্কিত প্রকাশ্য ও গোপন নীতি, অথবা এগুলো না দেখার ভান করা৷ এটা কোনো আকস্মিক যোগাযোগ নয় যে বিশ্বের অনেক দরিদ্রই হচ্ছে নারী, অভিবাসী, জাতিগত বা ধর্মীয় সংখ্যালঘু৷ এটা কোনো দৈবাৎ ঘটনা নয় যে আমাদের সময়ে মাতৃত্বকালীন মৃত্যুর হার, মৃত্যুর একটি সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হিসেবে রয়ে গেছে, যদিও জরুরি প্রসূতি সেবায় যৎসামান্য খরচ সন্তান জন্মদানের বয়সী লক্ষ লক্ষ নারীর জীবন রক্ষা করতে পারে৷
মানুষকে তাদের জমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে বঞ্চিত রাখা এবং নিঃস্ব করার জন্য ব্যবসায়ী ও রাষ্ট্রের মধ্যকার ষড়যন্ত্রের একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ হচ্ছে আদিবাসী সম্প্রদায়ের বিষয়টি৷ বলিভিয়ার চাকো অঞ্চলে আদিবাসী গুয়ারানি পরিবারগুলোর অনেকেই এমন একটি পরিস্থিতিতে বসবাস করছে যাকে মানবাধিকার সম্পর্কিত আন্তঃআমেরিকান কমিশন বন্দীদশার অবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা দাসত্বের অনুরূপ৷ ২০০৮-এর অগাস্টে ব্রাজিলে তার সফরের পর, আদিবাসী জনগণ বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি সেই দেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য “নীতি নির্ধারণ, সেবা প্রদান, ও বিচার প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান বৈষম্যের” সমালোচনা করেছেন৷
বিচার প্রক্রিয়ার নিজের মধ্যেই বৈষম্য বিদ্যমান৷ বাজার অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা এবং বিদেশি ব্যবসা ও বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার প্রচেষ্টায়, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ অনেকগুলো উন্নয়নশীল দেশের বাণিজ্যিক খাতে আইনী সংস্কারের জন্য তহবিল প্রদান করেছে৷ কিন্তু সরকার ও কোম্পানীগুলো কর্তৃক নিয়মনীতি লঙ্ঘনের জন্য দরিদ্র জনগণ যাতে আদালতের মাধ্যমে তাদের অধিকার প্রয়োগ করতে পারে ও ক্ষতিপূরণ চাইতে পারে তা নিশ্চিত করতে কোনো তুলনীয় প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়নি৷ দরিদ্রদের জন্য আইনী ক্ষমতায়ন বিষয়ক জাতিসংঘ কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের অর্থবহভাবে বিচার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই৷
নিরাপত্তাহীনতার অনেক রূপ
দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাসরত এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে কারণ অর্থনৈতিক মন্দার পরিবেশে কিছু বিষয় একসাথে চলে আসে৷
প্রথমত, এক দশক আগে পর্যন্ত, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (ইন্টারন্যাশনাল মনেটারি ফাণ্ড, আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের নেতৃত্বে কাঠামোগত উপযোজনের নীতিমালা, উন্নয়নশীল ও উন্নত উভয় প্রকার দেশগুলোতে সামাজিক নিরাপত্তা জালকে ছিন্ন-বিছিন্ন করে ফেলেছে৷ কাঠামোগত উপযোজন নীতিমালাসমূহ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে এমন অবস্থা তৈরির জন্য পরিকল্পনা করেছিল যা একটি বাজার অর্থনীতিকে সমর্থন করবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য জাতীয় বাজারকে উন্মুক্ত করবে৷ এটি এমন একটি ন্যূনতম অবস্থা সৃষ্টির দিকে ধাবিত হয় যাতে সরকারগুলো বাজারের পক্ষে তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার করে৷ অর্থনৈতিক উদারীকরণের আহ্বানের পাশাপাশি, কাঠামোগত উপযোজন নীতিমালাগুলোও সরকারি সেবাগুলোকে বেসরকারি করা, শ্রমিক সংগঠনগুলোকে নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা, এবং সামাজিক নিরাপত্তা জালগুলোকে ছিন্ন করার জন্য চাপ দেয়৷ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মত ক্ষেত্রগুলোতে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ কর্তৃক ব্যবহারকারীর ফি প্রবর্তনের ফলে অনেক ক্ষেত্রেই এই সেবাগুলো দরিদ্রতমদের আওতার বাইরে চলে যায়৷ এখন, অর্থনীতির টলটলায়মান অবস্থায় এবং বেকারত্ব বৃদ্ধির সাথে সাথে, অনেক বেশি সংখ্যক ব্যক্তি শুধু যে আয় হারানোর সম্মুখীন হয়েছে তাই নয়, বরং সেইসাথে তারা সামজিক নিরাপত্তাও হারিয়েছে যেখানে কঠিন সময়ে তাদেরকে সাহায্য করার জন্য কোনো নিরাপত্তা জাল নেই৷
দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা, এর গুরুতর অবস্থা সত্ত্বেও, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে অপর্যাপ্ত মনোযোগ পাচ্ছে৷ খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১০০ কোটি মানুষ ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে ভুগছে৷ কৃষিতে কয়েক দশক ধরে কম বিনিয়োগের কারণে খাদ্য স্বল্পতা; ডাম্পিংকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য বাণিজ্য নীতিমালা এবং এর ফলে স্থানীয় কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতি; জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্রমবর্ধমানভাব পানির অভাব ও ভূমির ক্ষয়, জনসংখ্যার চাপ বৃদ্ধি; জ্বালানীর মূল্যবৃদ্ধি এবং জৈব জ্বালানীর ওপর চাপ বাড়ার কারণে, অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ক্ষুধা বৃদ্ধি পেয়েছে৷
অনেক জায়গায় খাদ্য সংকট আরো গুরুতর হয়েছে বৈষম্য ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে খাদ্য বিতরণ, অত্যন্ত-প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তার পথে বাধা সৃষ্টি, নিরাপত্তাহীনতা ও সশস্ত্র সংঘাতের কারণে, যা কৃষির সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দেয় অথবা খাদ্য উৎপাদন বা খাদ্য ক্রয়ের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ লাভের সুযোগ প্রদানে বাধা সৃষ্টি করে৷ জিম্বাবুয়েতে, ২০০৮ সালের শেষদিকে যখন পঞ্চাশ লক্ষ লোকের খাদ্য সহায়তার প্রয়োজন ছিল, তখন সরকার খাদ্যকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে৷ উত্তর কোরিয়ায়, কর্তৃপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে খাদ্য সহায়তা নিয়ন্ত্রিত রাখে যাতে জনগণকে নিপীড়িত ও ক্ষুধার্ত রাখা যায়৷ সুদানী সশস্ত্র বাহিনী ও সরকার-সমর্থিত জানজাউইদ মিলিশিয়াদের বিদ্রোহ দমনের “পোড়ামাটি নীতি” দারফুরের জনগণের জীবিকা এবং সেইসাথে জীবন ধ্বংস করেছে৷ উত্তর শ্রীলংকায় সংঘাতে আটকা পড়া বাস্তুচ্যুত বেসামরিক জনগণ খাদ্য ও অন্যান্য মানবিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত ছিল কারণ এলটিটিই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো লোকজনকে চলে যেতে দিতে চায়নি এবং শ্রীলংকার সশস্ত্র বাহিনী সাহায্য সংস্থাগুলোকে প্রবেশের পূর্ণ অনুমতি দেয়নি৷ ২০০৮ সালে খাদ্যের অধিকার প্রত্যাখ্যান করার সবচেয়ে জঘন্য ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছিল সম্ভবত মিয়ানমারে যখন কর্তৃপক্ষ তিন সপ্তাহ ধরে ঘূর্ণিঝড় নার্গিসে আক্রান্ত ২৪ লক্ষ বেঁচে যাওয়া মানুষের একান্ত প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক সাহায্য অনুমোদন করতে অস্বীকার করেছিল, এমনকি একটি ত্রুটিপূর্ণ গণভোট পরিচালনার জন্য সরকার তার নিজস্ব সম্পদ নিয়োজিত করেছিল, আরো বেশি ত্রুটিপূর্ণ একটি সংবিধানের ওপর ভিত্তি করে৷
রপ্তানি-নির্ভর অর্থনীতির গতি মন্থর হয়ে যাওয়া এবং অর্থনৈতিক সংরক্ষণবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সাথে সাথে খাদ্যদ্রব্যের উচ্চ মূল্যের সাথে যোগ হয়েছে লক্ষ লক্ষ অভিবাসী বা বিদেশি কর্মীদের ছাটাই৷ বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের প্রেরিত বৈদেশিক মুদ্রার মোট পরিমাণ হচ্ছে বছরে প্রায় ২০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার - সারা বিশ্বের বৈদেশিক উন্নয়ন সাহায্যের দ্বিগুণ - যা বাংলাদেশ, ফিলিপাইন, কেনিয়া ও মেক্সিকোর মত একরাশ নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশের আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস৷ রেমিটেন্সের পরিমাণ কমে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে এই সব সরকারগুলোর জন্য রাজস্ব কমে যাওয়া এবং পণ্য ও সেবা খাতে ব্যয় করার জন্য নগদ অর্থ কম থাকা৷ তদুপরি, কিছু কিছু দেশে শ্রমিক রপ্তানি কমে যাওয়ার ফলে আরো বেশি আশাহত, ক্রুদ্ধ, তরুণরা তাদের গ্রামের বাড়িগুলোতে অলস বসে আছে আর চরমপন্থী রাজনীতি ও সহিংসতার সহজ শিকারে পরিণত হচ্ছে৷
ইতোমধ্যে, এমনকি শ্রম বাজার সঙ্কুচিত হওয়ার কারণে, অভিবাসী হওয়ার চাপ বৃদ্ধি পাওয়া অব্যাহত রয়েছে, আর গ্রহণকারী দেশগুলো লোকজনকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য আরো বেশি কঠোর পদ্ধতি অবলম্বন করছে৷ ২০০৮-এর জুনে, আমি ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের টেনেরিফে সরকারি গোরস্তান সফর করেছিলাম যেখানকার নামহীন কবরগুলো স্পেনে প্রবেশের জন্য আফ্রিকান অভিবাসীদের ব্যর্থ প্রচেষ্টার নীরব সাক্ষী হয়ে আছে৷ শুধুমাত্র ২০০৮ সালেই, ৬৭,০০০ লোক ইউরোপে পৌঁছানোর জন্য বিপজ্জনকভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেয়, এছাড়াও অজ্ঞাত সংখ্যক ব্যক্তি সাগরে ডুবে মারা যায়৷ যারা পরিচয়ের কাগজপত্র ছাড়া এই ছায়াছন্ন অস্তিত্বকে গ্রহণ করেছে, তারা অন্যের স্বার্থে ব্যবহৃত হওয়ার এবং প্রবঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, এবং ২০০৮ সালের ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)-এর অবৈধ অভিবাসীদেরকে ফেরত পাঠানোর নির্দেশনা অনুযায়ী তাদের মাথার ওপর ঝুলন্ত দীর্ঘ কারাবাসের পর ফেরত পাঠানোর আশঙ্কায় রয়েছে৷
কিছু ইইউ সদস্য দেশ, যেমন স্পেন, অভিবাসীদেরকে ফেরত পাঠানো, অথবা প্রথমেই তাদের দেশত্যাগ বন্ধ করার জন্য আফ্রিকান দেশগুলোর সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে প্রবেশ করেছে৷ মৌরিতানিয়ার মত দেশগুলো এই সব চুক্তিকে তাদের ভূখণ্ডে ব্যাপক সংখ্যক বিদেশিকে নির্বিচারে গ্রেপ্তার, খারাপ অবস্থায় আটক রাখা এবং কোনো আইনী ব্যবস্থা ছাড়াই বিতাড়নের লাইসেন্স হিসেবে দেখে থাকে, যদিও তাদের দেশটি ত্যাগের মনোভাবের কোনো প্রমাণ না থাকে এবং এমনকি অনিয়মিতভাবে মৌরিতানিয়া ত্যাগ করাটা অপরাধ না হলেও৷
যেহেতু আরো বেশি লোক আগের চাইতেও বেশি অনিশ্চিত অবস্থার মুখোমুখি হচ্ছে, সেই জন্য সামাজিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাচ্ছে৷ ২০০৮ সালে জাতি বিদ্বেষী এবং বিদেশিদের প্রতি বিদ্বেষমূলক সহিংসতার একটি নিকৃষ্টতম ঘটনা ঘটেছে মে মাসে দক্ষিণ আফ্রিকায়, যখন ৬০ জন ব্যক্তি নিহত হয়, ৬০০ জন আহত হয় এবং অযুত সংখ্যক লোক বাস্তুচ্যুত হয়, যদিও রাজনৈতিক সহিংসতা ও বঞ্চনা থেকে বাঁচার জন্য আশ্রয়ের সন্ধানে প্রতিবেশী জিম্বাবুয়ে থেকে আরো অযুত সংখ্যক লোক দেশটিতে প্রবেশ করে৷ যদিও আনুষ্ঠানিক তদন্তগুলো আক্রমণের কারণ নির্ণয়ে ব্যর্থ হয়েছে, এটা ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয় যে এগুলো ঘটেছে বিদেশিদের প্রতি বিদ্বেষ এবং চাকরি, বাসস্থান ও সামাজিক পরিষেবার জন্য প্রতিযোগিতা থেকে, যা দুর্নীতির কারণে আরো খারাপের দিকে গিয়েছে৷
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নির্ভর করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর৷ তারপরও সেই সব একই বিশ্বনেতারা যারা বিশ্বের অর্থনৈতিক পুরুদ্ধারের জন্য একত্রে প্রণোদনা প্যাকেজ প্রদানের জন্য হুড়াহুড়ি করছে তারা সারা বিশ্বজুড়ে মারাত্মক সংঘাতগুলোকে অবহেলা করা অব্যাহত রেখেছে যেগুলো মানবাধিকারের ব্যাপক লঙ্ঘনের জন্ম দেয়, দারিদ্র্যকে দৃঢ়ভাবে স্থাপন করে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে৷
অবরোধ ও সামরিক হামলার মাধ্যমে বিধ্বস্ত গাজার অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা অত্যন্ত ভয়াবহ৷ ইসরাইল ও অধিকৃত ফিলিস্তিনী ভূখণ্ডে সংঘাতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া এর সন্নিহিত এলাকা থেকে অনেক দূরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে৷
দারফুর ও সোমালিয়ার সংঘাত ভঙ্গুর বাস্তুসংস্থানের অঞ্চলগুলোতে শেষ হয়ে আসছে যেখানে পানির ওপর বর্ধিত চাপ এবং জনগণকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য খাদ্য সরবরাহের সক্ষমতা হচ্ছে চলমান যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল উভয়ই৷ এগুলো যে ব্যাপক পরমাণ বাস্তুচ্যুতি ঘটিয়েছে তা প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর প্রচুর চাপ তৈরি করেছে, যাদেরকে এখন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের বাড়তি চাপের সাথেও মানিয়ে নিতে হবে৷
মানুষকে নিঃস্ব করা এবং তাদেরকে একটি স্থায়ী সহিংসতার চক্রের ফাঁদে ফেলার জন্য পূর্ব ডিআরসি (গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গো)-তে, লোভ, দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক স্বার্থ আঞ্চলিক শক্তির রাজনীতির সাথে পাল্লা দিয়ে যাচ্ছে৷ বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ একটি দেশ, অর্থনৈতিক মন্দার প্রাক্কালে বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার কারণে এখন পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত অবস্থায় দেখতে পাচ্ছে৷
আফগানিস্তানে, পরিব্যাপক অনিরাপত্তা সেখানে বসবাসরত লোকদের, বিশেষ করে নারী ও মেয়েশিশুদের, খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও স্কুলশিক্ষা লাভের সক্ষমতাকে সীমিত করে রেখেছে৷ এই অনিরাপত্তা প্রতিবেশী পাকিস্তানের সীমান্ত অতিক্রম করে গেছে, যা মানবাধিকারের সুরক্ষা, দারিদ্র্য মোকাবেলা ও যুবদের কর্মহীনতা দূর করার ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতার জন্য এখনই ভূগছে, এবং দেশটিকে চরমপন্থী সহিংসতার নিম্নমুখী আবর্তে নিপতিত করছে৷
অর্থনৈতিক সংকট থেকে যদি আমাদের শেখার একটি বিষয় থাকে তবে তা হচ্ছে আন্তর্জাতিক সীমান্ত আমাদেরকে ক্ষতি থেকে সুরক্ষিত রাখে না৷ বিশ্বের নিকৃষ্টতম সংঘাতগুলো এবং ক্রমবর্ধমান চরমপন্থী সহিংসতার হুমকির সমাধান খোঁজা হচ্ছে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে এর পায়ের ওপর দাঁড়া করানোর বৃহত্তর চিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ৷
মন্দা থেকে নিপীড়ন
অন্যদিকে, আমরা মারাত্মক বিপদের মুখোমুখি হচ্ছি কারণ ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য ও বেপরোয়া অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ব্যাপক সহিংসতার দিকে ধাবিত হতে পারে৷ অন্যদিকে, আমরা এমন একটি পরিস্থিতিতে গিয়ে পড়তে পারি যেখানে অর্থনৈতিক মন্দার সাথে সাথে বৃহত্তর দমন-পীড়নও আসতে পারে কারণ উদ্বিগ্ন সরকারগুলো - বিশেষ করে কর্তৃত্বপরায়ণ সরকারগুলো - ভিন্নমত, সমালোচনা এবং দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থা প্রকাশ করে দেয়ার ওপর কঠোরভাবে দমন অভিযান চালিয়ে থাকে৷
২০০৯ ও পরবর্তীতে যা থাকতে পারতো তার স্বাদ আমরা ২০০৮-এ পেয়েছি৷ খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি ও ভয়াবহ অর্থনৈতিক অবস্থার জন্য যখন মানুষ রাস্তায় নেমেছিল, অনেক দেশে এমনকি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভও কঠোর ব্যবস্থার সম্মুখীন হয়েছিল৷ তিউনিশিয়ায় ধর্মঘট ও বিক্ষোভ শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে থামিয়ে দেয়া হয়, যার ফলে দুইজন মারা যায়, অনেকে আহত হয় এবং অভিযুক্ত সংগঠকদের বিরুদ্ধে ২০০টিরও বেশি মামলা হয়, শেষে কেউ কেউ দীর্ঘ মেয়াদি কারাদণ্ডের সম্মুখীন হয়৷ জিম্বাবুয়েতে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, মানবাধিকার রক্ষাকর্মী ও ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিনিধিদেরকে আক্রমণ, অপহরণ, গ্রেপ্তার ও দায়মুক্তি সহ হত্যা করা হয়৷ ক্যামেরুনে, সহিংস বিক্ষোভের সময় প্রায় ১০০ জন বিক্ষোভকারীকে গুলি করে হত্যা করা হয় এবং আরো অনেককে কারারুদ্ধ করা হয়৷
অর্থনৈতিক চাপ ও রাজনৈতিক উত্তেজনার সময়, সততা ও সহনশীলতার প্রয়োজন যাতে অসন্তোষ ও অতৃপ্তিকে গঠনমূলক আলোচনায় এবং সমাধান সন্ধানের পথে পরিচালনা করা যায়৷ হ্যাঁ, ঠিক এই পরিস্থিতিতেই অনেক দেশে সুশীল সমাজের জন্য স্থান সংকুচিত হয়ে আসছে৷ বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলে মানবাধিকার রক্ষাকর্মী, সাংবাদিক, আইনজীবী, ট্রেড ইউনিয়নের প্রতিনিধি এবং সুশীল সমাজের অন্যান্য নেতৃবৃন্দকে কোনো উপযুক্ত কারণ ছাড়াই হয়রানি, হুমকি প্রদান ও আক্রমণ করা হয়েছে অথবা দায়মুক্তি সহ হত্যা করা হয়েছে৷
গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে কারণ সরকারগুলো তাদের নীতির সমালোচনার শ্বাসরোধ করতে চায়৷ সাংবাদিকরা অনেক দেশে ইতিমধ্যেই যে হুমকিগুলোর সম্মুখীন হচ্ছেন এটি সেগুলোর সাথে যুক্ত হবে৷ সবচেয়ে খারাপ রেকর্ডগুলোর একটি হচ্ছে শ্রীলংকার, সেখানে ২০০৬ সাল থেকে ১৪ জন সাংবাদিক নিহত হয়৷ ইরান ইন্টারনেটে মত প্রকাশের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করেছে এবং মিশর ও সিরিয়া ব্লগারদেরকে কারারুদ্ধ করেছে৷ বেইজিং অলিম্পিকের প্রাক্কালে চীন গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল করেছিল কিন্তু তারপর আবার দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরে গেছে - ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেয়া এবং অন্যান্য ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা৷ নির্বাচনের প্রাক্কালে সমালোচনার ভয়ে মালয়েশীয় সরকার বিরোধীদলীয় দুইটি উল্লেখযোগ্য সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করে৷
খোলা বাজার অপরিহার্যভাবে খোলা সমাজের দিকে ধাবিত হয়নি৷ তেল ও গ্যাসের উচ্চমূল্য থেকে পাওয়া অর্থনৈতিক শক্তির কারণে আত্মবিশ্বাস সঞ্চয়কারী রুশ সরকার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্রমবর্ধমানভাবে একটি জাতীয় ও কর্তৃত্বপরায়ণ অবস্থান গ্রহণ করে এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে রুদ্ধ করার জন্য সক্রিয়ভাবে চেষ্টা করে এবং তাদের সমালোচনাকারীদের ওপর হামলা করে৷ তেলের দাম পড়ে যাওয়া এবং মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধির ফলে রুশ অর্থনীতি সমস্যায় পড়ার কারণে, এবং সামাজিক অসন্তোষ বিস্তৃত হওয়ার ফলে, কর্তৃত্বপরায়ণতার প্রবণতা এমনকি আরো বেশি বেড়ে যেতে পারে৷
যারা চীনের অফিসিয়াল নীতি ও অনুশীলনের সমালোচনা করে, চীন তাদের ওপর দমন-পীড়ন অব্যাহত রেখেছে৷ এর ফল হচ্ছে যতক্ষণ পর্যন্ত স্ক্যাণ্ডালকে আর চাপা দিয়ে রাখা সম্ভব হয় না এবং অনেক ক্ষতি হয়ে যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত অফিসিয়াল দুর্নীতি ও কর্পোরেট অব্যবস্থাপনার মোকাবেলা করা হয় না, যা দেখা গেছে কয়েক বছর আগে সার্স/বার্ড ফ্লু আতঙ্ক অথবা এইচআইভি/এইডস মড়কের সময় অথবা অতি সম্প্রতি গুঁড়াদুধে মেলামাইনের স্ক্যাণ্ডালের ক্ষেত্রে৷ চীন সরকার দুর্নীতির দায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়া উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে কিন্তু চীনের কর্পোরেট বা অফিসিয়াল আচরণে পরিবর্তন করার জন্য কিছুই করেনি বা সামান্যই ব্যবস্থা নিয়েছে৷
দায়বদ্ধতার দাবি জানানোর ক্ষমতাসম্পন্ন একটি জ্ঞাত নাগরিক সমাজ আরো ভালোভাবে নিশ্চিত করতে পারে যে সরকার ও কোম্পানিগুলো ভালোভাবে তাদের কাজ করবে৷ সরকারগুলো যখন অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য চেষ্টা করছে, তখন স্বাধীনতা হচ্ছে উদ্বুদ্ধ করার মত একটি সম্পদ, দমন করার মত নয়৷
নতুন ধরনের নেতৃত্ব
বঞ্চনা, অসাম্য, অবিচার, নিরাপত্তাহীনতা ও দমন-পীড়ন হচ্ছে দারিদ্রের বৈশিষ্ট্য৷ এগুলো হচ্ছে সুস্পষ্টভাবে মানবাধিকারের সমস্যা এবং কেবলমাত্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে এগুলোর সমাধান করা সম্ভব হবে না৷ এগুলোর জন্য দরকার হচ্ছে দৃঢ় রাজনৈতিক ইচ্ছা এবং মানবাধিকার ও আইনের শাসনের কাঠামোর মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত বিষয়গুলোকে সমন্বয়কারী একটি সামগ্রিক প্রতিক্রিয়া৷ এগুলোর জন্য দরকার হচ্ছে সমন্বিত কার্যক্রম ও নতুন ধরনের নেতৃত্ব৷
অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন ভূ-রাজনৈতিক ক্ষমতায় একটি পরিবর্তন এনেছে এবং নতুন প্রজন্মের কিছু দেশ, জি-২০ হিসেবে, বিশ্বনেতৃত্বের দায়িত্ব দাবি করছে৷ চীন, ভারত, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা ও দক্ষিণের উদীয়মান অর্থনীতিগুলো এবং সেইসাথে রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমের নেতৃস্থানীয় অর্থনীতিগুলোকে নিয়ে গঠিত, জি-২০ রাজনৈতিক শক্তির আরো সঠিক প্রতিনিধিত্ব এবং আজকের বিশ্বের অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেকে দাবি করে৷ এটা সত্য হতে পারে, কিন্তু সত্যিকারঅর্থে বিশ্বনেতৃত্ব হওয়ার জন্য, জি-২০ কে অবশ্যই বৈশ্বিক মূল্যবোধকে গ্রহণ করতে হবে এবং মানবাধিকার সম্পর্কিত তাদের নিজেদের নিষ্প্রভ রেকর্ড ও দ্বৈত নীতির মোকাবেলা করতে হবে৷
এটা সত্য যে, জর্জ ডব্ল্যু. বুশের প্রশাসনের তুলনায় নতুন মার্কিন সরকার মানবাধিকারের ক্ষেত্রে একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ অনুসরণ করছে৷
এক বছরের মধ্যে গুয়ান্তানামো বন্দীশিবির বন্ধ করে দেয়ার জন্য, ক্ষমতা গ্রহণের ৪৮ ঘন্টার মধ্যে, প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সিদ্ধান্ত, দ্ব্যর্থহীনভাবে নির্যাতনের নিন্দা করে এবং সিআইএ-এর গোপনে আটক রাখার অবসান ছিল প্রশংসনীয়, একইভাবে প্রশংসনীয় ছিল জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন করার ক্ষেত্রে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত৷ তবে, মানবাধিকারকে সমর্থন করার জন্য প্রশাসন ইসরাইল ও চীনের মত দেশগুলোকে একই রকম অকপটে ও দৃঢ়তার সাথে বলবে কিনা - যা এটি ইরান ও সুদানের মত দেশগুলোকে বলে থাকে - তা বলার সময় এখনো আসেনি৷
মানবাধিকার প্রশ্নে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিশ্রুতি উভয়মুখী রয়ে গেছে৷ যদিও মৃত্যুদণ্ড, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার রক্ষাকর্মীদের সুরক্ষার মত কিছু বিষয়ে ইইউ কঠোর, কিন্তু ইইউ-এর অনেক সদস্য রাষ্ট্র শরণার্থীদের সুরক্ষা এবং জাতিগত বৈষম্যমূলক আচরণ ও তাদের সীমান্তের মধ্যে বৈষম্য অথবা সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীদেরকে সিআইএ-এর হাতে বিশেষ উদ্দেশ্যে হস্তান্তরের বিষয়টি স্বীকার করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী চলতে বিশেষ ইচ্ছুক নয়৷
ব্রাজিল ও মেক্সিকো আন্তর্জাতিকভাবে মানবাধিকারের দৃঢ় সমর্থক কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে যে বিষয়ে তারা বহির্বিশ্বে প্রচারণা চালিয়ে থাকে তা তাদের নিজেদের সীমান্তের মধ্যে অনুশীলন করতে প্রায়ই ব্যর্থ হয়৷ রাজনৈতিক নিপীড়ন ও নির্বাচনে কারচুপি অবসানের জন্য জিম্বাবুয়ে সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপের সামনে দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রমাগতভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে৷ সৌদি আরব বিচার ছাড়াই হাজার হাজার সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীকে আটক রাখে, রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদেরকে কারারুদ্ধ করে রাখে, এবং পরিযায়ী কর্মী ও নারীদের অধিকারকে গুরুতরভাবে সীমাবদ্ধ রাখে৷ চীনের অপরাধ বিচার পদ্ধতি ব্যাপকভাবে ত্রুটিযুক্ত, সমালোচনার কন্ঠরোধ করার জন্য শাস্তিমূলকভাবে প্রশাসনিক আটকাদেশ ব্যবহার করে থাকে এবং এটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারী দেশ৷ রুশ সরকার বিনা বিচারে অনির্দিষ্টকাল আটক রাখা, নির্যাতন ও অন্যান্য দুর্ব্যবহার অনুমোদন করেছে, এবং রাশিয়ার উত্তরের ককেশীয় অঞ্চলে দায়মুক্তি সহ বিচারবহির্ভুত হত্যাকাণ্ডের বিস্তারে সাহায্য করেছে, এবং যারা এর সমালোচনা করার সাহস দেখায় তাদেরকে হুমকি দিয়ে থাকে৷
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মানবাধিকারের যে সব আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের প্রতি একমত হয়েছে সেগুলো প্রবর্ধনের জন্য জি-২০ সরকারগুলোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে৷ অন্যথায়, তারা নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা ও বৈধতা এবং সেইসাথে কার্যকারিতা হারাবে৷ জি-২০ এর লক্ষ্য হচ্ছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট থেকে বের হয়ে আসার একটা উপায় বের করা৷ তারা আরো দাবি করে যে তাদের প্রচেষ্টা দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাসরত ব্যক্তিদের জন্য সুফল বয়ে আনবে৷ কিন্তু অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার যদি মানবাধিকারের ওপর দৃঢ়ভাবে অভিনিবেশ না করে তাহলে এটি টেকসইও হবে না আবার ন্যায়সঙ্গতও হবে না৷
বিশ্বের সর্বোচ্চ অবস্থানে আসীনদের অবশ্য কর্তব্য হচ্ছে তাদের নিজেদের আচরণের মাধ্যমে উদাহরণ স্থাপন করা৷ জি-২০ সদস্যদের জন্য একটি ভালো শুরু হবে একটি সুস্পষ্ট সংকেত পাঠানো যে সকল ধরনের মানবাধিকার, অর্থনৈতিক, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক অধিকার, রাজনৈতিক বা নাগরিক অধিকার, সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ৷ যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারের বৈধতাকে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং এটি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের আন্তর্জাতিক চুক্তির (ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট অন ইকোনমিক, সোস্যাল অ্যান্ড কালচারাল রাইটস, আইসিইএসসিআর) কোনো রাষ্ট্রপক্ষ নয়৷ চীন, অন্যদিকে, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির (ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস, আইসিসিপিআর) কোনো রাষ্ট্রপক্ষ নয়৷ এই দুইটি দেশ অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট চুক্তি অনুমোদন করা উচিত৷ ২০০৮-এর ডিসেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ কর্তৃক গৃহীত অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের আন্তর্জাতিক চুক্তির ঐচ্ছিক প্রটোকল সকল জি-২০ সদস্যের অনুমোদন করা উচিত৷ তবে, আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষর করাটা, যা করা উচিত তার কেবলমাত্র একটি ধাপ৷
পরিবর্তনের জন্য নতুন সুযোগ
বৈশ্বিক দারিদ্র্য - অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে আরো খারাপ হওয়া - মানবাধিকারের পরিবর্তনের জন্য একটি জ্বলন্ত মঞ্চ তৈরি করেছে৷ একই সময়ে, অর্থনৈতিক সংকট একটি উদাহরণ সৃষ্টি করেছে যা পদ্ধতিগত পরিবর্তনের জন্য সুযোগ তৈরি করেছে৷
গত দুই দশক ধরে, দেশগুলো বাজারের পক্ষে তাদের মানবাধিকারের বাধ্যবাধকতাগুলো প্রত্যাহার অথবা নবায়ন করছে এই বিশ্বাসে যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সর্বাঙ্গীন উন্নতি ঘটাবে৷ জোয়ার নেমে যাওয়া এবং নৌকার ফুটা দেখা যাওয়ার সাথে সাথে, সরকারগুলো তাদের অবস্থান আমূল পরিবর্তন করছে এবং একটি নতুন অর্থনৈতিক অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির বিষয়ে কথা বলছে যেখানে রাষ্ট্রগুলো একটি বলিষ্ঠতর ভূমিকা রাখবে৷ তা রাষ্ট্রকে সামাজিক পরিমণ্ডল থেকে পিছিয়ে যাওয়া থেকে বিরত রাখা এবং আরো বেশি মানবাধিকার-বান্ধব রাষ্ট্রের মডেল পুনরায় পরিকল্পনা করার জন্য একটি সুযোগও তৈরি করবে, যা গত ২০ বছর ধরে আন্তর্জাতিক নীতি-নির্ধারণের বৈশিষ্ট্য চিহ্নিতকারী মডেল থেকে ভিন্ন হবে৷ এটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার সহ মানবাধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, এর সুরক্ষা ও এটি পরিপূরণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা সম্পর্কে পুনরায় চিন্তা করার মৌলিক সুযোগ তৈরি করবে৷
সরকারগুলো অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য যতটা নিবেদিতভাবে বিনিয়োগ করছে, মানবাধিকারের জন্যও ততটা নিবেদিতভাবে বিনিয়োগ করা উচিত৷ তাদের উচিত স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সুযোগগুলো বিস্তৃত করা ও এতে সমর্থন দেয়া; বৈষম্যের অবসান ঘটানো; নারীদের ক্ষমতায়ন করা; মানবাধিকারের অপব্যবহারের জন্য সংস্থাগুলোকে দায়বদ্ধ রাখার জন্য সর্বজনীন মানদণ্ড ও কার্যকর পদ্ধতি স্থাপন করা; উন্মুক্ত সমাজ গঠন করা যেখানে আইনের প্রতি শাসনকে সম্মান করা হয়, শক্তিশালী সামাজিক বন্ধন থাকে, দুর্নীতি নির্মূল করা হয় এবং সরকারগুলোকে দায়বদ্ধ রাখা যায়৷ অর্থনৈতিক সংকট ধনী দেশগুলোর জন্য তাদের উন্নয়ন সহায়তা কমানোর একটি অজুহাত হওয়া উচিত নয়৷ এখন অর্থনৈতিক মন্দার সময় দরিদ্রতম কিছু দেশকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পয়ঃনিষ্কাশন ও গৃহায়নের ক্ষেত্রে সাহায্য করার জন্য আন্তর্জাতিক সাহায্য এমনকি আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ৷
এছাড়াও মারাত্মক সংঘাতগুলোর সমাধান করার জন্য সরকারগুলোর একত্রে কাজ করা উচিত৷ এই আন্তঃসম্পর্কের কারণে, একটি সংকটের দিকে দৃষ্টি দেয়ার জন্য আরেকটিকে অবহেলা করাটা উভয় সংকটের অবনতি ঘটানোর জন্য একটা নিশ্চিত ব্যবস্থা৷
মানবাধিকারকে শক্তিশালী করার জন্য সরকারগুলো কি এই সুযোগগুলো লুফে নেবে? কর্পোরেট কুশীলব এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কি তাদের মানবাধিকারের দায়বদ্ধতাগুলো গ্রহণ ও পরিপূরণ করবে? এখন পর্যন্ত, কারণ নির্ণয়ের সময়ে অথবা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রস্তাবিত ব্যবস্থাপত্রে মানবাধিকারকে খুব সামান্যই বিবেচনায় আনা হয়েছে৷
ইতিহাসে দেখা যায় যে মহান পরিবর্তনের জন্য অধিকাংশ সংগ্রামগুলো - যেমন দাসপ্রথার উচ্ছেদ অথবা নারীমুক্তি - রাষ্ট্রের উদ্যোগ হিসেবে শুরু হয়নি বরং সাধারণ মানুষের প্রচেষ্টা হিসেবে শুরু হয়েছিল৷ আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা বা অস্ত্র বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ বা মৃত্যুদণ্ড বিলোপ বা নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে লড়াই করা অথবা আন্তর্জাতিক আলোচ্যসূচিতে বৈশ্বিক দারিদ্র্য ও জলবায়ুর পরিবর্তন অন্তর্ভুক্ত করায় সাফল্যের মূল কারণ হচ্ছে সারাবিশ্বের লক্ষ লক্ষ সক্রিয় কর্মীর শক্তি, সৃজনশীলতা ও অধ্যবসায়৷
আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রতি চাপ সৃষ্টি করার জন্য এখন আমাদেরকে অবশ্যই জনগণের শক্তির দিকে মুখ ফেরাতে হবে৷ এই কারণেই, স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অনেক অংশীদারের সাথে একত্রে, এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ২০০৯ সালে একটি নতুন প্রচারাভিযান শুরু করছে৷ “মর্যাদার দাবি জানান” ব্যানারের অধীনে, দারিদ্র্যকে জিইয়ে রাখা ও গভীরতর করার জন্য দায়ী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কুশীলবদের মানবাধিকারের অপব্যবহারের দায়বদ্ধতার দাবি জানানোর জন্য আমরা জনগণকে সমবেত করবো৷ আমরা বৈষম্যময় আইন, নীতি ও অনুশীলনগুলোকে চ্যালেঞ্জ করবো এবং সেই সকল বিষয়গুলোকে পরাভূত করার জন্য বলিষ্ঠ ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানাবো যেগুলো মানুষকে নিঃস্ব করে ও দরিদ্র রাখে৷ আমরা দারিদ্র্যের অবসান ঘটানোর জন্য দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাসকারী মানুষদের কন্ঠকে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে তুলে আনবো এবং তাদের জীবনকে প্রভাবিত করে এমন সিদ্ধান্তগুলোতে তাদেরকে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের অনুমতি দেয়ার জন্য সনির্বন্ধভাবে আহ্বান জানাবো৷
প্রায় ৫০ বছর আগে, বিবেকের বন্দীদের মুক্তির দাবি জানানোর জন্য এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল প্রতিষ্ঠা করা হয়৷ আজ আমরা দারিদ্র্যের বন্দীদের জন্যও “মর্যাদার দাবি জানাই” যাতে তারা নিজেরাই নিজেদের জীবন পরিবর্তন করতে পারেন৷ আমি নিশ্চিত যে সারা বিশ্বজুড়ে আমাদের লক্ষ লক্ষ সদস্য, সমর্থক ও অংশীদারদের সাহায্য ও সমর্থনের মাধ্যমে আমরা সফল হবো৷
আমরা দারিদ্র্যের বন্দীদের জন্যও “মর্যাদার দাবি জানাই” যাতে তারা নিজেরাই নিজেদের জীবন পরিবর্তন করতে পারেন৷
আইরিন খান
২০০৮-এর সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলস্, এমডিজি), ২০১৫ সালের মধ্যে দারিদ্র্য হ্রাসের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে সম্মত লক্ষ্যমাত্রা সম্পর্কিত উচ্চ-পর্যায়ের বৈঠকে অংশগ্রহণ করার জন্য আমি নিউ ইয়র্কে ছিলাম৷ ক্ষুধা নির্মূল করা, নবজাত শিশু ও গর্ভবর্তী নারীদের প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু কমানো, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা, ও মেয়েশিশুদেরকে শিক্ষিত করে তোলার জন্য আরো তহবিলের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে প্রতিনিধির পর প্রতিনিধি বক্তব্য দিয়েছেন৷ কোটি কোটি লোকের জীবন ও মর্যাদা ঝুঁকির সম্মুখীন ছিল, কিন্তু মুখের কথাকে টাকার মাধ্যমে সমর্থন দেয়ার ইচ্ছা অত্যন্ত সীমিত ছিল৷ আমি জাতিসংঘ ভবনটি ছেড়ে বের হয়ে আসার পর দেখতে পাই যে ম্যানহাটানের অন্য একটি অংশ থেকে একেবারেই ভিন্ন একটি কাহিনী প্রকাশিত হচ্ছিলঃ ওয়াল স্ট্রিটের বৃহত্তম একটি বিনিয়োগ ব্যাংকের পতন৷ এটা ছিল একটা কার্যকর সংকেত যে বিশ্বের মনোযোগ ও সম্পদ আসলে কোথায় নিবদ্ধ ছিল৷ দারিদ্র্য নিরসনের জন্য যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন ছিল, ধনী ও ক্ষমতাবান সরকারগুলো হঠাৎ করে তারচেয়ে অনেকগুণ বেশি অর্থের খোঁজ পেতে সক্ষম হয়েছিল৷ তারা সেগুলো ধ্বসে পড়া ব্যাংকে এবং অর্থনীতির জন্য উদ্দীপক প্যাকেজ হিসেবে ব্যাপক পরিমাণে ঢেলেছিল, এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে বছরের পর বছর ধরে অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলতে দেয়া হয়েছিল আর এখন এগুলো স্থবির হয়ে গেছে৷
২০০৮ শেষ হওয়ার আগে, এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে আমাদের বঞ্চনা ও অতিলোভের দুই-স্তর বিশিষ্ট বিশ্ব - অল্প কিছু লোকের লালসা মেটানোর জন্য বহুলোককে নিঃস্ব করা - একটি সুগভীর গহবরে তলিয়ে যাচ্ছিল৷
জলবায়ু পরিবর্তন সহ, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার ক্ষেত্রেওঃ অধিকাংশ ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডের জন্য ধনীরা দায়ী হলেও, গরীবরাই সবচেয়ে খারাপভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়৷ যদিও মন্দার তীক্ষ্ণ দাঁত থেকে কেউই রেহাই পায়নি, দরিদ্র দেশগুলো থেকে বিপর্যয়ের যে খবর আসছে সেই তুলনায় ধনী দেশগুলোর দুর্দশা কিছুই নয়৷ চীনের পরিযায়ী কর্মী থেকে শুরু করে গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোর (ডিআরসি) কাতাঙ্গার খনি শ্রমিক পর্যন্ত, যারা নিজেদেরকে দারিদ্র্য থেকে টেনে বের করে আনার জন্য বেপরোয়া হয়ে চেষ্টা করছে, তারা ধকলটা তীব্রভাবে বুঝতে পারছে৷ বিশ্বব্যাংক অনুমান করছে যে এই বছর আরো ৫.৩ কোটি মানুষ দারিদ্র্যে নিপতিত হবে, এটা গত বছর খাদ্য সংকটে নিপতিত ১৫ কোটি মানুষের সাথে যোগ হবে, যা গত দশকে অর্জিত সাফল্যকে মুছে ফেলবে৷ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্য অনুযায়ী ১.৮ থেকে ৫.১ কোটি মানুষ তাদের চাকরি হারাতে পারে৷ খাদ্যদ্রব্যের অত্যধিক মূল্যবৃদ্ধি আরো বেশি ক্ষুধা ও রোগ বয়ে আনছে, জোরপূর্বক গণ উচ্ছেদ ও বন্ধকী সম্পত্তির দখলগ্রহণ আরো বেশি গৃহহীনতা ও দুর্গতি বয়ে আনছে৷
সাম্প্রতিক বছরগুলোর অপব্যয়ীতা মানবাধিকারের ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে তা অনুমান করার জন্য এখনো সময় আসেনি, তবে এটা স্পষ্ট যে মানবাধিকারের ক্ষতি এবং অর্থনৈতিক সংকটের পরিণতি সুদীর্ঘ ছায়া ফেলবে৷ এটাও স্পষ্ট যে, সরকার কেবল বাজারের শক্তির কাছে অর্থনৈতিক ও আর্থিক বিধি-বিধানকে ছেড়ে দিয়েছে তাই নয়, তারা মানবাধিকার, জীবন ও জীবিকাকে রক্ষা করতে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে৷
কোটি কোটি লোক নিরাপত্তাহীনতা, অবিচার ও মর্যাদাহীনতায় ভুগছে৷ এটা মানবাধিকারের সংকট৷
এই সংকট হচ্ছে খাদ্য, চাকরি, বিশুদ্ধ পানি, ভূমি ও গৃহায়ন সম্পর্কিত এবং সেইসাথে বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতা, বিদেশিদের প্রতি ঘৃণা ও জাতিগত বৈষম্যমূলক আচরণ, সহিংসতা ও নিপীড়ন সম্পর্কিত৷ একত্রে এগুলো একটি বৈশ্বিক সংকট সৃষ্টি করে যার জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের ভিত্তিতে বৈশ্বিক সমাধান প্রয়োজন৷ দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ক্ষমতাবান সরকারগুলো তাদের নিজেদের দেশে আর্থিক ও অর্থনৈতিক পরিণতির ওপর অন্তর্মুখী সঙ্কীর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ করছে আর বিস্তৃত বিশ্ব সংকটকে উপেক্ষা করছে৷ অথবা, যদি তারা আন্তর্জাতিক কার্যক্রমের বিষয়টি বিবেচনা করে, তারা এটিকে শুধু আর্থিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ রাখছে, আর তাই অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি করছে৷
বিশ্বের একটি ভিন্ন ধরনের নেতৃত্ব, একটি ভিন্ন ধরনের রাজনীতি এবং সেইসাথে একটি ভিন্ন ধরনের অর্থনীতি দরকার - এমন কিছু যা সবার জন্য কাজ করবে এবং পক্ষপাতমূলকভাবে কেবলমাত্র কয়েকজনের জন্য নয়৷ আমাদের এমন ধরনের নেতৃত্ব দরকার যা রাষ্ট্রগুলোকে সঙ্কীর্ণ জাতীয় স্বার্থ থেকে বহুজাতিক সহযোগিতার পথে নিয়ে যাবে, যাতে করে সমাধানগুলো হবে সামগ্রিক, সমন্বিত, টেকসই ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল৷ একেবারেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে আর্থিক সমৃদ্ধির প্রত্যাশায় সরকার ও সংস্থাগুলোর মধ্যে গড়ে ওঠা মৈত্রী অবশ্যই বিচ্ছিন্ন করতে হবে৷ সুবিধাভোগীদের মৈত্রী, যা নিপীড়নকারী সরকারগুলোকে দায়বদ্ধতা থেকে রক্ষা করে, অবশ্যই বন্ধ করতে হবে৷
অসাম্যের অনেক রূপ
অনেক বিশেষজ্ঞ সেই সব লক্ষ লক্ষ লোকের দিকে ইঙ্গিত করেন যাদেরকে অর্থনৈতিক উন্নতির মাধ্যমে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা হয়েছে, কিন্তু সত্য ঘটনা হচ্ছে আরো অনেক লোক পিছনে পড়ে রয়েছে, সাফল্য অনেক বেশি ভঙ্গুর ছিল - যা সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংকটে দেখা গেছে - আর মানবাধিকারের ক্ষতি হয়েছে অনেক বেশি৷ অনিয়ন্ত্রিত বিশ্বায়নের যাঁতাকল বিশ্বকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উন্নতির উন্মত্ততায় ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ার ফলে, মানবাধিকারকে প্রায়ই পিছনের আসনে নিয়ন্ত্রিত রাখা হয়৷ পরিণতি ছিল স্পষ্টঃ ক্রমবর্ধমান অসাম্য, বঞ্চনা, বিতাড়ন ও নিরাপত্তাহীনতা; ধৃষ্টতা ও দায়মুক্তি সহ নিপীড়িতদের বিরুদ্ধে কথা বলা মানুষের কন্ঠ; এবং নির্যাতনের জন্য যারা দায়ী - সরকার, বড় ব্যবসায়ী ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ - ছিল মূলতঃ অননুতপ্ত ও দায়বদ্ধতাহীন৷ মারাত্মক সংঘাতের কারণে ইতিপূর্বে বিদ্যমান বৈশ্বিক নিরাপত্তাহীনতার সাথে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতার ক্রমবর্ধমান চিহ্ন দেখা যাচ্ছে, যেগুলোর সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অক্ষম বা অনিচ্ছুক বলে মনে হয়৷ অন্য কথায়ঃ আমরা অসাম্য, অবিচার ও নিরাপত্তাহীনতার এক বারুদের পিপার ওপর বসে আছি, এবং এটি বিস্ফোরিত হতে যাচ্ছে৷
আফ্রিকার অনেক জায়গায় টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সত্ত্বেও, লক্ষ লক্ষ লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়ে গেছে, তাদের মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য সংগ্রাম করছে৷ সম্ভবত ল্যাটিন আমেরিকাই বিশ্বের সবচেয়ে অসম অঞ্চল, তাদের জাতীয় অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হওয়া সত্ত্বেও গ্রামীণ ও শহুরে এলাকাগুলোতে আদিবাসী ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোকে তাদের স্বাস্থ্যসেবা, বিশুদ্ধ পানি, শিক্ষা ও পর্যাপ্ত বাসস্থানের অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হচ্ছে৷ ভারত এশিয়ার বৃহৎ শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে কিন্তু এখনো তার শহুরে গরীব জনগোষ্ঠী ও গ্রামীণ এলাকাগুলোর প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোর প্রতি বঞ্চনা দূর করতে পারেনি, অন্যদিকে চীনে গ্রামীণ ও পরিযায়ী কর্মীদের এবং ধনী শহুরে শ্রেণির মধ্যকার দূরত্ব আরো বেশি প্রকট হচ্ছে৷
এখন বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ শহরে বসবাস করে এবং তাদের মধ্যে, একশ কোটিরও বেশি মানুষ বস্তিতে বসবাস করে৷ অন্যভাবে বলা যায়, শহরের অধিবাসীদের প্রতি তিনজনে একজন অপর্যাপ্ত বাসস্থানে বসবাস করে যেখানে মৌলিক পরিষেবাগুলো হয় নেই অথবা খুব সামান্য পরিমাণে রয়েছে, এবং সেখানে নিরাপত্তাহীনতা, সহিংসতা ও জোরপূর্বক উচ্ছেদের ঝুঁকি প্রতিদিনই থাকে৷ কেনিয়ার নাইরোবির শতকরা ষাটভাগ মানুষ বস্তিতে বসবাস করে - যার মধ্যে ১০ লক্ষ বাস করে কিবেরাতে, যা আফ্রিকার সবচেয়ে বড় বস্তি৷ আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে, জমি নিয়ে বিরোধ, জমি দখল, এবং কৃষি-ভিত্তিক শিল্প ও নগর পুনঃউন্নয়ন প্রকল্পের কারণে প্রায় ১৫০,০০০ কম্বোডিয়ান বলপূর্বক উচ্ছেদের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে৷
বিশ্বায়নের একটি উপজাত হিসেবে অসাম্য শুধু উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বসবাসরতদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না৷ অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, ওইসিডি)-এর অক্টোবর ২০০৮-এর প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে যে, শিল্পোন্নত দেশগুলোতেও “সাম্প্রতিক দশকের অর্থনৈতিক উন্নয়ন দরিদ্রদের চেয়ে ধনীদেরকে বেশি লাভবান করেছে৷” যুক্তরাষ্ট্র, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ, দারিদ্র্যকে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত করা এবং ক্রমবর্ধমান আয় বৈষম্যের জন্য ৩০টি ওইসিডি রাষ্ট্রের মধ্যে ২৭তম অবস্থানে এসেছে৷
নোংরা সত্য হচ্ছে এই যে, ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোর বস্তি এলাকাগুলোর শহুরে দরিদ্র থেকে শুরু করে ইউরোপীয় দেশগুলোর রোমা সম্প্রদায় পর্যন্ত, অনেক মানুষ গরীব হওয়ার কারণ হচ্ছে ব্যবসায়ী বা বেসরকারি খাতের সাথে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে রাষ্ট্রের বৈষম্য, প্রান্তিকতা ও বাধাদান সম্পর্কিত প্রকাশ্য ও গোপন নীতি, অথবা এগুলো না দেখার ভান করা৷ এটা কোনো আকস্মিক যোগাযোগ নয় যে বিশ্বের অনেক দরিদ্রই হচ্ছে নারী, অভিবাসী, জাতিগত বা ধর্মীয় সংখ্যালঘু৷ এটা কোনো দৈবাৎ ঘটনা নয় যে আমাদের সময়ে মাতৃত্বকালীন মৃত্যুর হার, মৃত্যুর একটি সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হিসেবে রয়ে গেছে, যদিও জরুরি প্রসূতি সেবায় যৎসামান্য খরচ সন্তান জন্মদানের বয়সী লক্ষ লক্ষ নারীর জীবন রক্ষা করতে পারে৷
মানুষকে তাদের জমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে বঞ্চিত রাখা এবং নিঃস্ব করার জন্য ব্যবসায়ী ও রাষ্ট্রের মধ্যকার ষড়যন্ত্রের একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ হচ্ছে আদিবাসী সম্প্রদায়ের বিষয়টি৷ বলিভিয়ার চাকো অঞ্চলে আদিবাসী গুয়ারানি পরিবারগুলোর অনেকেই এমন একটি পরিস্থিতিতে বসবাস করছে যাকে মানবাধিকার সম্পর্কিত আন্তঃআমেরিকান কমিশন বন্দীদশার অবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা দাসত্বের অনুরূপ৷ ২০০৮-এর অগাস্টে ব্রাজিলে তার সফরের পর, আদিবাসী জনগণ বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি সেই দেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য “নীতি নির্ধারণ, সেবা প্রদান, ও বিচার প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান বৈষম্যের” সমালোচনা করেছেন৷
বিচার প্রক্রিয়ার নিজের মধ্যেই বৈষম্য বিদ্যমান৷ বাজার অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা এবং বিদেশি ব্যবসা ও বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার প্রচেষ্টায়, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ অনেকগুলো উন্নয়নশীল দেশের বাণিজ্যিক খাতে আইনী সংস্কারের জন্য তহবিল প্রদান করেছে৷ কিন্তু সরকার ও কোম্পানীগুলো কর্তৃক নিয়মনীতি লঙ্ঘনের জন্য দরিদ্র জনগণ যাতে আদালতের মাধ্যমে তাদের অধিকার প্রয়োগ করতে পারে ও ক্ষতিপূরণ চাইতে পারে তা নিশ্চিত করতে কোনো তুলনীয় প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়নি৷ দরিদ্রদের জন্য আইনী ক্ষমতায়ন বিষয়ক জাতিসংঘ কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের অর্থবহভাবে বিচার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই৷
নিরাপত্তাহীনতার অনেক রূপ
দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাসরত এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে কারণ অর্থনৈতিক মন্দার পরিবেশে কিছু বিষয় একসাথে চলে আসে৷
প্রথমত, এক দশক আগে পর্যন্ত, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (ইন্টারন্যাশনাল মনেটারি ফাণ্ড, আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের নেতৃত্বে কাঠামোগত উপযোজনের নীতিমালা, উন্নয়নশীল ও উন্নত উভয় প্রকার দেশগুলোতে সামাজিক নিরাপত্তা জালকে ছিন্ন-বিছিন্ন করে ফেলেছে৷ কাঠামোগত উপযোজন নীতিমালাসমূহ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে এমন অবস্থা তৈরির জন্য পরিকল্পনা করেছিল যা একটি বাজার অর্থনীতিকে সমর্থন করবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য জাতীয় বাজারকে উন্মুক্ত করবে৷ এটি এমন একটি ন্যূনতম অবস্থা সৃষ্টির দিকে ধাবিত হয় যাতে সরকারগুলো বাজারের পক্ষে তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার করে৷ অর্থনৈতিক উদারীকরণের আহ্বানের পাশাপাশি, কাঠামোগত উপযোজন নীতিমালাগুলোও সরকারি সেবাগুলোকে বেসরকারি করা, শ্রমিক সংগঠনগুলোকে নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা, এবং সামাজিক নিরাপত্তা জালগুলোকে ছিন্ন করার জন্য চাপ দেয়৷ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মত ক্ষেত্রগুলোতে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ কর্তৃক ব্যবহারকারীর ফি প্রবর্তনের ফলে অনেক ক্ষেত্রেই এই সেবাগুলো দরিদ্রতমদের আওতার বাইরে চলে যায়৷ এখন, অর্থনীতির টলটলায়মান অবস্থায় এবং বেকারত্ব বৃদ্ধির সাথে সাথে, অনেক বেশি সংখ্যক ব্যক্তি শুধু যে আয় হারানোর সম্মুখীন হয়েছে তাই নয়, বরং সেইসাথে তারা সামজিক নিরাপত্তাও হারিয়েছে যেখানে কঠিন সময়ে তাদেরকে সাহায্য করার জন্য কোনো নিরাপত্তা জাল নেই৷
দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা, এর গুরুতর অবস্থা সত্ত্বেও, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে অপর্যাপ্ত মনোযোগ পাচ্ছে৷ খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১০০ কোটি মানুষ ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে ভুগছে৷ কৃষিতে কয়েক দশক ধরে কম বিনিয়োগের কারণে খাদ্য স্বল্পতা; ডাম্পিংকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য বাণিজ্য নীতিমালা এবং এর ফলে স্থানীয় কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতি; জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্রমবর্ধমানভাব পানির অভাব ও ভূমির ক্ষয়, জনসংখ্যার চাপ বৃদ্ধি; জ্বালানীর মূল্যবৃদ্ধি এবং জৈব জ্বালানীর ওপর চাপ বাড়ার কারণে, অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ক্ষুধা বৃদ্ধি পেয়েছে৷
অনেক জায়গায় খাদ্য সংকট আরো গুরুতর হয়েছে বৈষম্য ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে খাদ্য বিতরণ, অত্যন্ত-প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তার পথে বাধা সৃষ্টি, নিরাপত্তাহীনতা ও সশস্ত্র সংঘাতের কারণে, যা কৃষির সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দেয় অথবা খাদ্য উৎপাদন বা খাদ্য ক্রয়ের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ লাভের সুযোগ প্রদানে বাধা সৃষ্টি করে৷ জিম্বাবুয়েতে, ২০০৮ সালের শেষদিকে যখন পঞ্চাশ লক্ষ লোকের খাদ্য সহায়তার প্রয়োজন ছিল, তখন সরকার খাদ্যকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে৷ উত্তর কোরিয়ায়, কর্তৃপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে খাদ্য সহায়তা নিয়ন্ত্রিত রাখে যাতে জনগণকে নিপীড়িত ও ক্ষুধার্ত রাখা যায়৷ সুদানী সশস্ত্র বাহিনী ও সরকার-সমর্থিত জানজাউইদ মিলিশিয়াদের বিদ্রোহ দমনের “পোড়ামাটি নীতি” দারফুরের জনগণের জীবিকা এবং সেইসাথে জীবন ধ্বংস করেছে৷ উত্তর শ্রীলংকায় সংঘাতে আটকা পড়া বাস্তুচ্যুত বেসামরিক জনগণ খাদ্য ও অন্যান্য মানবিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত ছিল কারণ এলটিটিই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো লোকজনকে চলে যেতে দিতে চায়নি এবং শ্রীলংকার সশস্ত্র বাহিনী সাহায্য সংস্থাগুলোকে প্রবেশের পূর্ণ অনুমতি দেয়নি৷ ২০০৮ সালে খাদ্যের অধিকার প্রত্যাখ্যান করার সবচেয়ে জঘন্য ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছিল সম্ভবত মিয়ানমারে যখন কর্তৃপক্ষ তিন সপ্তাহ ধরে ঘূর্ণিঝড় নার্গিসে আক্রান্ত ২৪ লক্ষ বেঁচে যাওয়া মানুষের একান্ত প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক সাহায্য অনুমোদন করতে অস্বীকার করেছিল, এমনকি একটি ত্রুটিপূর্ণ গণভোট পরিচালনার জন্য সরকার তার নিজস্ব সম্পদ নিয়োজিত করেছিল, আরো বেশি ত্রুটিপূর্ণ একটি সংবিধানের ওপর ভিত্তি করে৷
রপ্তানি-নির্ভর অর্থনীতির গতি মন্থর হয়ে যাওয়া এবং অর্থনৈতিক সংরক্ষণবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সাথে সাথে খাদ্যদ্রব্যের উচ্চ মূল্যের সাথে যোগ হয়েছে লক্ষ লক্ষ অভিবাসী বা বিদেশি কর্মীদের ছাটাই৷ বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের প্রেরিত বৈদেশিক মুদ্রার মোট পরিমাণ হচ্ছে বছরে প্রায় ২০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার - সারা বিশ্বের বৈদেশিক উন্নয়ন সাহায্যের দ্বিগুণ - যা বাংলাদেশ, ফিলিপাইন, কেনিয়া ও মেক্সিকোর মত একরাশ নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশের আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস৷ রেমিটেন্সের পরিমাণ কমে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে এই সব সরকারগুলোর জন্য রাজস্ব কমে যাওয়া এবং পণ্য ও সেবা খাতে ব্যয় করার জন্য নগদ অর্থ কম থাকা৷ তদুপরি, কিছু কিছু দেশে শ্রমিক রপ্তানি কমে যাওয়ার ফলে আরো বেশি আশাহত, ক্রুদ্ধ, তরুণরা তাদের গ্রামের বাড়িগুলোতে অলস বসে আছে আর চরমপন্থী রাজনীতি ও সহিংসতার সহজ শিকারে পরিণত হচ্ছে৷
ইতোমধ্যে, এমনকি শ্রম বাজার সঙ্কুচিত হওয়ার কারণে, অভিবাসী হওয়ার চাপ বৃদ্ধি পাওয়া অব্যাহত রয়েছে, আর গ্রহণকারী দেশগুলো লোকজনকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য আরো বেশি কঠোর পদ্ধতি অবলম্বন করছে৷ ২০০৮-এর জুনে, আমি ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের টেনেরিফে সরকারি গোরস্তান সফর করেছিলাম যেখানকার নামহীন কবরগুলো স্পেনে প্রবেশের জন্য আফ্রিকান অভিবাসীদের ব্যর্থ প্রচেষ্টার নীরব সাক্ষী হয়ে আছে৷ শুধুমাত্র ২০০৮ সালেই, ৬৭,০০০ লোক ইউরোপে পৌঁছানোর জন্য বিপজ্জনকভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেয়, এছাড়াও অজ্ঞাত সংখ্যক ব্যক্তি সাগরে ডুবে মারা যায়৷ যারা পরিচয়ের কাগজপত্র ছাড়া এই ছায়াছন্ন অস্তিত্বকে গ্রহণ করেছে, তারা অন্যের স্বার্থে ব্যবহৃত হওয়ার এবং প্রবঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, এবং ২০০৮ সালের ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)-এর অবৈধ অভিবাসীদেরকে ফেরত পাঠানোর নির্দেশনা অনুযায়ী তাদের মাথার ওপর ঝুলন্ত দীর্ঘ কারাবাসের পর ফেরত পাঠানোর আশঙ্কায় রয়েছে৷
কিছু ইইউ সদস্য দেশ, যেমন স্পেন, অভিবাসীদেরকে ফেরত পাঠানো, অথবা প্রথমেই তাদের দেশত্যাগ বন্ধ করার জন্য আফ্রিকান দেশগুলোর সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে প্রবেশ করেছে৷ মৌরিতানিয়ার মত দেশগুলো এই সব চুক্তিকে তাদের ভূখণ্ডে ব্যাপক সংখ্যক বিদেশিকে নির্বিচারে গ্রেপ্তার, খারাপ অবস্থায় আটক রাখা এবং কোনো আইনী ব্যবস্থা ছাড়াই বিতাড়নের লাইসেন্স হিসেবে দেখে থাকে, যদিও তাদের দেশটি ত্যাগের মনোভাবের কোনো প্রমাণ না থাকে এবং এমনকি অনিয়মিতভাবে মৌরিতানিয়া ত্যাগ করাটা অপরাধ না হলেও৷
যেহেতু আরো বেশি লোক আগের চাইতেও বেশি অনিশ্চিত অবস্থার মুখোমুখি হচ্ছে, সেই জন্য সামাজিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাচ্ছে৷ ২০০৮ সালে জাতি বিদ্বেষী এবং বিদেশিদের প্রতি বিদ্বেষমূলক সহিংসতার একটি নিকৃষ্টতম ঘটনা ঘটেছে মে মাসে দক্ষিণ আফ্রিকায়, যখন ৬০ জন ব্যক্তি নিহত হয়, ৬০০ জন আহত হয় এবং অযুত সংখ্যক লোক বাস্তুচ্যুত হয়, যদিও রাজনৈতিক সহিংসতা ও বঞ্চনা থেকে বাঁচার জন্য আশ্রয়ের সন্ধানে প্রতিবেশী জিম্বাবুয়ে থেকে আরো অযুত সংখ্যক লোক দেশটিতে প্রবেশ করে৷ যদিও আনুষ্ঠানিক তদন্তগুলো আক্রমণের কারণ নির্ণয়ে ব্যর্থ হয়েছে, এটা ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয় যে এগুলো ঘটেছে বিদেশিদের প্রতি বিদ্বেষ এবং চাকরি, বাসস্থান ও সামাজিক পরিষেবার জন্য প্রতিযোগিতা থেকে, যা দুর্নীতির কারণে আরো খারাপের দিকে গিয়েছে৷
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নির্ভর করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর৷ তারপরও সেই সব একই বিশ্বনেতারা যারা বিশ্বের অর্থনৈতিক পুরুদ্ধারের জন্য একত্রে প্রণোদনা প্যাকেজ প্রদানের জন্য হুড়াহুড়ি করছে তারা সারা বিশ্বজুড়ে মারাত্মক সংঘাতগুলোকে অবহেলা করা অব্যাহত রেখেছে যেগুলো মানবাধিকারের ব্যাপক লঙ্ঘনের জন্ম দেয়, দারিদ্র্যকে দৃঢ়ভাবে স্থাপন করে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে৷
অবরোধ ও সামরিক হামলার মাধ্যমে বিধ্বস্ত গাজার অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা অত্যন্ত ভয়াবহ৷ ইসরাইল ও অধিকৃত ফিলিস্তিনী ভূখণ্ডে সংঘাতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া এর সন্নিহিত এলাকা থেকে অনেক দূরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে৷
দারফুর ও সোমালিয়ার সংঘাত ভঙ্গুর বাস্তুসংস্থানের অঞ্চলগুলোতে শেষ হয়ে আসছে যেখানে পানির ওপর বর্ধিত চাপ এবং জনগণকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য খাদ্য সরবরাহের সক্ষমতা হচ্ছে চলমান যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল উভয়ই৷ এগুলো যে ব্যাপক পরমাণ বাস্তুচ্যুতি ঘটিয়েছে তা প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর প্রচুর চাপ তৈরি করেছে, যাদেরকে এখন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের বাড়তি চাপের সাথেও মানিয়ে নিতে হবে৷
মানুষকে নিঃস্ব করা এবং তাদেরকে একটি স্থায়ী সহিংসতার চক্রের ফাঁদে ফেলার জন্য পূর্ব ডিআরসি (গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গো)-তে, লোভ, দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক স্বার্থ আঞ্চলিক শক্তির রাজনীতির সাথে পাল্লা দিয়ে যাচ্ছে৷ বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ একটি দেশ, অর্থনৈতিক মন্দার প্রাক্কালে বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার কারণে এখন পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত অবস্থায় দেখতে পাচ্ছে৷
আফগানিস্তানে, পরিব্যাপক অনিরাপত্তা সেখানে বসবাসরত লোকদের, বিশেষ করে নারী ও মেয়েশিশুদের, খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও স্কুলশিক্ষা লাভের সক্ষমতাকে সীমিত করে রেখেছে৷ এই অনিরাপত্তা প্রতিবেশী পাকিস্তানের সীমান্ত অতিক্রম করে গেছে, যা মানবাধিকারের সুরক্ষা, দারিদ্র্য মোকাবেলা ও যুবদের কর্মহীনতা দূর করার ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতার জন্য এখনই ভূগছে, এবং দেশটিকে চরমপন্থী সহিংসতার নিম্নমুখী আবর্তে নিপতিত করছে৷
অর্থনৈতিক সংকট থেকে যদি আমাদের শেখার একটি বিষয় থাকে তবে তা হচ্ছে আন্তর্জাতিক সীমান্ত আমাদেরকে ক্ষতি থেকে সুরক্ষিত রাখে না৷ বিশ্বের নিকৃষ্টতম সংঘাতগুলো এবং ক্রমবর্ধমান চরমপন্থী সহিংসতার হুমকির সমাধান খোঁজা হচ্ছে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে এর পায়ের ওপর দাঁড়া করানোর বৃহত্তর চিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ৷
মন্দা থেকে নিপীড়ন
অন্যদিকে, আমরা মারাত্মক বিপদের মুখোমুখি হচ্ছি কারণ ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য ও বেপরোয়া অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ব্যাপক সহিংসতার দিকে ধাবিত হতে পারে৷ অন্যদিকে, আমরা এমন একটি পরিস্থিতিতে গিয়ে পড়তে পারি যেখানে অর্থনৈতিক মন্দার সাথে সাথে বৃহত্তর দমন-পীড়নও আসতে পারে কারণ উদ্বিগ্ন সরকারগুলো - বিশেষ করে কর্তৃত্বপরায়ণ সরকারগুলো - ভিন্নমত, সমালোচনা এবং দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থা প্রকাশ করে দেয়ার ওপর কঠোরভাবে দমন অভিযান চালিয়ে থাকে৷
২০০৯ ও পরবর্তীতে যা থাকতে পারতো তার স্বাদ আমরা ২০০৮-এ পেয়েছি৷ খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি ও ভয়াবহ অর্থনৈতিক অবস্থার জন্য যখন মানুষ রাস্তায় নেমেছিল, অনেক দেশে এমনকি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভও কঠোর ব্যবস্থার সম্মুখীন হয়েছিল৷ তিউনিশিয়ায় ধর্মঘট ও বিক্ষোভ শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে থামিয়ে দেয়া হয়, যার ফলে দুইজন মারা যায়, অনেকে আহত হয় এবং অভিযুক্ত সংগঠকদের বিরুদ্ধে ২০০টিরও বেশি মামলা হয়, শেষে কেউ কেউ দীর্ঘ মেয়াদি কারাদণ্ডের সম্মুখীন হয়৷ জিম্বাবুয়েতে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, মানবাধিকার রক্ষাকর্মী ও ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিনিধিদেরকে আক্রমণ, অপহরণ, গ্রেপ্তার ও দায়মুক্তি সহ হত্যা করা হয়৷ ক্যামেরুনে, সহিংস বিক্ষোভের সময় প্রায় ১০০ জন বিক্ষোভকারীকে গুলি করে হত্যা করা হয় এবং আরো অনেককে কারারুদ্ধ করা হয়৷
অর্থনৈতিক চাপ ও রাজনৈতিক উত্তেজনার সময়, সততা ও সহনশীলতার প্রয়োজন যাতে অসন্তোষ ও অতৃপ্তিকে গঠনমূলক আলোচনায় এবং সমাধান সন্ধানের পথে পরিচালনা করা যায়৷ হ্যাঁ, ঠিক এই পরিস্থিতিতেই অনেক দেশে সুশীল সমাজের জন্য স্থান সংকুচিত হয়ে আসছে৷ বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলে মানবাধিকার রক্ষাকর্মী, সাংবাদিক, আইনজীবী, ট্রেড ইউনিয়নের প্রতিনিধি এবং সুশীল সমাজের অন্যান্য নেতৃবৃন্দকে কোনো উপযুক্ত কারণ ছাড়াই হয়রানি, হুমকি প্রদান ও আক্রমণ করা হয়েছে অথবা দায়মুক্তি সহ হত্যা করা হয়েছে৷
গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে কারণ সরকারগুলো তাদের নীতির সমালোচনার শ্বাসরোধ করতে চায়৷ সাংবাদিকরা অনেক দেশে ইতিমধ্যেই যে হুমকিগুলোর সম্মুখীন হচ্ছেন এটি সেগুলোর সাথে যুক্ত হবে৷ সবচেয়ে খারাপ রেকর্ডগুলোর একটি হচ্ছে শ্রীলংকার, সেখানে ২০০৬ সাল থেকে ১৪ জন সাংবাদিক নিহত হয়৷ ইরান ইন্টারনেটে মত প্রকাশের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করেছে এবং মিশর ও সিরিয়া ব্লগারদেরকে কারারুদ্ধ করেছে৷ বেইজিং অলিম্পিকের প্রাক্কালে চীন গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল করেছিল কিন্তু তারপর আবার দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরে গেছে - ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেয়া এবং অন্যান্য ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা৷ নির্বাচনের প্রাক্কালে সমালোচনার ভয়ে মালয়েশীয় সরকার বিরোধীদলীয় দুইটি উল্লেখযোগ্য সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করে৷
খোলা বাজার অপরিহার্যভাবে খোলা সমাজের দিকে ধাবিত হয়নি৷ তেল ও গ্যাসের উচ্চমূল্য থেকে পাওয়া অর্থনৈতিক শক্তির কারণে আত্মবিশ্বাস সঞ্চয়কারী রুশ সরকার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্রমবর্ধমানভাবে একটি জাতীয় ও কর্তৃত্বপরায়ণ অবস্থান গ্রহণ করে এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে রুদ্ধ করার জন্য সক্রিয়ভাবে চেষ্টা করে এবং তাদের সমালোচনাকারীদের ওপর হামলা করে৷ তেলের দাম পড়ে যাওয়া এবং মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধির ফলে রুশ অর্থনীতি সমস্যায় পড়ার কারণে, এবং সামাজিক অসন্তোষ বিস্তৃত হওয়ার ফলে, কর্তৃত্বপরায়ণতার প্রবণতা এমনকি আরো বেশি বেড়ে যেতে পারে৷
যারা চীনের অফিসিয়াল নীতি ও অনুশীলনের সমালোচনা করে, চীন তাদের ওপর দমন-পীড়ন অব্যাহত রেখেছে৷ এর ফল হচ্ছে যতক্ষণ পর্যন্ত স্ক্যাণ্ডালকে আর চাপা দিয়ে রাখা সম্ভব হয় না এবং অনেক ক্ষতি হয়ে যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত অফিসিয়াল দুর্নীতি ও কর্পোরেট অব্যবস্থাপনার মোকাবেলা করা হয় না, যা দেখা গেছে কয়েক বছর আগে সার্স/বার্ড ফ্লু আতঙ্ক অথবা এইচআইভি/এইডস মড়কের সময় অথবা অতি সম্প্রতি গুঁড়াদুধে মেলামাইনের স্ক্যাণ্ডালের ক্ষেত্রে৷ চীন সরকার দুর্নীতির দায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়া উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে কিন্তু চীনের কর্পোরেট বা অফিসিয়াল আচরণে পরিবর্তন করার জন্য কিছুই করেনি বা সামান্যই ব্যবস্থা নিয়েছে৷
দায়বদ্ধতার দাবি জানানোর ক্ষমতাসম্পন্ন একটি জ্ঞাত নাগরিক সমাজ আরো ভালোভাবে নিশ্চিত করতে পারে যে সরকার ও কোম্পানিগুলো ভালোভাবে তাদের কাজ করবে৷ সরকারগুলো যখন অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য চেষ্টা করছে, তখন স্বাধীনতা হচ্ছে উদ্বুদ্ধ করার মত একটি সম্পদ, দমন করার মত নয়৷
নতুন ধরনের নেতৃত্ব
বঞ্চনা, অসাম্য, অবিচার, নিরাপত্তাহীনতা ও দমন-পীড়ন হচ্ছে দারিদ্রের বৈশিষ্ট্য৷ এগুলো হচ্ছে সুস্পষ্টভাবে মানবাধিকারের সমস্যা এবং কেবলমাত্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে এগুলোর সমাধান করা সম্ভব হবে না৷ এগুলোর জন্য দরকার হচ্ছে দৃঢ় রাজনৈতিক ইচ্ছা এবং মানবাধিকার ও আইনের শাসনের কাঠামোর মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত বিষয়গুলোকে সমন্বয়কারী একটি সামগ্রিক প্রতিক্রিয়া৷ এগুলোর জন্য দরকার হচ্ছে সমন্বিত কার্যক্রম ও নতুন ধরনের নেতৃত্ব৷
অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন ভূ-রাজনৈতিক ক্ষমতায় একটি পরিবর্তন এনেছে এবং নতুন প্রজন্মের কিছু দেশ, জি-২০ হিসেবে, বিশ্বনেতৃত্বের দায়িত্ব দাবি করছে৷ চীন, ভারত, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা ও দক্ষিণের উদীয়মান অর্থনীতিগুলো এবং সেইসাথে রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমের নেতৃস্থানীয় অর্থনীতিগুলোকে নিয়ে গঠিত, জি-২০ রাজনৈতিক শক্তির আরো সঠিক প্রতিনিধিত্ব এবং আজকের বিশ্বের অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেকে দাবি করে৷ এটা সত্য হতে পারে, কিন্তু সত্যিকারঅর্থে বিশ্বনেতৃত্ব হওয়ার জন্য, জি-২০ কে অবশ্যই বৈশ্বিক মূল্যবোধকে গ্রহণ করতে হবে এবং মানবাধিকার সম্পর্কিত তাদের নিজেদের নিষ্প্রভ রেকর্ড ও দ্বৈত নীতির মোকাবেলা করতে হবে৷
এটা সত্য যে, জর্জ ডব্ল্যু. বুশের প্রশাসনের তুলনায় নতুন মার্কিন সরকার মানবাধিকারের ক্ষেত্রে একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ অনুসরণ করছে৷
এক বছরের মধ্যে গুয়ান্তানামো বন্দীশিবির বন্ধ করে দেয়ার জন্য, ক্ষমতা গ্রহণের ৪৮ ঘন্টার মধ্যে, প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সিদ্ধান্ত, দ্ব্যর্থহীনভাবে নির্যাতনের নিন্দা করে এবং সিআইএ-এর গোপনে আটক রাখার অবসান ছিল প্রশংসনীয়, একইভাবে প্রশংসনীয় ছিল জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন করার ক্ষেত্রে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত৷ তবে, মানবাধিকারকে সমর্থন করার জন্য প্রশাসন ইসরাইল ও চীনের মত দেশগুলোকে একই রকম অকপটে ও দৃঢ়তার সাথে বলবে কিনা - যা এটি ইরান ও সুদানের মত দেশগুলোকে বলে থাকে - তা বলার সময় এখনো আসেনি৷
মানবাধিকার প্রশ্নে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিশ্রুতি উভয়মুখী রয়ে গেছে৷ যদিও মৃত্যুদণ্ড, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার রক্ষাকর্মীদের সুরক্ষার মত কিছু বিষয়ে ইইউ কঠোর, কিন্তু ইইউ-এর অনেক সদস্য রাষ্ট্র শরণার্থীদের সুরক্ষা এবং জাতিগত বৈষম্যমূলক আচরণ ও তাদের সীমান্তের মধ্যে বৈষম্য অথবা সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীদেরকে সিআইএ-এর হাতে বিশেষ উদ্দেশ্যে হস্তান্তরের বিষয়টি স্বীকার করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী চলতে বিশেষ ইচ্ছুক নয়৷
ব্রাজিল ও মেক্সিকো আন্তর্জাতিকভাবে মানবাধিকারের দৃঢ় সমর্থক কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে যে বিষয়ে তারা বহির্বিশ্বে প্রচারণা চালিয়ে থাকে তা তাদের নিজেদের সীমান্তের মধ্যে অনুশীলন করতে প্রায়ই ব্যর্থ হয়৷ রাজনৈতিক নিপীড়ন ও নির্বাচনে কারচুপি অবসানের জন্য জিম্বাবুয়ে সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপের সামনে দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রমাগতভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে৷ সৌদি আরব বিচার ছাড়াই হাজার হাজার সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীকে আটক রাখে, রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদেরকে কারারুদ্ধ করে রাখে, এবং পরিযায়ী কর্মী ও নারীদের অধিকারকে গুরুতরভাবে সীমাবদ্ধ রাখে৷ চীনের অপরাধ বিচার পদ্ধতি ব্যাপকভাবে ত্রুটিযুক্ত, সমালোচনার কন্ঠরোধ করার জন্য শাস্তিমূলকভাবে প্রশাসনিক আটকাদেশ ব্যবহার করে থাকে এবং এটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারী দেশ৷ রুশ সরকার বিনা বিচারে অনির্দিষ্টকাল আটক রাখা, নির্যাতন ও অন্যান্য দুর্ব্যবহার অনুমোদন করেছে, এবং রাশিয়ার উত্তরের ককেশীয় অঞ্চলে দায়মুক্তি সহ বিচারবহির্ভুত হত্যাকাণ্ডের বিস্তারে সাহায্য করেছে, এবং যারা এর সমালোচনা করার সাহস দেখায় তাদেরকে হুমকি দিয়ে থাকে৷
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মানবাধিকারের যে সব আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের প্রতি একমত হয়েছে সেগুলো প্রবর্ধনের জন্য জি-২০ সরকারগুলোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে৷ অন্যথায়, তারা নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা ও বৈধতা এবং সেইসাথে কার্যকারিতা হারাবে৷ জি-২০ এর লক্ষ্য হচ্ছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট থেকে বের হয়ে আসার একটা উপায় বের করা৷ তারা আরো দাবি করে যে তাদের প্রচেষ্টা দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাসরত ব্যক্তিদের জন্য সুফল বয়ে আনবে৷ কিন্তু অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার যদি মানবাধিকারের ওপর দৃঢ়ভাবে অভিনিবেশ না করে তাহলে এটি টেকসইও হবে না আবার ন্যায়সঙ্গতও হবে না৷
বিশ্বের সর্বোচ্চ অবস্থানে আসীনদের অবশ্য কর্তব্য হচ্ছে তাদের নিজেদের আচরণের মাধ্যমে উদাহরণ স্থাপন করা৷ জি-২০ সদস্যদের জন্য একটি ভালো শুরু হবে একটি সুস্পষ্ট সংকেত পাঠানো যে সকল ধরনের মানবাধিকার, অর্থনৈতিক, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক অধিকার, রাজনৈতিক বা নাগরিক অধিকার, সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ৷ যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারের বৈধতাকে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং এটি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের আন্তর্জাতিক চুক্তির (ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট অন ইকোনমিক, সোস্যাল অ্যান্ড কালচারাল রাইটস, আইসিইএসসিআর) কোনো রাষ্ট্রপক্ষ নয়৷ চীন, অন্যদিকে, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির (ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস, আইসিসিপিআর) কোনো রাষ্ট্রপক্ষ নয়৷ এই দুইটি দেশ অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট চুক্তি অনুমোদন করা উচিত৷ ২০০৮-এর ডিসেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ কর্তৃক গৃহীত অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের আন্তর্জাতিক চুক্তির ঐচ্ছিক প্রটোকল সকল জি-২০ সদস্যের অনুমোদন করা উচিত৷ তবে, আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষর করাটা, যা করা উচিত তার কেবলমাত্র একটি ধাপ৷
পরিবর্তনের জন্য নতুন সুযোগ
বৈশ্বিক দারিদ্র্য - অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে আরো খারাপ হওয়া - মানবাধিকারের পরিবর্তনের জন্য একটি জ্বলন্ত মঞ্চ তৈরি করেছে৷ একই সময়ে, অর্থনৈতিক সংকট একটি উদাহরণ সৃষ্টি করেছে যা পদ্ধতিগত পরিবর্তনের জন্য সুযোগ তৈরি করেছে৷
গত দুই দশক ধরে, দেশগুলো বাজারের পক্ষে তাদের মানবাধিকারের বাধ্যবাধকতাগুলো প্রত্যাহার অথবা নবায়ন করছে এই বিশ্বাসে যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সর্বাঙ্গীন উন্নতি ঘটাবে৷ জোয়ার নেমে যাওয়া এবং নৌকার ফুটা দেখা যাওয়ার সাথে সাথে, সরকারগুলো তাদের অবস্থান আমূল পরিবর্তন করছে এবং একটি নতুন অর্থনৈতিক অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির বিষয়ে কথা বলছে যেখানে রাষ্ট্রগুলো একটি বলিষ্ঠতর ভূমিকা রাখবে৷ তা রাষ্ট্রকে সামাজিক পরিমণ্ডল থেকে পিছিয়ে যাওয়া থেকে বিরত রাখা এবং আরো বেশি মানবাধিকার-বান্ধব রাষ্ট্রের মডেল পুনরায় পরিকল্পনা করার জন্য একটি সুযোগও তৈরি করবে, যা গত ২০ বছর ধরে আন্তর্জাতিক নীতি-নির্ধারণের বৈশিষ্ট্য চিহ্নিতকারী মডেল থেকে ভিন্ন হবে৷ এটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার সহ মানবাধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, এর সুরক্ষা ও এটি পরিপূরণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা সম্পর্কে পুনরায় চিন্তা করার মৌলিক সুযোগ তৈরি করবে৷
সরকারগুলো অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য যতটা নিবেদিতভাবে বিনিয়োগ করছে, মানবাধিকারের জন্যও ততটা নিবেদিতভাবে বিনিয়োগ করা উচিত৷ তাদের উচিত স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সুযোগগুলো বিস্তৃত করা ও এতে সমর্থন দেয়া; বৈষম্যের অবসান ঘটানো; নারীদের ক্ষমতায়ন করা; মানবাধিকারের অপব্যবহারের জন্য সংস্থাগুলোকে দায়বদ্ধ রাখার জন্য সর্বজনীন মানদণ্ড ও কার্যকর পদ্ধতি স্থাপন করা; উন্মুক্ত সমাজ গঠন করা যেখানে আইনের প্রতি শাসনকে সম্মান করা হয়, শক্তিশালী সামাজিক বন্ধন থাকে, দুর্নীতি নির্মূল করা হয় এবং সরকারগুলোকে দায়বদ্ধ রাখা যায়৷ অর্থনৈতিক সংকট ধনী দেশগুলোর জন্য তাদের উন্নয়ন সহায়তা কমানোর একটি অজুহাত হওয়া উচিত নয়৷ এখন অর্থনৈতিক মন্দার সময় দরিদ্রতম কিছু দেশকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পয়ঃনিষ্কাশন ও গৃহায়নের ক্ষেত্রে সাহায্য করার জন্য আন্তর্জাতিক সাহায্য এমনকি আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ৷
এছাড়াও মারাত্মক সংঘাতগুলোর সমাধান করার জন্য সরকারগুলোর একত্রে কাজ করা উচিত৷ এই আন্তঃসম্পর্কের কারণে, একটি সংকটের দিকে দৃষ্টি দেয়ার জন্য আরেকটিকে অবহেলা করাটা উভয় সংকটের অবনতি ঘটানোর জন্য একটা নিশ্চিত ব্যবস্থা৷
মানবাধিকারকে শক্তিশালী করার জন্য সরকারগুলো কি এই সুযোগগুলো লুফে নেবে? কর্পোরেট কুশীলব এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কি তাদের মানবাধিকারের দায়বদ্ধতাগুলো গ্রহণ ও পরিপূরণ করবে? এখন পর্যন্ত, কারণ নির্ণয়ের সময়ে অথবা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রস্তাবিত ব্যবস্থাপত্রে মানবাধিকারকে খুব সামান্যই বিবেচনায় আনা হয়েছে৷
ইতিহাসে দেখা যায় যে মহান পরিবর্তনের জন্য অধিকাংশ সংগ্রামগুলো - যেমন দাসপ্রথার উচ্ছেদ অথবা নারীমুক্তি - রাষ্ট্রের উদ্যোগ হিসেবে শুরু হয়নি বরং সাধারণ মানুষের প্রচেষ্টা হিসেবে শুরু হয়েছিল৷ আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা বা অস্ত্র বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ বা মৃত্যুদণ্ড বিলোপ বা নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে লড়াই করা অথবা আন্তর্জাতিক আলোচ্যসূচিতে বৈশ্বিক দারিদ্র্য ও জলবায়ুর পরিবর্তন অন্তর্ভুক্ত করায় সাফল্যের মূল কারণ হচ্ছে সারাবিশ্বের লক্ষ লক্ষ সক্রিয় কর্মীর শক্তি, সৃজনশীলতা ও অধ্যবসায়৷
আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রতি চাপ সৃষ্টি করার জন্য এখন আমাদেরকে অবশ্যই জনগণের শক্তির দিকে মুখ ফেরাতে হবে৷ এই কারণেই, স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অনেক অংশীদারের সাথে একত্রে, এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ২০০৯ সালে একটি নতুন প্রচারাভিযান শুরু করছে৷ “মর্যাদার দাবি জানান” ব্যানারের অধীনে, দারিদ্র্যকে জিইয়ে রাখা ও গভীরতর করার জন্য দায়ী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কুশীলবদের মানবাধিকারের অপব্যবহারের দায়বদ্ধতার দাবি জানানোর জন্য আমরা জনগণকে সমবেত করবো৷ আমরা বৈষম্যময় আইন, নীতি ও অনুশীলনগুলোকে চ্যালেঞ্জ করবো এবং সেই সকল বিষয়গুলোকে পরাভূত করার জন্য বলিষ্ঠ ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানাবো যেগুলো মানুষকে নিঃস্ব করে ও দরিদ্র রাখে৷ আমরা দারিদ্র্যের অবসান ঘটানোর জন্য দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাসকারী মানুষদের কন্ঠকে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে তুলে আনবো এবং তাদের জীবনকে প্রভাবিত করে এমন সিদ্ধান্তগুলোতে তাদেরকে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের অনুমতি দেয়ার জন্য সনির্বন্ধভাবে আহ্বান জানাবো৷
প্রায় ৫০ বছর আগে, বিবেকের বন্দীদের মুক্তির দাবি জানানোর জন্য এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল প্রতিষ্ঠা করা হয়৷ আজ আমরা দারিদ্র্যের বন্দীদের জন্যও “মর্যাদার দাবি জানাই” যাতে তারা নিজেরাই নিজেদের জীবন পরিবর্তন করতে পারেন৷ আমি নিশ্চিত যে সারা বিশ্বজুড়ে আমাদের লক্ষ লক্ষ সদস্য, সমর্থক ও অংশীদারদের সাহায্য ও সমর্থনের মাধ্যমে আমরা সফল হবো৷
আমরা দারিদ্র্যের বন্দীদের জন্যও “মর্যাদার দাবি জানাই” যাতে তারা নিজেরাই নিজেদের জীবন পরিবর্তন করতে পারেন৷